সোমবার, অক্টোবর ১৯, ২০২৬
৪ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

স্থানীয় সরকার নির্বাচনে এমপিওভুক্তদের অংশগ্রহণে কোনো আইনি বাধা নেই: আইনমন্ত্রী

আর এন এস ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৯ অক্টোবর, ২০২৬, ০৩:০০ পিএম

স্থানীয় সরকার নির্বাচনে এমপিওভুক্তদের অংশগ্রহণে কোনো আইনি বাধা নেই: আইনমন্ত্রী
ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশের স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলোতে শিক্ষাসমাজের অংশগ্রহণের বিষয়ে দীর্ঘদিন ধরে চলমান বিতর্ক ও আইনি অস্পষ্টতার আনুষ্ঠানিক অবসান ঘটেছে। সরকার স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে যে, দেশের মান্থলি পে অর্ডার বা এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর শিক্ষক ও কর্মচারীদের স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রার্থী হিসেবে অংশগ্রহণ করতে আইনগত কোনো ধরনের বাধা নেই।

 

সোমবার দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জেলা ঝিনাইদহে আয়োজিত এক সরকারি অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে এই আইনি ব্যাখ্যা ও সরকারের সুনির্দিষ্ট অবস্থান তুলে ধরেন আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান।

 

রাষ্ট্রের একজন শীর্ষ আইনপ্রণেতা ও মন্ত্রীর এই সুস্পষ্ট ঘোষণার ফলে সারা দেশের লাখ লাখ এমপিওভুক্ত শিক্ষকের স্থানীয় জনপ্রতিনিধিত্বমূলক নির্বাচনে অংশগ্রহণের পথ সম্পূর্ণ বাধামুক্ত ও পরিষ্কার হলো বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও নির্বাচন বিশেষজ্ঞরা।

 

সোমবার সকালে ঝিনাইদহ প্রাথমিক শিক্ষক প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের নবনির্মিত ভবন উদ্বোধন উপলক্ষে এক সুধী সমাবেশের আয়োজন করা হয়েছিল। স্থানীয় শিক্ষা অবকাঠামোর উন্নয়নে এটি একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ পদক্ষেপ।

 

উদ্বোধনী অনুষ্ঠান শেষে উপস্থিত গণমাধ্যমকর্মীরা আইনমন্ত্রীর কাছে সমসাময়িক আইনি পরিস্থিতি ও আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে শিক্ষকদের অংশগ্রহণের বৈধতা সম্পর্কে জানতে চান। এর জবাবে আইনমন্ত্রী অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে সরকারের অবস্থান স্পষ্ট করেন।

 

তিনি জানান, স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিমন্ত্রী এর আগে শিক্ষকদের নির্বাচনে অংশগ্রহণের বিষয়ে যে আইনি ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন, তা সম্পূর্ণ সঠিক ও যথার্থ। আইনমন্ত্রী বলেন, বর্তমান আইনি কাঠামো অনুযায়ী এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের স্থানীয় পর্যায়ের নির্বাচনে প্রার্থী হতে এখন পর্যন্ত কোনো ধরনের বিধিনিষেধ বা প্রতিবন্ধকতা নেই।

 

যতক্ষণ পর্যন্ত আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এ বিষয়ে নতুন কোনো সিদ্ধান্ত বা সংশোধনী গৃহীত না হচ্ছে, ততক্ষণ পর্যন্ত অতীতের নিয়মই বহাল থাকবে। অর্থাৎ, আইন তার নিজস্ব গতিতে আগের মতোই কার্যকর আছে এবং শিক্ষকরা কোনো ধরনের আইনি বাধা ছাড়াই নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন।

 

এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের নির্বাচনে অংশগ্রহণের বিষয়টি নিয়ে বেশ কিছুদিন ধরেই রাজনৈতিক অঙ্গন এবং সুশীল সমাজে নানামুখী আলোচনা চলছিল। যেহেতু এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা তাদের মূল বেতনের শতভাগ সরকারি কোষাগার থেকে পেয়ে থাকেন, তাই তাদের সরকারি কর্মচারী হিসেবে গণ্য করে নির্বাচনে অংশগ্রহণের অধিকার রহিত করা উচিত কি না, তা নিয়ে একটি আইনি বিতর্ক তৈরি হয়েছিল।

