বুধবার, জুলাই ১৫, ২০২৬
৩১ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

যৌন নিপীড়ন ও মানহানি মামলায় ৫৬ লাখ ডলার ক্ষতিপূরণ দিলেন ট্রাম্প

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৫ জুলাই, ২০২৬, ০১:৫১ পিএম

যৌন নিপীড়ন ও মানহানি মামলায় ৫৬ লাখ ডলার ক্ষতিপূরণ দিলেন ট্রাম্প
ছবি : Collected

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিরুদ্ধে দায়ের করা বহু আলোচিত যৌন নিপীড়ন ও মানহানি মামলার একটি বড় অধ্যায়ের অবশেষে সমাপ্তি ঘটেছে। দীর্ঘ আইনি লড়াই শেষে মার্কিন লেখিকা ই জিন ক্যারল ক্ষতিপূরণ বাবদ ৫৬ লাখ ডলারের বেশি অর্থ শেষ পর্যন্ত বুঝে পেয়েছেন।

 

একটি দেওয়ানি মামলায় মার্কিন আদালতের সুনির্দিষ্ট নির্দেশনার পর এই বিপুল অঙ্কের অর্থ আনুষ্ঠানিকভাবে তাঁর কাছে হস্তান্তর করা হয়। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো বিচারিক প্রক্রিয়ার এই চূড়ান্ত পরিণতির খবর অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে প্রকাশ করেছে।

 

আদালতের প্রাথমিক রায়ে জুরি বোর্ড ক্যারলকে মূল ক্ষতিপূরণ হিসেবে পঞ্চাশ লাখ বা পাঁচ মিলিয়ন ডলার দেওয়ার নির্দেশ প্রদান করেছিল। পরবর্তীতে দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ায় সময়ক্ষেপণের কারণে এর সঙ্গে আরও যুক্ত হয় আইন অনুযায়ী নির্ধারিত সুদের টাকা।

 

সব মিলিয়ে ৫৬ লাখ ডলারের এই বিশাল তহবিল একটি বিশেষ আইনি অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে সোমবার আনুষ্ঠানিকভাবে ক্যারলের কাছে হস্তান্তর করা হয়। ক্যারলের প্রধান আইনজীবী রবার্টা কাপলান এই অর্থ প্রাপ্তির বিষয়টি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের কাছে নিশ্চিত করেছেন।

 

এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে তিনি আনন্দ প্রকাশ করে জানান যে, আইনি নির্দেশনার পর ক্ষতিপূরণের পুরো অর্থ তাঁরা হাতে পেয়েছেন। অন্যদিকে, আইনি প্রক্রিয়ায় অর্থ বুঝে পাওয়ার পর বিরাশি বছর বয়সী এই প্রবীণ লেখিকা ও সাবেক পরামর্শ কলামিস্ট নিজের এক লেখায় অত্যন্ত রসাত্মক ও তৃপ্তির সুরে মন্তব্য করেছেন।

 

এই আইনি বিজয়ের পর তিনি লিখেছেন, 'দ্য ইগল হ্যাজ ল্যান্ডেড', যার ভাবার্থ হলো দীর্ঘ কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যের সফল অর্জন। আদালতের আইনি নথি এবং বিচারিক প্রক্রিয়া নিবিড়ভাবে পর্যালোচনা করে জানা যায়, ২০২৩ সালে নিম্ন আদালতের প্রাথমিক রায়ের পর থেকেই এই বিপুল পরিমাণ অর্থ একটি বিশেষ এসক্রো বা সংরক্ষিত অ্যাকাউন্টে অত্যন্ত সুরক্ষিতভাবে জমা করে রাখা হয়েছিল।

 

সম্প্রতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট বা দেশটির সর্বোচ্চ আদালত দেওয়ানি মামলার এই রায়টি চূড়ান্তভাবে বহাল রাখার নির্দেশ প্রদান করে। সর্বোচ্চ আদালতের এই অকাট্য নির্দেশনার পর ফেডারেল বিচারক লুইস এ কাপলান সংরক্ষিত ওই অর্থ অবমুক্ত করে ক্যারলকে সম্পূর্ণভাবে বুঝিয়ে দেওয়ার জন্য চূড়ান্ত আইনি আদেশ জারি করেন।

 

এই আদেশের পরপরই ট্রাম্পের আইনজীবীরা অর্থ প্রদানের প্রক্রিয়াটি সাময়িকভাবে স্থগিত করার উদ্দেশ্যে শেষ মুহূর্তে একটি জরুরি আইনি আবেদন দায়ের করেছিলেন। কিন্তু বিচারক অত্যন্ত কঠোর অবস্থানে থেকে এক বাক্যে সেই আবেদন নাকচ করে দেন এবং অর্থ হস্তান্তরের আইনি পথ সম্পূর্ণরূপে সুগম করে দেন।

 

