রবিবার, অক্টোবর ১৮, ২০২৬
২ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ইনানীতে অনুমোদনহীন অবকাশযাপন কেন্দ্রে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড, নিহত বেড়ে দশ

আর এন এস ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৭ অক্টোবর, ২০২৬, ০২:১৩ পিএম

ইনানীতে অনুমোদনহীন অবকাশযাপন কেন্দ্রে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড, নিহত বেড়ে দশ
ছবি: সংগৃহীত

প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অপরূপ লীলাভূমি এবং দেশের অন্যতম প্রধান পর্যটন আকর্ষণ কক্সবাজারের উখিয়া উপজেলার ইনানী সমুদ্রসৈকত এলাকা শনিবার সকালে এক মর্মান্তিক, হৃদয়বিদারক ও ভয়াবহ ঘটনার নীরব সাক্ষী হয়েছে।

 

বিশ্বের দীর্ঘতম মেরিন ড্রাইভ সড়কসংলগ্ন পাটোয়ারটেক সৈকত এলাকায় গড়ে ওঠা ‘টুপটুপ’ নামক একটি সম্পূর্ণ কাঠের তৈরি অবকাশযাপন কেন্দ্রে (রিসোর্ট) এক প্রলয়ংকরী অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে।

 

এই ভয়াবহ ও প্রাণঘাতী অগ্নিকাণ্ডে এখন পর্যন্ত অন্তত দশজন দুর্ভাগা মানুষের অগ্নিদগ্ধ মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে বলে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করা হয়েছে।

 

একই দুর্ভাগ্যজনক ঘটনায় আরও বেশ কয়েকজন পর্যটক ও স্থানীয় মানুষ মারাত্মকভাবে দগ্ধ ও গুরুতর আহত হয়েছেন। আহতদের অত্যন্ত মুমূর্ষু অবস্থায় দ্রুততম সময়ের মধ্যে উদ্ধার করে স্থানীয় বিভিন্ন হাসপাতাল ও উন্নত চিকিৎসার জন্য জেলা সদরের প্রধান চিকিৎসাকেন্দ্রগুলোতে স্থানান্তর করা হয়েছে।

 

সাপ্তাহিক ছুটির দিন হওয়ায় নৈসর্গিক পরিবেশে অবকাশ যাপনের উদ্দেশ্যে আসা পর্যটকদের এমন মর্মান্তিক মৃত্যুতে গোটা কক্সবাজার এলাকায় এক গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে এবং দেশজুড়ে সচেতন মহলে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।

 

ফায়ার সার্ভিস, স্থানীয় প্রশাসন এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের সূত্রে প্রাপ্ত নির্ভরযোগ্য তথ্য অনুযায়ী, শনিবার সকাল আনুমানিক সাড়ে সাতটার দিকে এই ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত হয়। নীল জলরাশি আর পাহাড়ের মিতালিতে ঘেরা পাটোয়ারটেক এলাকার ওই নির্দিষ্ট অবকাশযাপন কেন্দ্রটি মূলত কাঠ, বাঁশ, ছন এবং অন্যান্য অত্যন্ত দাহ্য পদার্থ ব্যবহার করে নির্মাণ করা হয়েছিল।

 

এর ফলে আগুনের লেলিহান শিখা একবার জ্বলে ওঠার পর তা মুহূর্তের মধ্যেই বাতাসের সাহায্যে পুরো কাঠামোতে প্রবল বেগে ছড়িয়ে পড়ে এবং এক ভয়াবহ সর্বনাশা রূপ ধারণ করে। শনিবার সকালের শান্ত ও স্নিগ্ধ পরিবেশে হঠাৎ করে এমন বিশাল অগ্নিকাণ্ড শুরু হলে সেখানে অবস্থানরত পর্যটক, দর্শনার্থী এবং প্রতিষ্ঠানটির কর্মচারীদের মধ্যে চরম আতঙ্ক ও প্রাণভয় ছড়িয়ে পড়ে।

