এই ঐতিহাসিক মাইলফলক স্মরণীয় করে রাখতে যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ছবি সংবলিত ১ ডলারের একটি সম্পূর্ণ নতুন ও সোনালি রঙের স্মারক কয়েন তৈরি করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে দেশটির রাষ্ট্রীয় মুদ্রা নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ‘ইউএস মিন্ট’।
চলতি সপ্তাহে মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট আনুষ্ঠানিকভাবে এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে এই খবর প্রকাশ করেছে, যা মার্কিন রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
নতুন এই স্মারক মুদ্রার নকশা ও নান্দনিকতা বেশ আকর্ষণীয় ও তাৎপর্যপূর্ণ করা হয়েছে। প্রস্তাবিত নকশা অনুযায়ী, মুদ্রার এক পিঠে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রতিকৃতি স্থান পাবে এবং তার ঠিক পাশেই লেখা থাকবে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় মূলমন্ত্র ‘আমরা ঈশ্বরে বিশ্বাস করি’।
এছাড়া মুদ্রার চারপাশ ঘিরে লেখা থাকবে ‘স্বাধীনতা’ শব্দটি এবং এর সঙ্গে উল্লেখ থাকবে ‘১৭৭৬-২০২৬’ সাল, যা মূলত যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতার আড়াইশো বছরের সুদীর্ঘ পথচলাকে নির্দেশ করবে। মুদ্রার অপর পিঠে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় প্রতীকের আদলে একটি শক্তিশালী ঈগলের প্রতিকৃতি খোদাই করা থাকবে।
ঈগলটির এক পায়ে থাকবে প্রতিরোধের প্রতীক হিসেবে কয়েকটি তির এবং অন্য পায়ে থাকবে শান্তির প্রতীক হিসেবে জলপাই গাছের শাখা। ইউএস মিন্ট-এর নকশা ব্যবস্থাপনা দপ্তরের ভারপ্রাপ্ত প্রধান মেগান সুলিভান এই মুদ্রার বাহ্যিক গঠন সম্পর্কে জানিয়েছেন যে, এটি প্রচলিত ২৫ সেন্টের মুদ্রার চেয়ে আকারে কিছুটা বড় হবে।
এটি মূলত ম্যাঙ্গানিজ ও পিতল দিয়ে তৈরি হবে, যার ফলে এটি দেখতে বেশ উজ্জ্বল সোনালি রঙের হবে। দ্বিতীয় মেয়াদে হোয়াইট হাউসের ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকেই ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং তার প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তারা সরকারি বিভিন্ন নথিপত্র ও মুদ্রায় প্রেসিডেন্টের নাম এবং ছবি ব্যবহারের জোর প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।
১ ডলারের এই কয়েনটি সেই ধারাবাহিকতারই একটি অংশ। এর আগে ট্রাম্পের ছবি সংবলিত বিশেষ স্মারক পাসপোর্ট চালু করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। পাশাপাশি নতুন মুদ্রিত ১০০ ডলারের নোটে ট্রাম্পের স্বাক্ষর যুক্ত করার বিষয়টিও ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়েছে।
এখানেই শেষ নয়, এর বাইরেও সম্পূর্ণ ২৪ ক্যারেটের স্বর্ণের মুদ্রা এবং ২৫০ ডলারের বিশেষ স্মারক নোটে প্রেসিডেন্টের ছবি রাখার প্রস্তাব নিয়ে কাজ করছে প্রশাসন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই উদ্যোগের পক্ষে জোরালো অবস্থান নিয়েছেন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট।
এক বার্তায় তিনি উল্লেখ করেছেন যে, এই নতুন মুদ্রাটি মূলত আমেরিকান মূল্যবোধের অন্তর্নিহিত শক্তি এবং সবার জন্য স্বাধীনতা বজায় রাখতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ এক মহান জাতির দৃঢ় অঙ্গীকারকেই উদ্যাপন করে।
