সোমবার, অক্টোবর ১৯, ২০২৬
৪ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রীর পদ থেকে ইশরাক হোসেনের পদত্যাগ

আর এন এস ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৯ অক্টোবর, ২০২৬, ০২:৫৪ পিএম

মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রীর পদ থেকে ইশরাক হোসেনের পদত্যাগ
ছবি: সংগৃহীত

রাজধানীর গেন্ডারিয়া এলাকায় সাম্প্রতিক এক মাদকবিরোধী অভিযানে গিয়ে জনসমক্ষে নিজের ব্যক্তিগত আগ্নেয়াস্ত্র প্রদর্শনের মাধ্যমে দেশজুড়ে তীব্র বিতর্কের জন্ম দিয়েছিলেন ঢাকা-৬ আসনের সংসদ সদস্য ইশরাক হোসেন।

 

সেই ঘটনার মাত্র দুই দিনের মাথায় সব ধরনের সমালোচনা ও রাজনৈতিক চাপের মুখে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর পদ থেকে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে পদত্যাগ করেছেন। সোমবার দুপুরে রাজধানীর জাতীয় প্রেস ক্লাবে আয়োজিত এক জনাকীর্ণ সংবাদ সম্মেলনে গণমাধ্যমকর্মীদের সামনে তিনি নিজের এই স্বেচ্ছায় পদত্যাগের ঘোষণা দেন।

 

সরকারের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ পদে আসীন থেকে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার মতো এই ঘটনাটি দেশের রাজনৈতিক অঙ্গন থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক সমালোচনার সৃষ্টি করেছিল।

 

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোতেও বিষয়টি নিয়ে আলোচনা শুরু হওয়ায় সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়, যার চূড়ান্ত পরিণতি হিসেবে এই পদত্যাগের ঘটনা ঘটল।

 

ঘটনার প্রকৃত সূত্রপাত হয় গত শনিবার। ওই দিন ঢাকা মহানগরীর গেন্ডারিয়া রেললাইন সংলগ্ন এলাকায় স্থানীয়ভাবে একটি মাদকবিরোধী অভিযানে সশরীরে উপস্থিত হন মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন।

 

ওই অভিযানের এক পর্যায়ে তাকে প্রকাশ্যে হাতে আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে অবস্থান করতে দেখা যায়। মুহূর্তের মধ্যেই সেই দৃশ্য ধারণ করা ভিডিও ও একাধিক স্থিরচিত্র সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ দেশের প্রথম সারির ইলেকট্রনিক ও প্রিন্ট গণমাধ্যমগুলোতে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে।

 

একজন দায়িত্বশীল মন্ত্রী, আইনপ্রণেতা এবং রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হিসেবে তার এই আচরণ কতটা যৌক্তিক বা আইনসম্মত, তা নিয়ে সুশীল সমাজ, মানবাধিকারকর্মী ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা তীব্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন।

 

সচেতন নাগরিকরা প্রশ্ন তোলেন, যেখানে দেশে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার জন্য পুলিশ ও অন্যান্য সুনির্দিষ্ট বাহিনী রয়েছে, সেখানে একজন মন্ত্রী কেন নিজে অস্ত্র হাতে এ ধরনের একটি ঝুঁকিপূর্ণ অভিযানে নেতৃত্ব দেবেন।

 

এ ধরনের কর্মকাণ্ড প্রচলিত আইনের প্রতি অশ্রদ্ধা এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের শামিল কি না, সে বিষয়েও দেশজুড়ে ব্যাপক বিতর্ক শুরু হয়। এই তীব্র বিতর্কের মাঝেই সোমবার দুপুরে জাতীয় প্রেস ক্লাবে একটি জরুরি সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করেন ইশরাক হোসেন।

 

সেখানে উপস্থিত দেশি-বিদেশি সাংবাদিকদের সামনে তিনি অত্যন্ত শান্ত ও গোছানোভাবে নিজের অবস্থানের বিস্তারিত ব্যাখ্যা প্রদান করেন। তিনি তার বক্তব্যে স্মরণ করিয়ে দেন যে, গত জাতীয় নির্বাচনে তিনি ঢাকা-৬ আসন থেকে সাধারণ জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বা বিএনপির মনোনীত প্রার্থী হিসেবে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন।

 

এরপর গত ১২ ফেব্রুয়ারি তিনি একজন জনপ্রতিনিধি হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে শপথ গ্রহণ করেন এবং পরবর্তীতে প্রধানমন্ত্রী তাকে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দেশ ও জাতির সেবা করার গুরুদায়িত্ব অর্পণ করেন।

