সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য ও যুদ্ধপরবর্তী দূরদর্শিতার অভাবে এই সংঘাত ওয়াশিংটনের জন্য একটি উভয়-সংকটে পরিণত হয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসনের পক্ষ থেকে ইরানি শাসনব্যবস্থার পতন, দেশটির আঞ্চলিক প্রভাব খর্ব এবং পারমাণবিক সক্ষমতা নস্যাৎ করার যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, তার একটিও শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়িত হয়নি।
দীর্ঘস্থায়ী এই সংঘাতের অবসান ঘটেছে তেহরানের বর্তমান নেতৃত্বের সঙ্গেই তড়িঘড়ি করে একটি আংশিক চুক্তি স্বাক্ষরের মাধ্যমে, যা ওয়াশিংটনের পূর্ববর্তী কঠোর অবস্থানকে গভীরভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
এই যুদ্ধ ইরানের সাধারণ জনগণের অধিকার আদায়ের ক্ষেত্র তৈরি করতে পারেনি বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা। নরওয়েভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা ইরান হিউম্যান রাইটসের পরিচালক মাহমুদ আমিরি-মোগাদ্দাম স্পষ্ট করেছেন যে, এই সংঘাত অভ্যন্তরীণ অধিকার রক্ষার লড়াই ছিল না, বরং ইরানি কর্তৃপক্ষ একে সাধারণ মানুষের ওপর দমনপীড়ন জোরদার করার একটি মোক্ষম অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করেছে।
তেহরানের এক সাধারণ বাসিন্দা ক্ষোভ প্রকাশ করে জানিয়েছেন, ইসলামি প্রজাতন্ত্রের সঙ্গে ওয়াশিংটনের যেকোনো শান্তি চুক্তি মূলত তাদের ওপর নির্যাতনকারীদের বৈধতা দেওয়ার শামিল।
ফলে এই সংঘাত ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক কাঠামোতে ইতিবাচক পরিবর্তন আনার পরিবর্তে সরকারকে গত চার দশক ধরে চর্চা করা কণ্ঠরোধ ও ভুক্তভোগী হওয়ার চেনা রাজনৈতিক আখ্যানকে নতুন করে প্রচার করার সুযোগ করে দিয়েছে।
এদিকে ব্রিটিশ গণমাধ্যম দ্য টেলিগ্রাফের জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ডেভিড ব্লেয়ারের মতে, হাজার হাজার বিমান হামলা চালিয়েও এই শাসনব্যবস্থার পতন ঘটানো যায়নি এবং ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর আঞ্চলিক প্রভাব অবদমিত করা সম্ভব হয়নি।
মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউটের বিশ্লেষক অ্যালান আয়ার মনে করেন, সামরিক শক্তি ব্যবহারের মতো সবচেয়ে শক্তিশালী কৌশলটি আগেই ব্যবহার করে ফেলায় আন্তর্জাতিক মহলে যুক্তরাষ্ট্রের একচ্ছত্র প্রভাব খর্ব হয়েছে।
অন্যপক্ষে, ইরান প্রথাগত সামরিক বিজয় অর্জন না করলেও বিপুল ক্ষয়ক্ষতি ও জ্যেষ্ঠ কমান্ডারদের হারানোর পরও নিজেদের রাজনৈতিক অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে সক্ষম হয়েছে।
ফরাসি বার্তা সংস্থা এএফপির এক বিশ্লেষক জানান, মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে যেকোনো প্রতিকূলতার মধ্যে কেবল টিকে থাকাই ইরানের জন্য এক ধরনের বড় রাজনৈতিক বিজয় হিসেবে গণ্য হচ্ছে।
এই পুরো প্রক্রিয়ায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে উপসাগরীয় অঞ্চলের রাষ্ট্রগুলো। রয়টার্সের এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যে, ইরান ইরাকে নতুন গোপন গোষ্ঠী গঠন করে কুয়েত, সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো দেশের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোতে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে।
ওয়াশিংটন ও তেহরানের এই সাম্প্রতিক সমঝোতা উপসাগরীয় দেশগুলোকে চরম নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে ফেলে দিয়েছে, কারণ এই চুক্তির মাধ্যমে ইরান পুনরায় একটি অপরিহার্য আলোচনার অংশীদার হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক উপ-পররাষ্ট্রসচিব ওয়েন্ডি শেরম্যানসহ অনেক মার্কিন সমালোচকও এই চুক্তির দীর্ঘমেয়াদী কার্যকারিতা নিয়ে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন।
পরিশেষে, কোনো সুনির্দিষ্ট কৌশল ছাড়াই এই সংঘাত থেকে বিদায় নেওয়ায় মধ্যপ্রাচ্যের মিত্ররা এখন নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আমেরিকার পরিবর্তনশীল অগ্রাধিকারের ওপর নির্ভর করার চেয়ে স্বাবলম্বী হওয়ার প্রয়োজনীয়তা তীব্রভাবে অনুভব করছে।