তবে এই জটিল ও স্পর্শকাতর রাষ্ট্রীয় কাঠামোর একটি সুনির্দিষ্ট ও বাস্তবসম্মত রূপরেখা চূড়ান্ত করতে সুশীল সমাজসহ সংশ্লিষ্ট সকল মহলের কাছ থেকে উন্মুক্ত প্রস্তাব ও গঠনমূলক পরামর্শ আহ্বান করা হয়েছে।
জাতীয় সংসদের মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক আনুষ্ঠানিক ও তাৎপর্যপূর্ণ সংবাদ সম্মেলনে সংবিধান সংশোধন সংক্রান্ত বিশেষ কমিটির সভাপতি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ এই তথ্য দেশবাসীর সামনে তুলে ধরেছেন।
তিনি অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় উল্লেখ করেছেন যে, বিভিন্ন পক্ষ থেকে উত্থাপিত প্রস্তাবগুলোর মধ্য থেকে যে পদ্ধতিটি সামগ্রিকভাবে জাতির জন্য সবচেয়ে বেশি উপযোগী ও কল্যাণকর বলে বিবেচিত হবে, জাতীয় সংসদে বিস্তারিত পর্যালোচনার পর সেটিকে আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রহণ করা হবে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে অত্যন্ত বিশদভাবে তুলে ধরেন যে, এ যাবৎকাল পর্যন্ত তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের সুনির্দিষ্ট প্রক্রিয়া ও ধারাবাহিক ধাপগুলো নিয়ে কোনো একক বা সর্বসম্মত সিদ্ধান্তে আসা যায়নি। বিগত জুলাই জাতীয় সনদে এ সংক্রান্ত কিছু স্পষ্ট প্রস্তাবনা ও রূপরেখা থাকলেও কিছু কিছু ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য ভিন্নমত বা নোট অব ডিসেন্টও স্পষ্টভাবে পরিলক্ষিত হয়েছে।
এই সরকার কাঠামোর পূর্ণাঙ্গ রূপায়ণে প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয় কিংবা চতুর্থ-কোন ধাপে কীভাবে এই রূপরেখা বাস্তবায়িত হবে, সে বিষয়ে বহুমুখী বিকল্প সম্পূর্ণ উন্মুক্ত রাখা হয়েছে। সংসদ ভবনের অভ্যন্তরে এবং সংসদের বাইরে সর্বজনীন ও খোলামেলা আলোচনার মাধ্যমেই কেবল একটি সুসংহত ও সর্বসম্মত কাঠামোর দিকে পৌঁছানো সম্ভব হবে বলে তিনি দৃঢ় আশা প্রকাশ করেছেন।
রাজনৈতিক ও সামাজিক ঐক্যের এক সুদৃঢ় ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত হয়ে একটি দীর্ঘস্থায়ী ও সর্বজনগ্রাহ্য সাংবিধানিক কাঠামো তৈরি করাই বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন ও সংস্কারপন্থী সরকারের অন্যতম প্রধান এবং ঐতিহাসিক লক্ষ্য।
সাংবিধানিক এই সংস্কার ও পুনর্গঠন প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে গণমাধ্যম সেক্টরের একটি বিস্তৃত ও প্রতিনিধিত্বশীল দলের সুচিন্তিত মতামত অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে গ্রহণ করেছে বিশেষ কমিটি। এর আগে গত রবিবার সম্পাদক ও জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকদের বহুমুখী মতামত গ্রহণের ধারাবাহিকতায় মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত চতুর্থ বৈঠকে দেশের ইলেকট্রনিক মিডিয়া, টেলিভিশন চ্যানেল, বিভিন্ন অনলাইন নিউজ পোর্টাল, শীর্ষস্থানীয় সংবাদ সংস্থা এবং বার্তা ব্যবস্থাপনার উচ্চদায়িত্বে থাকা বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বরা সক্রিয়ভাবে অংশ নেন।
