তিনি দৃঢ়তার সাথে উল্লেখ করেছেন যে, এই চুক্তি চূড়ান্ত না হওয়া পর্যন্ত তেহরানের অবরুদ্ধ শত শত কোটি ডলারের আর্থিক সম্পদ কোনোভাবেই অবমুক্ত করা হবে না।
গত রবিবার মার্কিন গণমাধ্যম এনবিসি নিউজের ‘মিট দ্য প্রেস’ অনুষ্ঠানে দেওয়া একটি বিশেষ সাক্ষাৎকারে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তাঁর এই কঠোর অবস্থানের পুনরুল্লেখ করেন।
তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দেন, ইরান যদি আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে ইতিবাচক আচরণ ও গঠনমূলক পদক্ষেপ প্রদর্শন করে, কেবল তবেই এই বিষয়ে দ্বিপাক্ষিক আলোচনা শুরু হতে পারে।
অন্যথায় জব্দকৃত বিপুল পরিমাণ অর্থ ছাড়ের ব্যাপারে কোনো সহজ সমঝোতার পথ খোলা নেই। দীর্ঘদিনের পারস্পরিক গভীর অবিশ্বাসের জেরে ইরানের নীতিপ্রণেতারা অবশ্য সম্পূর্ণ ভিন্ন অবস্থান গ্রহণ করেছেন।
তেহরানের পক্ষ থেকে বারবার দাবি করা হচ্ছে যে, অবরুদ্ধ সম্পদের অন্তত একটি অংশ প্রাথমিকভাবে অবমুক্ত না করা হলে তারা কোনো ধরনের নতুন চুক্তিতে স্বাক্ষর করবে না।
ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, সামগ্রিক যুদ্ধবিরতি প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে তারা বর্তমানে ১২ থেকে ২৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার সমমূল্যের জব্দ সম্পদ অবমুক্ত করার দাবি জানাচ্ছে।
তাদের প্রস্তাব অনুসারে, চুক্তি স্বাক্ষরের সাথে সাথেই এই অর্থের অর্ধেক ছাড় করতে হবে এবং অবশিষ্ট অংশ পরবর্তী ধাপে পরিশোধ করা হবে। ইরানের সর্বোচ্চ নেতার সামরিক উপদেষ্টা মোহসেন রেজায়ী আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম সিএনএনকে দেওয়া এক বিবৃতিতে জানিয়েছেন, বর্তমান শান্তি আলোচনায় এক ধরনের অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে এবং এই অর্থছাড়ের বিষয়টি মূলত মার্কিন আন্তরিকতা প্রমাণের একটি প্রধান পরীক্ষা।
বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ব্যাংকে নিষেধাজ্ঞার কারণে ইরানের প্রায় ১০০ বিলিয়ন ডলারের বেশি সম্পদ অবরুদ্ধ অবস্থায় রয়েছে। কূটনৈতিক মহলে কয়েক সপ্তাহ ধরে একটি সম্ভাব্য সমঝোতার গুঞ্জন শোনা গেলেও হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি এবং অবরুদ্ধ সম্পদ-এই তিনটি প্রধান বিষয়ে এখনো কোনো উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জিত হয়নি।
এই কূটনৈতিক অচলাবস্থার মাঝেই মার্কিন প্রশাসন ইরানের বিরুদ্ধে নতুন করে বড় ধরনের সামরিক অভিযানের হুমকি অব্যাহত রেখেছে। উইসকনসিনে দেওয়া অন্য এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প সতর্ক করে বলেন, হয় খুব দ্রুত একটি চূড়ান্ত চুক্তি স্বাক্ষরিত হবে, অন্যথায় ইরানের ওপর ভয়াবহ সামরিক আঘাত হানা হবে।
এই সামরিক উত্তেজনার মধ্যেই সম্প্রতি ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। সংঘাতের শুরুর দিকে মার্কিন হামলায় গুরুতর আহত হয়ে ইরানের পূর্বতন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র মোজতবা খামেনি দেশটির শীর্ষ নেতৃত্বের দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট তাঁর অবস্থান নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন বলে জানিয়েছেন।
এদিকে মধ্যপ্রাচ্যের সামগ্রিক পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে লেবানন সংকট। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প জানিয়েছেন, প্রস্তাবিত এই দ্বিপাক্ষিক যুদ্ধবিরতি চুক্তির পরিধিতে তিনি লেবাননকে অন্তর্ভুক্ত করতে বাধ্য করছেন না।
তবে লেবাননে হিজবুল্লাহর অবস্থান লক্ষ্য করে ইসরায়েলের অব্যাহত বিমান হামলা পুরো কূটনৈতিক প্রক্রিয়াকে চরম ঝুঁকির মুখে ফেলেছে। ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ ইতোমধ্যে সতর্কবার্তা উচ্চারণ করে বলেছেন, দক্ষিণ বৈরুতে ইসরায়েলি আগ্রাসন এবং ইরানি বন্দরে মার্কিন নৌ অবরোধের বিরুদ্ধে তেহরান কঠোর পাল্টা ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারে।
তবে মার্কিন প্রশাসনের পক্ষ থেকে এই আঞ্চলিক সংঘাতের জন্য সম্পূর্ণভাবে হিজবুল্লাহকে দায়ী করা হচ্ছে, যা এই শান্তি প্রক্রিয়াকে আরও দীর্ঘায়িত ও জটিল করে তুলছে।