রবিবার, অক্টোবর ১৮, ২০২৬
২ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

রিয়াদগামী সব ফ্লাইট অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত করল বিমান

আর এন এস ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৭ অক্টোবর, ২০২৬, ০৯:২৭ পিএম

রিয়াদগামী সব ফ্লাইট অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত করল বিমান
ছবি: সংগৃহীত

সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের ওপর ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের চলমান ও ক্রমবর্ধমান ড্রোন এবং ক্ষেপণাস্ত্র হামলার কারণে উদ্ভূত চরম নিরাপত্তাহীনতার প্রেক্ষাপটে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স।

 

যাত্রীদের জীবনের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা এবং আকাশপথের নির্বিঘ্ন চলাচলের বিষয়টি গভীরভাবে বিবেচনা করে রাষ্ট্রীয় এই পতাকাবাহী বিমান সংস্থাটি ঢাকা থেকে রিয়াদগামী তাদের সকল যাত্রীবাহী ফ্লাইট বা উড্ডয়ন অনির্দিষ্টকালের জন্য সম্পূর্ণ স্থগিত ঘোষণা করেছে।

 

শনিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের পক্ষ থেকে গণমাধ্যমে পাঠানো এক জরুরি ও আনুষ্ঠানিক সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে জনস্বার্থে এই সিদ্ধান্তের কথা নিশ্চিত করা হয়েছে।

 

মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও ব্যস্ত এই আকাশপথে হঠাৎ করে এমন অনাকাঙ্ক্ষিত অচলাবস্থা তৈরি হওয়ায় হাজার হাজার প্রবাসী বাংলাদেশী কর্মী এবং সাধারণ যাত্রীরা এক চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছেন।

 

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর বিভিন্ন নির্ভরযোগ্য প্রতিবেদন থেকে জানা যায় যে, সাম্প্রতিক সময়ে সৌদি আরবের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ শহর ও অর্থনৈতিক স্থাপনা লক্ষ্য করে হুথি বিদ্রোহীদের হামলার মাত্রা আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে।

 

বিশেষ করে রাজধানী রিয়াদ এবং এর পার্শ্ববর্তী গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলগুলোর আকাশসীমা বাণিজ্যিক বিমান চলাচলের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। আন্তর্জাতিক বেসামরিক বিমান চলাচল সংস্থা এবং বৈশ্বিক এভিয়েশন নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো সব সময়ই সংঘাতপূর্ণ এলাকার আকাশসীমা ব্যবহারের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বনের পরামর্শ দিয়ে থাকে।

 

সেই বৈশ্বিক নির্দেশনার প্রতি পূর্ণ শ্রদ্ধা রেখে এবং নিজেদের সম্মানিত যাত্রীদের নিরাপত্তার প্রশ্নে কোনো ধরনের আপস না করার দৃঢ় অবস্থান থেকেই বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স রিয়াদের এই আকাশপথ আপাতত পরিহার করার এই কঠিন সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে এভিয়েশন বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।

 

তবে রিয়াদের আকাশপথ সাময়িকভাবে বন্ধ থাকলেও সৌদি আরবের অন্যান্য গন্তব্যে যাতায়াতের ক্ষেত্রে যাত্রীদের অবর্ণনীয় ভোগান্তি যতটা সম্ভব কমিয়ে আনার লক্ষ্যে বিকল্প বিভিন্ন গঠনমূলক পরিকল্পনা নিয়ে কাজ শুরু করেছে বিমান কর্তৃপক্ষ।

 

সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে জানানো হয়েছে যে, রিয়াদগামী উড্ডয়নগুলো আপাতত বন্ধ থাকলেও, আগামী ২১ অক্টোবর থেকে সৌদি আরবের আরেক গুরুত্বপূর্ণ ও শিল্পোন্নত শহর দাম্মামগামী ফ্লাইট পুনরায় চালু করার একটি জোরালো পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স।

 

যদিও এই পরিকল্পনাটি চূড়ান্ত বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কিছু পদ্ধতিগত ও আন্তর্জাতিক প্রক্রিয়া বাকি রয়েছে। বিমান কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, দাম্মাম আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে উড্ডয়ন ও অবতরণের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট দেশের সিভিল এভিয়েশনের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় আনুষঙ্গিক ও আনুষ্ঠানিক অনুমতি প্রাপ্তির একটি প্রক্রিয়া বর্তমানে চলমান রয়েছে।

 

সেই অনুমতি সাপেক্ষে নির্দিষ্ট সময় থেকেই ওই রুটে পুনরায় আকাশপথে নিরবচ্ছিন্ন যোগাযোগ স্থাপিত হবে বলে প্রবলভাবে আশা করা যাচ্ছে।