 

তিনি দাবি করেন, দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই তিনি অত্যন্ত নিষ্ঠা, সততা এবং দেশপ্রেমের সঙ্গে নিজের ওপর অর্পিত রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন। তবে সাম্প্রতিক একটি অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা তার সেই রাজনৈতিক যাত্রায় চরম ছন্দপতন ঘটিয়েছে।

 

সাম্প্রতিক অস্ত্র প্রদর্শনের ঘটনাটি দেশি ও বিদেশি গণমাধ্যমে যেভাবে ফলাও করে প্রচারিত হয়েছে, সে বিষয়ে নিজের অবস্থান পরিষ্কার করতেই মূলত এই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করেছেন বলে জানান সদ্য সাবেক এই প্রতিমন্ত্রী।

 

ইশরাক হোসেন বলেন, গত ৪৮ ঘণ্টায় দেশের প্রায় প্রতিটি সংবাদমাধ্যম এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার অস্ত্র হাতে অভিযানের বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক মাত্রায় আলোচনা, সমালোচনা ও তর্কবিতর্ক হচ্ছে।

 

একজন গণতান্ত্রিক জনপ্রতিনিধি হিসেবে তিনি সাধারণ মানুষের এই স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিক্রিয়াকে বিনম্র শ্রদ্ধার সঙ্গে গ্রহণ করেছেন। একই সঙ্গে তিনি গভীরভাবে উপলব্ধি করেছেন যে, তার এই ব্যক্তিগত একটি পদক্ষেপের কারণে সার্বিকভাবে বর্তমান সরকার এবং তার নিজের দলের ভাবমূর্তি কিছুটা হলেও সাধারণ মানুষের কাছে প্রশ্নের সম্মুখীন হয়েছে।

 

আর সরকারের প্রতি সেই অগাধ দায়বদ্ধতা এবং রাজনৈতিক শিষ্টাচার থেকেই তিনি স্বেচ্ছায় প্রতিমন্ত্রীর পদ থেকে সরে দাঁড়ানোর মতো অত্যন্ত কঠিন কিন্তু সময়োপযোগী সিদ্ধান্তটি গ্রহণ করেছেন।

 

সংবাদ সম্মেলনে তিনি আরও বিস্তারিতভাবে জানান যে, প্রেস ক্লাবে পদত্যাগের আনুষ্ঠানিক ঘোষণার আগেই তিনি সোমবার সকালে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে তার কার্যালয়ে গিয়ে একান্ত সাক্ষাৎ করেন। সেখানে তিনি প্রধানমন্ত্রীকে গত কয়েক দিনের সার্বিক পরিস্থিতি সম্পর্কে অত্যন্ত স্বচ্ছভাবে অবহিত করেন এবং নিজের পদত্যাগের চূড়ান্ত ইচ্ছার কথা স্পষ্টভাবে ব্যক্ত করেন।

 

ইশরাক হোসেনের ভাষ্যমতে, তিনি প্রধানমন্ত্রীকে বিনীতভাবে জানিয়েছেন যে, তার কোনো ব্যক্তিগত বা আবেগতাড়িত কর্মকাণ্ডের কারণে যেন বর্তমান সরকারের সামগ্রিক উন্নয়ন, সুশাসন এবং স্থিতিশীলতার যে ইতিবাচক ধারা চলমান রয়েছে, তা কোনোভাবেই জনসমক্ষে ম্লান না হয়।

 

তিনি মন্ত্রিত্ব থেকে পদত্যাগ করতে চাইলেও, সমাজের দীর্ঘদিনের ক্যানসার হিসেবে পরিচিত মাদকের বিরুদ্ধে তার যে ব্যক্তিগত ও সামাজিক আন্দোলন, তা একজন জনপ্রতিনিধি ও সচেতন নাগরিক হিসেবে ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে বলে তিনি দৃঢ়প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।

 

প্রধানমন্ত্রী তার এই বক্তব্য অত্যন্ত মনোযোগ সহকারে শুনেছেন এবং তার পদত্যাগের ইচ্ছাকে সম্মান জানিয়ে তাকে সেই সুযোগ করে দিয়েছেন বলে ইশরাক হোসেন সাংবাদিকদের নিশ্চিত করেন।

 