 

তবে আইনমন্ত্রীর এই বক্তব্যের মাধ্যমে এটি প্রতিষ্ঠিত হলো যে, প্রচলিত আইনে এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা সরাসরি প্রজাতন্ত্রের চাকরিজীবী হিসেবে সংজ্ঞায়িত নন। ফলে সাধারণ নাগরিকদের মতো তাদেরও সাংবিধানিক অধিকার রয়েছে স্থানীয় পর্যায়ের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় যুক্ত হওয়ার।

 

বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চল এবং প্রান্তিক জনপদে শিক্ষকরা ঐতিহ্যগতভাবেই অত্যন্ত সম্মানিত এবং প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব হিসেবে বিবেচিত হন। তৃণমূল পর্যায়ের আর্থসামাজিক উন্নয়ন, বিচার-শালিস এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে তাদের অসামান্য অবদান রয়েছে।

 

তাই স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোতে, যেমন ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ বা পৌরসভা নির্বাচনে তাদের অংশগ্রহণের সুযোগ নিশ্চিত করা হলে তা স্থানীয় নেতৃত্বকে আরও শিক্ষিত, পরিশীলিত এবং জনবান্ধব করে তুলবে বলে মনে করছেন সমাজবিজ্ঞানীরা।

 

গণমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে আইনমন্ত্রী কেবল শিক্ষকদের নির্বাচন প্রসঙ্গেই কথা বলেননি, বরং বর্তমান সরকারের সার্বিক সুশাসন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা এবং ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক রূপরেখা নিয়েও অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক বার্তা প্রদান করেন।

 

বিচার বিভাগের সংস্কার এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা নিয়ে এক সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে দেশবাসীর প্রতি সরকারের ওপর অবিচল আস্থা রাখার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, দেশের মানুষ বর্তমান প্রশাসনের প্রতি যে আশা ও বিশ্বাস স্থাপন করেছে, সরকার তার প্রতি সম্পূর্ণ শ্রদ্ধাশীল।

 

তিনি দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করে জানান, বিচার ও প্রশাসন ব্যবস্থায় খুব শিগগিরই দৃশ্যমান এবং ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে, যা দেশের প্রতিটি নাগরিকের অধিকার সুরক্ষায় যুগান্তকারী ভূমিকা পালন করবে। তার এই বক্তব্য মূলত দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে বর্তমান প্রশাসনের রাজনৈতিক সদিচ্ছারই একটি সুস্পষ্ট প্রতিফলন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

 

ঝিনাইদহ জেলা প্রশাসন এবং প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এই উদ্বোধনী অনুষ্ঠানটি স্থানীয় পর্যায়ের একটি উল্লেখযোগ্য আয়োজন ছিল। এই অনুষ্ঠানে আইনমন্ত্রীর পাশাপাশি সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা এবং স্থানীয় পর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বরা উপস্থিত ছিলেন।

 

উদ্বোধনী মঞ্চে অন্যান্যের মধ্যে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সহকারী রাশেদ খাঁন। এছাড়া ঝিনাইদহ জেলার সার্বিক প্রশাসনিক দেখভালের দায়িত্বে নিয়োজিত জেলা প্রশাসক নোমান হোসেন এবং জেলা জাতীয়তাবাদী দল বা বিএনপির সভাপতি ও ঝিনাইদহ জেলা পরিষদের বর্তমান প্রশাসক এম এ মজিদ অনুষ্ঠানে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন।

 

স্থানীয় প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তা এবং রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের এই যৌথ উপস্থিতি প্রমাণ করে যে, দেশের শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়ন এবং অবকাঠামোগত অগ্রগতিতে দলমত নির্বিশেষে সবাই ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করে যাচ্ছেন।

 

নবনির্মিত এই প্রাথমিক শিক্ষক প্রশিক্ষণ কেন্দ্রটি ওই অঞ্চলের প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়ন, শিক্ষকদের আধুনিক শিক্ষাদান পদ্ধতিতে দক্ষ করে তোলা এবং শিক্ষার সার্বিক পরিবেশের গুণগত পরিবর্তনে এক অনন্য মাইলফলক হিসেবে কাজ করবে বলে অনুষ্ঠানে আগত অতিথিরা তাদের বক্তব্যে আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