 

জীবন বাঁচাতে অনেকেই দিগ্বিদিক ছুটোছুটি শুরু করেন, তবে আগুনের বিস্তার এত দ্রুত ছিল যে অনেকেই ভেতরে আটকা পড়েন। স্থানীয় লোকজন ও আশপাশের অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের কর্মীরা প্রথমে নিজেদের উদ্যোগে বালি ও পানি দিয়ে আগুন নেভানোর আপ্রাণ চেষ্টা করেন এবং কালক্ষেপণ না করে তৎক্ষণাৎ ফায়ার সার্ভিসে জরুরি খবর দেন।

 

সংবাদ প্রাপ্তির পরপরই সকাল সাতটা পঁচিশ মিনিটে উখিয়া ফায়ার স্টেশনের দুটি চৌকস অগ্নিনির্বাপক ইউনিট তাদের সম্পূর্ণ সরঞ্জামসহ ঘটনাস্থলের উদ্দেশে রওনা হয় এবং দ্রুততম সময়ের মধ্যে, অর্থাৎ সকাল আটটার দিকে সেখানে পৌঁছে উদ্ধার ও আগুন নিয়ন্ত্রণের কাজ পুরোদমে শুরু করে।

 

ফায়ার সার্ভিসের কর্মীদের অত্যন্ত সাহসী ও নিরলস প্রচেষ্টায় দীর্ঘ সময় পর আগুন সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে এলেও ততক্ষণে কাঠের তৈরি এই অবকাশযাপন কেন্দ্রটির অধিকাংশ অংশ পুড়ে একেবারে ছাই হয়ে যায়। সমুদ্রের তীরবর্তী এলাকা হওয়ায় বাতাসের তীব্র প্রবাহ আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীদের চরম প্রতিকূলতার মুখে ফেলেছিল।

 

আগুন সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে আসার পর ফায়ার সার্ভিসের দক্ষ উদ্ধারকারী দল পুড়ে যাওয়া ধ্বংসস্তূপের ভেতর থেকে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে একে একে দশজনের মৃতদেহ উদ্ধার করে। নিহতদের শরীর আগুনে মারাত্মকভাবে পুড়ে যাওয়ায় তাদের পরিচয় তাৎক্ষণিকভাবে পুরোপুরি নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। তবে স্থানীয় প্রশাসনের ধারণা, নিহতদের মধ্যে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা সাধারণ পর্যটক এবং ওই অবকাশযাপন কেন্দ্রটিতে কর্মরত কর্মচারী উভয়ই রয়েছেন।

 

স্থানীয় হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসাধীন আহতদের মধ্যে বেশ কয়েকজনের শ্বাসনালী পুড়ে যাওয়ায় এবং শরীরের একটি বড় অংশ দগ্ধ হওয়ায় তাদের অবস্থা অত্যন্ত আশঙ্কাজনক বলে জরুরি বিভাগের চিকিৎসকরা জানিয়েছেন।

 

চিকিৎসকদের এই আশঙ্কার কারণে নিহতের সংখ্যা সামনের দিনগুলোতে আরও বাড়তে পারে বলে প্রবল ভয় কাজ করছে। এই মর্মান্তিক ঘটনায় উদ্ধারকাজ এখনো চলমান রয়েছে এবং পোড়া ধ্বংসস্তূপের নিচে আরও কোনো মৃতদেহ বা আহত ব্যক্তি আটকা পড়ে আছেন কি না, তা নিশ্চিত হতে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে তাদের তল্লাশি অভিযান অব্যাহত রেখেছেন।

 

অগ্নিকাণ্ডের প্রকৃত কারণ এবং এর ফলে সৃষ্ট ক্ষয়ক্ষতির চূড়ান্ত পরিমাণ সম্পর্কে ফায়ার সার্ভিস বা পুলিশের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। তবে প্রাথমিকভাবে বৈদ্যুতিক শটসার্কিট, রান্নাঘরের কোনো ত্রুটি কিংবা অন্য কোনো অজানা দাহ্য উৎস থেকে এই বিধ্বংসী আগুনের সূত্রপাত হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা ধারণা করছেন।