দীর্ঘ ও খোলামেলা আলোচনার জন্য পর্যাপ্ত সময় নিশ্চিত করতেই অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে দুই ধাপে এই গণমাধ্যম মতবিনিময় পর্বের সফল আয়োজন করা হয়েছে। অংশগ্রহণকারী মিডিয়া ব্যক্তিত্বদের কাছ থেকে ইতোমধ্যে বেশ কিছু মূল্যবান ও সুদূরপ্রসারী পরামর্শ জমা পড়েছে এবং বাকিদের অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে তাদের লিখিত প্রস্তাবসমূহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরে জমা দেওয়ার জন্য বিশেষভাবে অনুরোধ জানানো হয়েছে।
রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ হিসেবে সর্বজনস্বীকৃত সংবাদমাধ্যমের এই সক্রিয় ও অর্থপূর্ণ অংশগ্রহণ সামগ্রিক সংস্কার প্রক্রিয়াকে আরও বেশি গতিশীল ও সমৃদ্ধ করবে বলে জোরালোভাবে আশা করা হচ্ছে।
শুধুমাত্র গণমাধ্যমের নির্দিষ্ট পরিমণ্ডলে আলোচনা সীমিত বা আবদ্ধ না রেখে পর্যায়ক্রমে সমাজের সর্বস্তরের সামাজিক শক্তির সঙ্গে সরাসরি মতবিনিময় করার একটি সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে বিশেষ কমিটি।
এই ব্যাপকভিত্তিক প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে দেশের বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবী, প্রথিতযশা সংবিধান বিশেষজ্ঞ, অভিজ্ঞ আইনবিদ, শিক্ষাবিদ, সাবেক ও বর্তমান বিচারকদের পাশাপাশি গত সতেরো বছর ধরে রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে নানা ধরনের বঞ্চনা এবং রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের শিকার হওয়া প্রতিটি ভুক্তভোগী পরিবারের সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা করা হবে।
এর পাশাপাশি ঐতিহাসিক জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সাহসী তরুণ অংশীদার এবং ছাত্র-জনতার রক্তে ভেজা শহীদ পরিবারের প্রতিনিধিদের কাছ থেকেও সরাসরি মূল্যবান পরামর্শ সংগ্রহ করা হবে। সবশেষে সমাজের বিভিন্ন স্তর থেকে অর্জিত অভিজ্ঞতা ও লিখিত প্রস্তাবগুলোর বিশদ পর্যালোচনার ভিত্তিতে দেশের শীর্ষস্থানীয় ও বরেণ্য সংবিধান বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনা সাপেক্ষে কমিটি তাদের চূড়ান্ত রিপোর্ট ও প্রতিবেদন প্রস্তুত করবে।
সংবাদ সম্মেলনে রাষ্ট্রীয় কাঠামোর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট পার্লামেন্টের প্রাসঙ্গিকতা নিয়েও গণমাধ্যম প্রতিনিধিদের উত্থাপিত বিভিন্ন পর্যালোচনার দিকগুলো তুলে ধরা হয়।
বাংলাদেশের মতো এককেন্দ্রিক বা ইউনিটারি রাষ্ট্রে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ গঠনের যৌক্তিকতা ও কার্যকারিতা নিয়ে কিছু ভিন্নমত ও বিতর্ক তৈরি হলেও, ঐতিহাসিক জুলাই জাতীয় সনদের মূল ঐক্যমত্যকে সর্বোচ্চ শ্রদ্ধা ও মর্যাদা জানিয়ে তাঁরা দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ প্রতিষ্ঠার পথেই দৃঢ়ভাবে অগ্রসর হতে চান।
তবে দেশের আইনসভা বা সরকারি দল যদি পরবর্তীতে এ বিষয়ে অন্য কোনো উপযুক্ত সংশোধন বা সংযোজন আনতে চায়, তবে সেটিও সুনির্দিষ্ট সংসদীয় প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়েই বিবেচনায় নেওয়ার যথেষ্ট সুযোগ বহাল থাকবে।