উল্লেখযোগ্য যে, সোমবার দুপুরের এই আনুষ্ঠানিক ঘোষণার আগে সকাল থেকেই দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে তার পদত্যাগের বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক গুঞ্জন ও কানাঘুষা চলছিল। সকালে তিনি তার যাচাইকৃত ফেসবুক পেজে একটি বার্তার মাধ্যমে জানিয়েছিলেন যে, তিনি দুপুরে সংবাদ সম্মেলন করে গণমাধ্যমের সামনে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা দিতে যাচ্ছেন।

 

এর আগে রবিবার রাতেই রাজনৈতিক মহলে খবর ছড়িয়ে পড়েছিল যে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার আগেই দলের শীর্ষ পর্যায় থেকে তাকে পদত্যাগের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। প্রশাসনের বিভিন্ন নির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে জানা যায়, প্রধানমন্ত্রী স্বয়ং রবিবার তাকে মন্ত্রিসভা থেকে সম্মানজনকভাবে পদত্যাগ করার কঠোর নির্দেশ প্রদান করেছিলেন।

 

নতুন সরকার কোনোভাবেই একজন প্রতিমন্ত্রীর এহেন বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের দায়ভার গ্রহণ করে নিজেদের পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তি নষ্ট করতে রাজি ছিল না, বিশেষ করে যখন প্রশাসন দেশে সুশাসন ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় বদ্ধপরিকর।

 

তবে রবিবার রাতে যখন এই পদত্যাগের গুঞ্জন চরম আকার ধারণ করে, তখন ইশরাক হোসেনের ব্যক্তিগত কার্যালয় থেকে প্রাথমিকভাবে বিষয়টি সম্পূর্ণ অস্বীকার করা হয়েছিল। প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রেস কর্মকর্তা মাহফুজ কবির মুক্তা রবিবার গভীর রাতে একটি আনুষ্ঠানিক সংবাদ বিজ্ঞপ্তি পাঠালে সেখানে দাবি করা হয় যে, প্রতিমন্ত্রীর পদত্যাগের বিষয়ে গণমাধ্যমে বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যে তথ্য প্রচার করা হচ্ছে, তা সম্পূর্ণ অসত্য, ভিত্তিহীন এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে বিভ্রান্তিকর।

 

কিন্তু সোমবার সকালের দিকে রাজনৈতিক পরিস্থিতির অভাবনীয় ও দ্রুত পরিবর্তন ঘটতে থাকে। শেষ পর্যন্ত নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বার্তা এবং জাতীয় প্রেস ক্লাবের সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে সব ধরনের জল্পনা-কল্পনার চূড়ান্ত অবসান ঘটিয়ে তিনি নিজেই পদত্যাগের বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেন।

 

আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, একজন নির্বাচিত আইনপ্রণেতা এবং মন্ত্রিসভার সদস্যের এভাবে জনসমক্ষে প্রকাশ্যে অস্ত্র প্রদর্শন একটি চরম অনাকাঙ্ক্ষিত এবং রাজনৈতিক শিষ্টাচারবহির্ভূত কাজ।

 

তবে এই ঘটনার পর অত্যন্ত দ্রুততম সময়ের মধ্যে সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে যে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে এবং প্রতিমন্ত্রী যেভাবে বিনয়ের সঙ্গে নিজের ভুল স্বীকার করে বা পরিস্থিতির গভীরতা অনুধাবন করে পদত্যাগ করেছেন, তা বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে একটি অভাবনীয় ও ইতিবাচক বার্তা বহন করে।

 

অতীত সরকারগুলোর সময়ে এ ধরনের ভয়াবহ ও বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের পরও অনেক প্রভাবশালী মন্ত্রী বা সাংসদ ক্ষমতার জোরে বহাল তবিয়তে স্বপদে আসীন থাকতেন, সেখানে মাত্র দুই দিনের মাথায় এই পদত্যাগের ঘটনাটি সরকারি জবাবদিহি ও স্বচ্ছতার একটি নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করল।

 

এখন সচেতন মহলের দেখার বিষয়, ইশরাক হোসেনের পদত্যাগের পর শূন্য হওয়া মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মতো একটি স্পর্শকাতর স্থানে সরকার কাকে নতুন দায়িত্ব প্রদান করে এবং ইশরাক হোসেন একজন সাধারণ সংসদ সদস্য হিসেবে তার নির্বাচনী এলাকায় আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থেকে কীভাবে নিজের রাজনৈতিক কার্যক্রম ও প্রতিশ্রুত মাদকবিরোধী অভিযান পরিচালনা করেন।