 

স্থানীয় শিক্ষার ভিত্তি মজবুত করার ক্ষেত্রে এই ধরনের উন্নত অবকাঠামোগত বিনিয়োগ সরকারের সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার অংশ। আইনমন্ত্রী তার বক্তব্যে শিক্ষার প্রসারের পাশাপাশি শিক্ষকদের সামাজিক মর্যাদা ও অধিকার রক্ষার বিষয়েও গুরুত্বারোপ করেন।

 

তিনি পরোক্ষভাবে এই বার্তাই দিয়েছেন যে, দেশ গড়ার কারিগর হিসেবে শিক্ষকদের কেবল শ্রেণিকক্ষেই সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়, বরং বৃহত্তর সমাজ ও রাষ্ট্র বিনির্মাণেও তাদের বলিষ্ঠ ভূমিকা পালনের সুযোগ থাকা বাঞ্ছনীয়।

 

আন্তর্জাতিক গণতান্ত্রিক রীতিনীতি এবং সুশাসনের মাপকাঠিতে বিচার করলে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে সমাজের শিক্ষিত ও সচেতন অংশের অংশগ্রহণ একটি দেশের গণতান্ত্রিক ভিত্তিকে মজবুত করার অন্যতম প্রধান শর্ত।

 

উন্নত বিশ্বেও স্থানীয় প্রশাসন পরিচালনার ক্ষেত্রে শিক্ষক, গবেষক এবং সমাজকর্মীদের অগ্রাধিকার দেওয়া হয়, যাতে নীতি নির্ধারণে প্রজ্ঞার ছাপ থাকে। বাংলাদেশের মতো একটি উন্নয়নশীল দেশে, যেখানে স্থানীয় পর্যায়ে সুশাসন নিশ্চিত করা এবং জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ, সেখানে শিক্ষকদের মতো আদর্শবান পেশার মানুষদের জনপ্রতিনিধি হিসেবে নির্বাচিত হওয়ার সুযোগ আইনিভাবে সুরক্ষিত রাখা একটি অত্যন্ত সময়োপযোগী পদক্ষেপ।

 

আইনমন্ত্রীর এই স্পষ্ট আইনি ব্যাখ্যার ফলে আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলোতে সারা দেশে ব্যাপক উৎসাহ ও উদ্দীপনার সৃষ্টি হবে বলে আশা করা হচ্ছে। যে সব এমপিওভুক্ত শিক্ষক জনপ্রতিনিধি হিসেবে নিজ নিজ এলাকার উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে আগ্রহী ছিলেন কিন্তু আইনি জটিলতার আশঙ্কায় দ্বিধাগ্রস্ত ছিলেন, তারা এখন পূর্ণ আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় যুক্ত হতে পারবেন।

 

সার্বিকভাবে, ঝিনাইদহের এই অনুষ্ঠান থেকে দেওয়া আইনমন্ত্রীর বার্তাটি দেশের রাজনৈতিক ও আইনি পরিমণ্ডলে একটি সুদূরপ্রসারী ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। এটি একদিকে যেমন লাখ লাখ এমপিওভুক্ত শিক্ষকের রাজনৈতিক ও গণতান্ত্রিক অধিকারের আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করেছে, অন্যদিকে দেশের সাধারণ মানুষের মনে আইনের শাসন ও ন্যায়বিচারের প্রতি নতুন করে আশার সঞ্চার করেছে।

 

একটি আধুনিক, গণতান্ত্রিক ও কল্যাণমূলক রাষ্ট্র গঠনে সমাজের প্রতিটি স্তরের মানুষের, বিশেষ করে শিক্ষক সমাজের অবাধ ও স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ যে অপরিহার্য, সরকারের এই সুস্পষ্ট নীতিগত অবস্থানের মাধ্যমে তা আবারও সর্বসমক্ষে প্রমাণিত হলো।

 

আগামী দিনগুলোতে এই আইনি স্বাধীনতার ইতিবাচক প্রতিফলন দেশের স্থানীয় রাজনীতি, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা এবং তৃণমূলের উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে কীভাবে দৃশ্যমান হয়, সচেতন নাগরিক সমাজ এখন সেদিকেই গভীর মনোযোগের সঙ্গে দৃষ্টি রাখছে।