 

এ বিষয়ে উখিয়া থানার বর্তমান ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আতিকুর রহমান উপস্থিত গণমাধ্যমকর্মীদের জানিয়েছেন যে, ঠিক কী কারণে এবং কীভাবে এত দ্রুত এত বড় একটি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটল, তা অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে এবং বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

 

স্থানীয় পুলিশ প্রশাসন ইতিমধ্যে পুরো ঘটনাস্থল কর্ডন করে বা ঘিরে রেখেছে এবং সেখান থেকে প্রয়োজনীয় আলামত সংগ্রহের কাজ অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে চলছে। অগ্নিকাণ্ডের পেছনে কোনো ধরনের নাশকতা, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অপরাধ, কাঠামোগত দুর্বলতা বা চরম গাফিলতি ছিল কি না, তা গভীরভাবে উদ্ঘাটন করতে একটি উচ্চপদস্থ ও পূর্ণাঙ্গ তদন্ত কমিটি গঠনের প্রক্রিয়া ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে বলেও তিনি তার বক্তব্যে উল্লেখ করেন।

 

অপরাধ তদন্ত বিভাগ বা সিআইডির বিশেষায়িত ফরেনসিক দলকেও ঘটনাস্থলে তলব করা হয়েছে যাতে আগুনের মূল উৎস সম্পর্কে একটি বিজ্ঞানভিত্তিক, নিরপেক্ষ ও নির্ভুল প্রতিবেদন পাওয়া যায়।

 

এদিকে, এত বড় প্রাণহানির ঘটনার পরপরই পর্যটন নগরীতে গড়ে ওঠা ওই অবকাশযাপন কেন্দ্রটির নির্মাণশৈলী এবং পরিচালনার বৈধতা নিয়ে অত্যন্ত চাঞ্চল্যকর ও বিস্ময়কর তথ্য সামনে আসতে শুরু করেছে।

 

শনিবার দুপুরে রাজধানী ঢাকায় অবস্থিত ফায়ার সার্ভিস সদর দপ্তরে আয়োজিত এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও জরুরি সংবাদ সম্মেলনে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সুলতানুল আফরীন জুনাইদ এই অগ্নিকাণ্ড এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানটির চরম মাত্রার গাফিলতির বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য দেশবাসীর সামনে তুলে ধরেন।

 

তিনি অত্যন্ত দৃঢ়তা ও ক্ষোভের সঙ্গে জানান যে, কক্সবাজারের উখিয়ার ইনানীর পাটুয়ারটেক সৈকতে গড়ে ওঠা সম্পূর্ণ কাঠের তৈরি এই ‘টুপটুপ’ নামক অবকাশযাপন কেন্দ্রটি সম্পূর্ণ অনুমোদনহীনভাবে এবং প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে চরম অবৈধ উপায়ে পরিচালিত হচ্ছিল।

 

পর্যটকদের নিয়ে বাণিজ্য করা এই প্রতিষ্ঠানটির কোনো ফায়ার সেফটি প্ল্যান বা অগ্নি নিরাপত্তাজনিত সরকারি ছাড়পত্র ছিল না। এমনকি তাদের ফায়ার সার্ভিসের বাধ্যতামূলক লাইসেন্সও গ্রহণ করা হয়নি, যা দেশের প্রচলিত অগ্নিনির্বাপণ ও ইমারত নির্মাণ আইনের সুস্পষ্ট, বেপরোয়া এবং চরম লঙ্ঘন।

 

এই জরুরি সংবাদ সম্মেলনে মহাপরিচালক আরও একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও একইসঙ্গে উদ্বেগজনক তথ্য প্রকাশ করেন, যা এই দুর্ঘটনার পেছনের গাফিলতিকে আরও নগ্নভাবে ফুটিয়ে তোলে। তিনি জানান যে, চলতি বছরের জুন মাসে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের একটি বিশেষ পরিদর্শক দল উখিয়ার ওই পর্যটন এলাকা পরিদর্শন করেছিল।

 

সে সময় ফায়ার সার্ভিসের বিশেষজ্ঞরা কাঠের তৈরি এই কেন্দ্রটিকে অত্যন্ত মাত্রায় অগ্নিনিরাপত্তা ঝুঁকিপূর্ণ স্থাপনা হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে চিহ্নিত করেছিলেন। শুধু চিহ্নিত করেই তারা ক্ষান্ত হননি, বরং ফায়ার সার্ভিসের পক্ষ থেকে প্রতিষ্ঠানটির মালিকপক্ষকে আনুষ্ঠানিকভাবে সতর্ক করে একটি আইনি নোটিশও প্রদান করা হয়েছিল।

 

সেই আইনি নোটিশে অবিলম্বে অগ্নি নির্বাপণের পর্যাপ্ত ও আধুনিক ব্যবস্থা গ্রহণ অথবা কাঠামোগত পরিবর্তন না করা পর্যন্ত সকল প্রকার বাণিজ্যিক কার্যক্রম সম্পূর্ণ বন্ধ রাখার কঠোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।

 

কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো, মালিকপক্ষ ফায়ার সার্ভিসের সেই আইনি ও সতর্কতামূলক নোটিশকে সম্পূর্ণভাবে উপেক্ষা ও অবজ্ঞা করে তাদের অবৈধ বাণিজ্যিক কার্যক্রম নির্দ্বিধায় চালিয়ে আসছিল। মালিকপক্ষের এই চরম অবহেলা, নিয়মবহির্ভূত অর্থলিপ্সা এবং দায়িত্বহীনতার কারণেই আজ দেশের দশজন নিরীহ মানুষের অমূল্য প্রাণ অকালে ঝরে গেল।

 

এই ভয়াবহ ও মর্মান্তিক দুর্ঘটনা দেশের পর্যটন শিল্পে বিরাজমান নিরাপত্তা ব্যবস্থার চরম দুর্বলতা, কাঠামোগত অব্যবস্থাপনা ও স্থানীয় প্রশাসনিক নজরদারির নিদারুণ অভাবকে আবারও আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে।

 

আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা ও বিশ্লেষকদের মতে, কক্সবাজারসহ দেশের বিভিন্ন সমুদ্রসৈকত ও পর্যটন কেন্দ্রগুলোতে ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে ওঠা অসংখ্য অবৈধ, অপরিকল্পিত ও মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ স্থাপনাগুলোর বিরুদ্ধে অবিলম্বে কঠোর প্রশাসনিক ও আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।

 

পর্যটকদের সার্বিক নিরাপত্তা, কাঠামোগত নিশ্চয়তা এবং দুর্যোগ মোকাবিলার প্রস্তুতি নিশ্চিত করতে না পারলে দেশের অত্যন্ত সম্ভাবনাময় পর্যটন খাত বিশ্বদরবারে মারাত্মকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হবে এবং অর্থনৈতিকভাবে বাধাগ্রস্ত হবে।

 

ইনানীর এই মর্মান্তিক অগ্নিকাণ্ডে নিহতদের শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানানোর পাশাপাশি, দায়ী ব্যক্তিদের অবিলম্বে চিহ্নিত করে আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করার জোর দাবি উঠেছে দেশের সর্বস্তরের সচেতন নাগরিক ও সুশীল সমাজের পক্ষ থেকে।

 

একটি নিরাপদ, টেকসই এবং বিশ্বমানের পর্যটন পরিবেশ গড়ে তুলতে সংশ্লিষ্ট সকল সরকারি ও বেসরকারি সংস্থাকে সমন্বিতভাবে ও কঠোর জবাবদিহিতার মাধ্যমে কাজ করার এখনই সবচেয়ে উপযুক্ত সময়।