তবে এই মুদ্রার নকশা ও আইনি বৈধতা নিয়ে এরই মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে বেশ কিছু বিতর্ক ও সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। প্রাথমিকভাবে কয়েনটির যে খসড়া নকশা তৈরি করা হয়েছিল, তাতে পেনসিলভানিয়া অঙ্গরাজ্যে একটি নির্বাচনী জনসভায় ট্রাম্পের ওপর হওয়া গুপ্তহত্যার চেষ্টার স্মৃতিকে স্মরণ করার প্রস্তাব ছিল।
ওই নকশায় ট্রাম্পের মুষ্টিবদ্ধ হাতের ছবি এবং তার বিখ্যাত স্লোগান ‘লড়াই লড়াই লড়াই’ কথাটি যুক্ত করার চিন্তাভাবনা ছিল। পরবর্তীতে সেই সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসে প্রশাসন। বর্তমানে সবচেয়ে বড় আইনি বিতর্ক তৈরি হয়েছে মুদ্রায় একজন জীবিত প্রেসিডেন্টের ছবি রাখা নিয়ে।
২০২০ সালে মার্কিন কংগ্রেসে পাস হওয়া এক আইন অনুযায়ী, ট্রেজারি বিভাগ স্বাধীনতার ২৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে ১ ডলারের কয়েন তৈরি করার এখতিয়ার রাখে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের প্রচলিত দীর্ঘদিনের বিধি ও ঐতিহ্য অনুযায়ী, সাধারণত কেবল মৃত বা প্রয়াত ঐতিহাসিক ব্যক্তিদের ছবিই মুদ্রায় ব্যবহারের অনুমতি রয়েছে।
এই আইনি বাধার বিষয়ে সমালোচকদের জবাব দিতে গিয়ে অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট একটি ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত তুলে ধরেছেন। মার্কিন সংবাদমাধ্যমে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, অতীতে যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতার ১৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ক্যালভিন কুলিজের ছবি সংবলিত একটি বিশেষ কয়েন তৈরি করা হয়েছিল।
যেহেতু ইতিহাসে এমন নজির রয়েছে, তাই বর্তমান মুদ্রায় একজন জীবিত প্রেসিডেন্টের ছবি রাখা সম্পূর্ণ সম্ভব এবং তা আইনের কোনো বরখেলাপ নয়। ইউএস মিন্ট-এর কর্মকর্তা মেগান সুলিভানও নিশ্চিত করেছেন যে, তারা ব্যাপক আইনি গবেষণা করে দেখেছেন এবং এই মুদ্রার চূড়ান্ত নকশা দেশের কোনো বিদ্যমান আইন লঙ্ঘন করে না।
মুদ্রার চূড়ান্ত নকশা অনুমোদনের ক্ষেত্রেও কিছু প্রশাসনিক মতানৈক্য দেখা গিয়েছিল। ট্রাম্পের মনোনীত সদস্যদের নিয়ে গঠিত ‘কমিশন অব ফাইন আর্টস’ এই মুদ্রার নকশার বিষয়ে বেশ কিছু সুপারিশ করেছিল। কমিশন প্রাথমিকভাবে ট্রাম্পের পার্শ্বচিত্র ব্যবহারের সুপারিশ করলেও চূড়ান্ত নকশায় তার সরাসরি সামনের দিকের ছবি রাখা হয়েছে।
মার্কিন প্রশাসনিক নিয়ম অনুযায়ী, মুদ্রার নকশা চূড়ান্ত করার ক্ষেত্রে অর্থমন্ত্রীর সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত বলে গণ্য হয়। উল্লেখ্য, এই ১ ডলারের সাধারণ মুদ্রাগুলো ট্রেজারি বিভাগের তৈরি ২৪ ক্যারেট স্বর্ণের বিশেষ মুদ্রাগুলো থেকে সম্পূর্ণ আলাদা।
ওই স্বর্ণমুদ্রাগুলোর বাজারমূল্য কয়েক হাজার ডলার পর্যন্ত হতে পারে। গত জুন মাসে মার্কিন সিনেটের ডেমোক্র্যাট দলীয় সদস্যরা এই বিশেষ স্বর্ণের মুদ্রা উৎপাদন বন্ধের জোর দাবি জানিয়েছিলেন। তাদের গভীর আশঙ্কা ছিল যে, ইউএস মিন্ট-এর তৈরি এই মহামূল্যবান স্বর্ণের মুদ্রাগুলোর সঙ্গে বিদেশি সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্রের সংশ্লিষ্টতা তৈরি হতে পারে, যা দেশের অর্থনীতির জন্য মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ।