শুক্রবার, অক্টোবর ১৬, ২০২৬
৩০ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

গাজীপুরে শ্রমিকদের মহাসড়ক অবরোধ, সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ পুলিশের

আর এন এস ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৫ অক্টোবর, ২০২৬, ০১:১৮ পিএম

গাজীপুরে শ্রমিকদের মহাসড়ক অবরোধ, সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ পুলিশের
ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান শিল্পাঞ্চল গাজীপুরে বকেয়া বেতনের দাবিতে একটি তৈরি পোশাক কারখানার শ্রমিকদের মহাসড়ক অবরোধ এবং পরবর্তীতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপের মাধ্যমে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের ঘটনা ঘটেছে।

 

বৃহস্পতিবার সকালে গাজীপুর জেলার শ্রীপুর উপজেলার মুলাইদ গ্রামের এমসি বাজার এলাকায় ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে এই অনাকাঙ্ক্ষিত উত্তেজনার সৃষ্টি হয়। ‘সি স্টেজ বিডি লিমিটেড’ নামক একটি কারখানার শত শত বিক্ষুব্ধ শ্রমিক তাদের গত সেপ্টেম্বর মাসের বকেয়া বেতনের দাবিতে সকাল থেকে রাজপথে অবস্থান নিলে দেশের অন্যতম ব্যস্ত এই মহাসড়কে যান চলাচল সম্পূর্ণভাবে বন্ধ হয়ে যায়।

 

প্রায় এক ঘণ্টা ধরে চলা এই অচলাবস্থার পর পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে এবং গুরুত্বপূর্ণ এই মহাসড়কে যান চলাচল পুনরায় শুরু করতে শিল্প পুলিশ বাধ্য হয়ে সাউন্ড গ্রেনেড ব্যবহার করে শ্রমিকদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়।

 

এই ঘটনার পর ওই অঞ্চলে থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করলেও বর্তমানে যান চলাচল ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে বলে নিশ্চিত করেছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। শ্রমিকদের এই আকস্মিক বিক্ষোভ এবং মহাসড়ক অবরোধের পেছনের মূল কারণ হিসেবে কারখানা কর্তৃপক্ষের ধারাবাহিক প্রতিশ্রুতিভঙ্গ এবং টালবাহানাকে দায়ী করা হয়েছে।

 

আন্দোলনরত সাধারণ শ্রমিকদের সাথে কথা বলে জানা যায়, তাদের ন্যায্য পাওনা আদায়ের এই সংগ্রাম হঠাৎ করেই শুরু হয়নি। কারখানার শ্রমিক মোজাম্মেল, তরিকুল এবং আলী আজমসহ আরও কয়েকজন সংবাদমাধ্যমের কাছে তাদের ক্ষোভ এবং হতাশার কথা ব্যক্ত করেন।

 

তারা জানান, গত দশই অক্টোবর বকেয়া বেতনের দাবিতে তারা প্রথম দফায় আন্দোলন করেছিলেন। সেই সময় কারখানা কর্তৃপক্ষের সাথে আলোচনা সাপেক্ষে একটি সমঝোতা হয়েছিল। মালিকপক্ষ সুস্পষ্টভাবে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল যে, গত তেরোই অক্টোবর তাদের সেপ্টেম্বর মাসের সম্পূর্ণ বেতন পরিশোধ করা হবে।

 

কিন্তু নির্ধারিত সেই তারিখে বেতন প্রদান না করে কর্তৃপক্ষ নানা অজুহাতে সময়ক্ষেপণ করতে থাকে। সর্বশেষ গত বুধবার বেতন প্রদানের একটি নতুন তারিখ নির্ধারণ করা হলেও সেদিনও শ্রমিকদের পাওনা বুঝিয়ে দেওয়া হয়নি। উল্টো কোনো প্রকার পূর্ব ঘোষণা ছাড়াই বৃহস্পতিবার সকালে কারখানায় সাধারণ ছুটি ঘোষণা করে কর্তৃপক্ষ।

 

মাসের পর মাস হাড়ভাঙা খাটুনির পর নিজেদের ঘামের মূল্য না পেয়ে এবং কর্তৃপক্ষের এমন আকস্মিক ছুটি ঘোষণার সিদ্ধান্তে শ্রমিকদের মাঝে চরম অসন্তোষ ও ক্ষোভের বিস্ফোরণ ঘটে। জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয় এবং মাস শেষে বাসা ভাড়া, মুদি দোকানের বকেয়া পরিশোধ ও পরিবারের ভরণপোষণের চিন্তায় দিশেহারা শ্রমিকরা বাধ্য হয়েই রাজপথকে তাদের দাবি আদায়ের একমাত্র হাতিয়ার হিসেবে বেছে নেন।

 

এরই ধারাবাহিকতায় বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে আটটার দিকে কারখানার শত শত শ্রমিক ঐক্যবদ্ধ হয়ে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে নেমে আসেন এবং সেখানে শক্ত অবস্থান গ্রহণ করেন। শ্রমিকদের এই অবরোধের কারণে দেশের উত্তরাঞ্চল এবং রাজধানীর সাথে যোগাযোগের অন্যতম প্রধান এই লাইফলাইনে মুহূর্তের মধ্যেই শত শত যানবাহন আটকা পড়ে।

 

পণ্যবাহী ট্রাক, দূরপাল্লার যাত্রীবাহী বাস এবং জরুরি সেবাদানকারী যানবাহনগুলো সড়কের উভয় পাশে আটকা পড়ায় সাধারণ যাত্রী ও চালকদের চরম ভোগান্তিতে পড়তে হয়। প্রায় এক ঘণ্টা ধরে মহাসড়কে এমন স্থবির অবস্থা বিরাজ করে।

 

খবর পেয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে এবং মহাসড়কের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা সচল করতে দ্রুত ঘটনাস্থলে ছুটে আসে গাজীপুর শিল্প পুলিশের একটি বিশেষ দল। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা প্রথমেই শক্তি প্রয়োগের পথে না হেঁটে শান্তিপূর্ণ সমাধানের জন্য বিক্ষোভকারী শ্রমিকদের সাথে সংলাপের উদ্যোগ গ্রহণ করেন।

 

শিল্প পুলিশের পক্ষ থেকে শ্রমিকদের আশ্বস্ত করা হয় যে, তারা কারখানা কর্তৃপক্ষের সাথে সরাসরি আলোচনা করে দ্রুততম সময়ের মধ্যে বকেয়া বেতন পরিশোধের কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন। একই সাথে জনদুর্ভোগের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে শ্রমিকদের মহাসড়ক থেকে সরে যাওয়ার জন্য বিনীতভাবে অনুরোধ জানানো হয়।

 

কিন্তু কর্তৃপক্ষের পূর্ববর্তী প্রতিশ্রুতিভঙ্গের কারণে শ্রমিকদের মাঝে গভীর আস্থার সংকট তৈরি হয়েছিল। ফলে পুলিশের এই আশ্বাসে তারা আশ্বস্ত হতে পারেননি এবং মহাসড়ক অবরোধ প্রত্যাহার করে কাজে বা বাসস্থানে ফিরে যাওয়ার প্রস্তাব দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করেন।

 

পরিস্থিতি যখন ক্রমশ জটিল আকার ধারণ করছিল এবং মহাসড়কের উভয় পাশে আটকে পড়া যানবাহনের সারি দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হয়ে জনদুর্ভোগ চরম পর্যায়ে পৌঁছাচ্ছিল, তখন আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে এবং সড়কে যান চলাচল পুনরায় শুরু করতে পুলিশ বিকল্প কৌশল অবলম্বন করে।

 

পুলিশ সদস্যরা প্রথমদিকে কিছুটা পিছিয়ে এসে পুনরায় সংগঠিত হন এবং মহাসড়ক অবরোধ করে রাখা বিক্ষুব্ধ শ্রমিকদের লক্ষ্য করে বেশ কয়েকটি সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করেন। সাউন্ড গ্রেনেডের বিকট শব্দে এবং পুলিশের আকস্মিক এই পদক্ষেপে মহাসড়কে অবস্থান নেওয়া শ্রমিকরা আতঙ্কিত হয়ে ছত্রভঙ্গ হয়ে যান এবং দ্রুত সড়ক ছেড়ে আশপাশের অলিগলিতে অবস্থান নেন।

 

মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যেই মহাসড়কটি পুরোপুরি ফাঁকা হয়ে যায় এবং পুলিশ দ্রুততার সাথে যানজট নিরসন করে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে স্বাভাবিক যান চলাচল নিশ্চিত করে। এই পুরো ঘটনা এবং পুলিশের গৃহীত পদক্ষেপ সম্পর্কে গাজীপুর শিল্প পুলিশ-২ এর পুলিশ সুপার মোহাম্মদ আমজাদ হোসাইন গণমাধ্যমের কাছে বিস্তারিত তথ্য এবং আনুষ্ঠানিক বক্তব্য প্রদান করেছেন।

 

তিনি স্পষ্ট করে জানান, সি স্টেজ বিডি লিমিটেড কারখানার শ্রমিকরা মূলত তাদের সেপ্টেম্বর মাসের বকেয়া বেতনের ন্যায্য দাবি নিয়েই বৃহস্পতিবার সকালে মহাসড়ক অবরোধ করেছিলেন। পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে এবং অত্যন্ত ধৈর্য ও পেশাদারিত্বের সাথে শ্রমিকদের বুঝিয়ে মহাসড়ক থেকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে।

 

তিনি বলেন, “আমরা তাদের মালিকপক্ষের সাথে আলোচনা করে একটি সুষ্ঠু সমাধানের সুস্পষ্ট প্রস্তাব দিয়েছিলাম এবং মহাসড়ক থেকে সরে যাওয়ার জন্য বারবার অনুরোধ করেছিলাম। কিন্তু তারা আমাদের কোনো অনুরোধেই সাড়া দেননি, বরং মহাসড়ক অবরোধ অব্যাহত রেখে জনদুর্ভোগ বাড়িয়ে চলছিলেন।”

 

পুলিশ সুপার আরও উল্লেখ করেন, দীর্ঘ সময় ধরে মহাসড়ক বন্ধ থাকায় সাধারণ মানুষের ভোগান্তি চরম আকার ধারণ করেছিল। তাই পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে এবং মহাসড়ক সচল করতে বাধ্য হয়েই পুলিশকে সাউন্ড গ্রেনেড ব্যবহার করতে হয়েছে।

 

তবে এই প্রক্রিয়ায় কোনো ধরনের প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার করা হয়নি এবং কোনো শ্রমিক গুরুতর আহত হওয়ারও কোনো খবর পাওয়া যায়নি। বেতনের বিষয়ে তিনি আশ্বস্ত করে বলেন, শিল্প পুলিশ মালিকপক্ষের সাথে নিবিড়ভাবে যোগাযোগ রক্ষা করছে এবং দ্রুত আলোচনার মাধ্যমে শ্রমিকদের বকেয়া বেতন পরিশোধের বিষয়ে একটি চূড়ান্ত ও সন্তোষজনক সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

 

এছাড়া, শ্রমিকদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়া একটি গুঞ্জনের বিষয়েও তিনি স্পষ্টীকরণ দিয়েছেন। শ্রমিকদের অভিযোগ ছিল যে, কারখানা কর্তৃপক্ষ রাতের আঁধারে কারখানার গুরুত্বপূর্ণ মেশিনপত্র অন্যত্র সরিয়ে ফেলছে। এই অভিযোগটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন এবং সঠিক নয় বলে পুলিশ সুপার মোহাম্মদ আমজাদ হোসাইন নিশ্চিত করেছেন।

 

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে তৈরি পোশাক খাতের অবদান অনস্বীকার্য এবং এই খাতের মূল চালিকাশক্তি হলেন সাধারণ শ্রমিকরা। গাজীপুর, আশুলিয়া ও নারায়ণগঞ্জের মতো শিল্পাঞ্চলগুলোতে শ্রমিকদের বকেয়া বেতনের দাবিতে এমন বিক্ষোভ নতুন কোনো ঘটনা নয়।

 

আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও বাংলাদেশের পোশাক খাতের শ্রমিকদের অধিকার এবং তাদের জীবনমান নিয়ে বিভিন্ন সময় আলোচনা হয়েছে। অর্থনীতিবিদ এবং সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, শ্রমিকদের ঘামের মূল্য সময়মতো পরিশোধ না করা কেবল তাদের মানবাধিকারেরই লঙ্ঘন নয়, বরং এটি দেশের সামগ্রিক শিল্প পরিবেশ এবং আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তির জন্যও অত্যন্ত ক্ষতিকর।

 

সি স্টেজ বিডি লিমিটেড কারখানার এই ঘটনাটি আবারও প্রমাণ করল যে, মালিকপক্ষ ও শ্রমিকদের মধ্যে সুষ্ঠু যোগাযোগ এবং আস্থার অভাব যেকোনো সময় বড় ধরনের শিল্প অসন্তোষের জন্ম দিতে পারে।

 

সংশ্লিষ্ট সকলের প্রত্যাশা, কর্তৃপক্ষ দ্রুততম সময়ের মধ্যে শ্রমিকদের বকেয়া বেতন পরিশোধ করে এই সংকটের স্থায়ী সমাধান করবে এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি এড়াতে আরও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করবে।