একই সঙ্গে বিচার বিভাগের পূর্ণাঙ্গ স্বাধীনতা নিশ্চিতকরণ, প্রশাসনের প্রকৃত বিকেন্দ্রীকরণ এবং বিচারব্যবস্থাকে যেকোনো ধরনের রাজনৈতিক প্রভাব বা হস্তক্ষেপ থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত রাখার বিষয়গুলোকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারের তালিকায় রাখা হয়েছে।
সংবিধান সংশোধন ও সংস্কার প্রক্রিয়ায় দেশের কোনো রাজনৈতিক পক্ষ বা শক্তিকে ইচ্ছাকৃতভাবে বাদ দেওয়া হবে না বলে অত্যন্ত জোরালোভাবে পুনর্ব্যক্ত করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি দেশের সকল বিরোধী দলকে দায়িত্বশীল রাজনৈতিক আচরণ প্রদর্শনের মাধ্যমে এই গুরুত্বপূর্ণ সংলাপে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণের জন্য বিনীত ও জোরালো আহ্বান জানিয়েছেন।
সংবিধান সংশোধন কমিটিতে নিজেদের নাম অন্তর্ভুক্ত করে সকল রাজনৈতিক পক্ষ যাতে একটি জাতীয় ঐকমত্যের সংলাপে অংশ নেয়, সে বিষয়ে সবার আন্তরিক সহযোগিতা ও সদিচ্ছা কামনা করা হচ্ছে। মূলত একটি পূর্ণাঙ্গ, ভারসাম্যপূর্ণ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক বা ইনক্লুসিভ সংশোধন আইন দেশবাসীকে উপহার দেওয়াই এই মহৎ উদ্যোগের মূল ও একমাত্র লক্ষ্য।
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বা বিএনপির পক্ষ থেকে ইতিপূর্বে উত্থাপিত প্রস্তাব অনুযায়ী কোনো একক ব্যক্তি সর্বোচ্চ দশ বছর বা দুই মেয়াদের বেশি প্রধানমন্ত্রী পদে থাকতে পারবেন না-এই নীতিগত অবস্থানের ওপর ভিত্তি করেই বর্তমান আলোচনা এগিয়ে চলছে।
ব্যক্তিকেন্দ্রিক শাসনব্যবস্থা চিরতরে রোধ করার ক্ষেত্রে তাদের এই অবস্থান অত্যন্ত অনড় ও স্পষ্ট হলেও সংসদে সকল বিকল্প রাজনৈতিক প্রস্তাব উন্মুক্ত আলোচনায় গ্রহণের পথ প্রশস্ত রাখা হবে।
রাষ্ট্রীয় সংস্কার কমিশনগুলোর কাজের সামগ্রিক ব্যাপ্তি ও কার্যকারিতা নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় জানানো হয় যে, মূল ছয়টি সংস্কার কমিশনের সুনির্দিষ্ট সুপারিশের ওপর ভিত্তি করে গঠিত জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নে বর্তমান সরকার একশ শতাংশ প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ও অবিচল।
যদিও পূর্ববর্তী ঐকমত্য কমিশনের প্রাথমিক আলোচনায় অন্য কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কমিশনের সুপারিশগুলো সরাসরি অন্তর্ভুক্ত ছিল না, তথাপি দেশের আপামর জনগণের তীব্র জনদাবির প্রেক্ষিতে সরকার চাইলে যেকোনো সময়ে সংবাদমাধ্যম বা অপরাপর খাতে নতুন সংস্কার কমিশন গঠন করে তা দ্রুত বাস্তবায়ন করার পূর্ণ সাংবিধানিক ও প্রশাসনিক এখতিয়ার রাখে।
বিশেষ কমিটির চূড়ান্ত রিপোর্ট ও প্রতিবেদন আনুষ্ঠানিকভাবে প্রস্তুত হওয়ার পর তা জাতীয় সংসদে সুনির্দিষ্ট বিল আকারে উত্থাপন করা হবে। সংসদীয় কাঠামোর ভেতর এবং সংসদের বাইরে দেশব্যাপী ব্যাপক জনমত যাচাই ও জনসচেতনতা সৃষ্টির মাধ্যমেই পরিশেষে একটি সর্বজনীন ও ঐতিহাসিক স্বীকৃতিপ্রাপ্ত সংবিধান সংশোধনী রূপ লাভ করবে বলে দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করা হয়েছে।