অন্যদিকে, রিয়াদ এবং দাম্মামের বর্তমান এই অস্থিতিশীল পরিস্থিতির মধ্যেও সৌদি আরবের অন্য দুটি প্রধান ও পবিত্র গন্তব্য, অর্থাৎ জেদ্দা এবং মদিনাগামী সব উড্ডয়ন যথারীতি ও সম্পূর্ণ স্বাভাবিক নিয়মে পরিচালিত হচ্ছে বলে দ্ব্যর্থহীনভাবে নিশ্চিত করেছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স।

 

ফলে যে সকল প্রবাসী কর্মী বা যাত্রীদের অতি জরুরি প্রয়োজনে এই মুহূর্তে সৌদি আরবে পৌঁছানো একান্তই অপরিহার্য, তারা বিকল্প নিরাপদ রুট হিসেবে জেদ্দা কিং আব্দুল আজিজ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এবং মদিনার প্রিন্স মোহাম্মদ বিন আব্দুল আজিজ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ব্যবহার করে নির্বিঘ্নে তাদের গন্তব্যে যাতায়াত করতে পারবেন।

 

রাষ্ট্রীয় এই বিমান সংস্থাটি এই সংকটময় মুহূর্তে তাদের যাত্রীদের সর্বোচ্চ সুবিধা ও স্বাচ্ছন্দ্য নিশ্চিত করার জন্য এরই মধ্যে বেশ কিছু কার্যকর এবং প্রশংসনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। পরিবর্তিত এই রুটের বাড়তি চাপ অত্যন্ত সুচারুভাবে সামাল দেওয়ার জন্য মদিনা রুটে এরই মধ্যে অধিক যাত্রী ধারণক্ষমতাসম্পন্ন বৃহদাকার উড়োজাহাজ ব্যবহার করা শুরু হয়েছে।

 

বিমানের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এই বিশেষ ব্যবস্থাটি আগামী ১৮ অক্টোবর পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে, যাতে আটকে পড়া যাত্রীরা দ্রুত তাদের গন্তব্যে পৌঁছাতে পারেন এবং কর্মস্থলে যোগ দিতে পারেন। এরপর আগামী ১৯ অক্টোবর থেকে এই মদিনা রুটে পুনরায় আগের নিয়মে আধুনিক প্রযুক্তির বোয়িং ৭৮৭ ড্রিমলাইনার উড়োজাহাজ দিয়ে নিয়মিত উড্ডয়ন কার্যক্রম পরিচালিত হবে।

 

শুধু মদিনা রুটেই নয়, রাজধানী ঢাকা থেকে জেদ্দাগামী রুটেও বর্তমানে যাত্রীদের উপচেপড়া ভিড় ও ব্যাপক চাহিদা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এই বর্ধিত চাহিদার কথা অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করে জেদ্দা রুটেও নিয়মিত ফ্লাইটের পাশাপাশি অতিরিক্ত ফ্লাইট পরিচালনার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করার বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন রয়েছে বলে সংস্থাটি আশ্বস্ত করেছে।

 

আকাশপথের এই আকস্মিক ও অনাকাঙ্ক্ষিত বিপর্যয়ের কারণে গত এক সপ্তাহে বাংলাদেশ থেকে সৌদি আরবগামী যাত্রীদের চরম ভোগান্তির শিকার হতে হয়েছে, যা দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতেও প্রভাব ফেলছে।

 

বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) দেওয়া সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত এক সপ্তাহে রাজধানী ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে সৌদি আরবের রিয়াদ এবং দাম্মাম রুটের সর্বমোট ১১৪টি যাত্রীবাহী উড্ডয়ন বাতিল করতে বাধ্য হয়েছে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন এয়ারলাইন্স।

 

এর ফলে অন্তত ১৭ হাজার ৭০১ জন যাত্রী চরম অনিশ্চয়তা, আর্থিক ক্ষতি এবং মানসিক দুশ্চিন্তার মধ্যে পড়েছেন। এদের মধ্যে একটি বিশাল অংশ হচ্ছেন রেমিট্যান্স যোদ্ধা হিসেবে পরিচিত প্রবাসী বাংলাদেশী কর্মী, যাদের অনেকেরই কর্মস্থলে ছুটি শেষে যোগদানের নির্ধারিত সময়সীমা পার হয়ে যাচ্ছে, আবার অনেকের ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার উপক্রম হয়েছে, যা তাদের জীবিকার ওপর মারাত্মক হুমকি সৃষ্টি করেছে।

 

বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক) বিভিন্ন গণমাধ্যমকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছে, গত শনিবার থেকে শুরু করে বুধবার সন্ধ্যা পর্যন্ত বাতিল হওয়া এই বিপুল সংখ্যক ফ্লাইটের মধ্যে সরাসরি এবং ট্রানজিট-উভয় ধরনের ফ্লাইটই রয়েছে।

 

পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, বাতিল হওয়া উড্ডয়নগুলোর মধ্যে ৫০টি ছিল ঢাকা থেকে সরাসরি সৌদি আরবগামী এবং বাকি ৬৪টি ছিল বিভিন্ন দেশের মাধ্যমে সংযোগ স্থাপনকারী বা ট্রানজিট ফ্লাইট। সরাসরি ফ্লাইট বাতিলের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত হয়েছে দেশি-বিদেশি স্বনামধন্য এয়ারলাইন্সগুলো।

 

এর মধ্যে রাষ্ট্রীয় পতাকাবাহী বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের সর্বোচ্চ ১৮টি ফ্লাইট বাতিল হয়েছে। এছাড়া দেশের শীর্ষস্থানীয় বেসরকারি বিমান সংস্থা ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের ১০টি, সৌদি আরবের রাষ্ট্রীয় বিমান সংস্থা সৌদিয়া এয়ারলাইন্সের ১২টি এবং রিয়াদ এয়ারওয়েজের ১০টি সরাসরি ফ্লাইট যাত্রীদের নিরাপত্তাজনিত এই একই কারণে বাতিল ঘোষণা করা হয়েছে।

 

অন্যদিকে, ট্রানজিট ফ্লাইটের ক্ষেত্রে চিত্রটি আরও বেশি জটিল এবং হতাশাঞ্জক। আন্তর্জাতিক এভিয়েশন নেটওয়ার্ক একে অপরের সাথে অত্যন্ত ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত থাকায় মধ্যপ্রাচ্যের এই অস্থিতিশীলতা অন্যান্য আন্তর্জাতিক রুটের উড্ডয়নগুলোকেও মারাত্মকভাবে প্রভাবিত করেছে।

 

বেবিচকের নির্ভরযোগ্য তথ্যমতে, বাতিল হওয়া ৬৪টি ট্রানজিট ফ্লাইটের মধ্যে ভারতের ইন্ডিগো এয়ারলাইন্সের ২২টি, সংযুক্ত আরব আমিরাতের বিশ্বখ্যাত এমিরেটস এয়ারলাইন্সের ১৪টি, কাতার এয়ারওয়েজের ৯টি, ফ্লাইদুবাইয়ের ৬টি, ওমানের সালামএয়ারের ৭টি, এয়ার ইন্ডিয়ার ৫টি এবং ইজিপ্টএয়ারের একটি ফ্লাইট রয়েছে।

 

এই এয়ারলাইন্সগুলোর যাত্রীদের ঢাকা থেকে যাত্রা শুরু করে নিজ নিজ দেশের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ট্রানজিট নিয়ে চূড়ান্ত গন্তব্য রিয়াদ ও দাম্মামে পৌঁছানোর কথা ছিল। কিন্তু উদ্ভূত ভয়াবহ পরিস্থিতিতে স্ব স্ব দেশ থেকেই রিয়াদ ও দাম্মামগামী চূড়ান্ত ফ্লাইটগুলো বাতিল হয়ে যাওয়ায়, এই আন্তর্জাতিক এয়ারলাইন্সগুলো ঢাকা থেকেও কোনো ট্রানজিট যাত্রীকে বহন করেনি।

 

সার্বিক এই ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি বাংলাদেশের অর্থনীতি এবং প্রবাসী কর্মীদের জীবনে এক গভীর ও সুদূরপ্রসারী নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। সৌদি আরব বর্তমানে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শ্রমবাজার এবং সেখান থেকে প্রতি বছর বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের বৈদেশিক মুদ্রা দেশে আসে, যা দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখে।

 

ফ্লাইট বাতিলের কারণে হাজার হাজার শ্রমিকের কর্মস্থলে ফেরা যখন অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে, তখন সংশ্লিষ্ট পরিবারগুলোতে নেমে এসেছে চরম হতাশা ও উদ্বেগ। এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ এবং কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, মধ্যপ্রাচ্যের এই চলমান সামরিক উত্তেজনা এবং হুথি বিদ্রোহীদের ধারাবাহিক হামলার স্থায়ী অবসান না ঘটলে আকাশপথের এই অচলাবস্থা সহজে কাটবে না।

 

বাংলাদেশ সরকার, বেবিচক এবং সংশ্লিষ্ট সকল এয়ারলাইন্স বর্তমানে প্রতিনিয়ত পরিস্থিতির ওপর তীক্ষ্ণ নজর রাখছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জোরালো কূটনৈতিক হস্তক্ষেপে সৌদি আরবের আকাশসীমা দ্রুত নিরাপদ হবে এবং আটকে পড়া হাজার হাজার রেমিট্যান্স যোদ্ধা ও সাধারণ যাত্রী পুনরায় সম্পূর্ণ নির্বিঘ্নে তাদের নিজ নিজ গন্তব্যে পৌঁছাতে সক্ষম হবেন, এমনটাই এখন সংশ্লিষ্ট সকলের একান্ত প্রত্যাশা।