তবে ক্ষতিপূরণের অর্থ হস্তান্তর প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলেও আইনি লড়াইয়ের এখানেই চূড়ান্ত সমাপ্তি ঘটছে না বলে ইঙ্গিত মিলেছে। ট্রাম্পের আইনজীবীরা ইতিমধ্যেই দৃঢ়তার সঙ্গে ঘোষণা দিয়েছেন যে, তাঁরা এই রায়ের বিরুদ্ধে আইনি লড়াই অব্যাহত রাখবেন এবং উচ্চ আদালতে আপিল প্রক্রিয়া সমানতালে চালিয়ে যাবেন।

 

এমনকি ক্ষতিপূরণের অর্থ প্রদান বাতিল বা সম্পূর্ণ প্রত্যাহারের দাবিতে ট্রাম্পের আইনি দল নতুন করে আরেকটি আপিল আবেদনও আদালতে জমা দিয়েছে। এদিকে ক্যারলের আইনজীবীরা আদালতের নথিতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন যে, প্রাপ্ত এই বিশাল অঙ্কের অর্থ ক্যারল আপাতত তাঁর অবসরের জন্য নির্ধারিত বিশেষ তহবিলে জমা রাখার পরিকল্পনা গ্রহণ করেছেন, যাতে ভবিষ্যৎ জীবনে তাঁর কোনো আর্থিক অনিশ্চয়তা না থাকে এবং তিনি নিশ্চিন্তে জীবনযাপন করতে পারেন।

 

এই চাঞ্চল্যকর মামলার পূর্ববর্তী বিবরণ থেকে জানা যায়, ঘটনাটির সূত্রপাত হয়েছিল আজ থেকে প্রায় তিন দশক আগে। ১৯৯৬ সালে নিউইয়র্কের একটি বিলাসবহুল ডিপার্টমেন্টাল স্টোরের পোশাক পরিবর্তনের কক্ষে ডোনাল্ড ট্রাম্প ওই লেখিকাকে শারীরিকভাবে হেনস্থা ও যৌন নিপীড়ন করেছিলেন বলে অভিযোগ ওঠে।

 

পরবর্তীতে দীর্ঘ সময় পর, ২০১৯ সালে ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হিসেবে তাঁর প্রথম মেয়াদে হোয়াইট হাউসে দায়িত্ব পালন করছিলেন, ঠিক সেই সময়ে ক্যারল তাঁর লেখা একটি আত্মজীবনীমূলক স্মৃতিচারণ গ্রন্থে এই গোপন ঘটনাটি জনসমক্ষে প্রকাশ করেন।

 

বইটি প্রকাশের পরপরই ট্রাম্প সম্পূর্ণ অভিযোগটি অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে অস্বীকার করেন। সে সময় ট্রাম্প প্রকাশ্যে দাবি করেছিলেন যে, ক্যারল সম্পূর্ণ মিথ্যাচার করছেন এবং ঘটনাটি সম্পূর্ণ বানোয়াট। এমনকি তিনি ক্যারলকে নিয়ে আপত্তিকর মন্তব্য করে বলেছিলেন যে, ক্যারল তাঁর 'পছন্দের ধরনের নারী' নন।

 

একজন প্রভাবশালী রাষ্ট্রপতির কাছ থেকে এমন অপমানজনক ও মানহানিকর মন্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতেই ক্যারল আইনি প্রতিকার চেয়ে মানহানির মামলা দায়ের করতে বাধ্য হন। ক্যারলের এই আইনি লড়াইয়ের পথটি মোটেও সহজ ও মসৃণ ছিল না।

 

নিউইয়র্ক অঙ্গরাজ্যের পরিবর্তিত একটি বিশেষ আইনি কাঠামোর সুবিধা নিয়ে তিনি এই পুরনো অপরাধের বিচার চাইতে সরাসরি আদালতের দ্বারস্থ হয়েছিলেন। এই বিশেষ আইনে দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হওয়ার পরও যৌন নিপীড়নের শিকার ভুক্তভোগীদের নতুন করে আইনি লড়াই বা মামলা করার একটি বিরল ও বিশেষ সুযোগ প্রদান করা হয়েছিল।

 

এই যুগান্তকারী সুযোগ কাজে লাগিয়েই ক্যারল ক্ষমতাধর ট্রাম্পকে বিচারের মুখোমুখি করেন। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এই স্পর্শকাতর মামলার মূল শুনানির সময় ট্রাম্প নিজে কখনোই আদালতে উপস্থিত ছিলেন না।

 

এদিকে, এই ৫৬ লাখ ডলারের মামলার বাইরেও ২০২৪ সালে আরেকটি পৃথক বিচার প্রক্রিয়ায় ক্যারলকে আরও বিশাল অঙ্কের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। ওই রায়ে ক্যারলকে তিরাশি মিলিয়ন বা আট কোটি ত্রিশ লাখ ডলার মানহানির ক্ষতিপূরণ প্রদানের নির্দেশ দেয় আদালত।

 

বর্তমানে ডোনাল্ড ট্রাম্প সেই বিশাল অঙ্কের রায়ের বিরুদ্ধেও উচ্চ আদালতে আপিল আবেদন সচল রেখেছেন এবং দীর্ঘমেয়াদি আইনি লড়াই চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (এপি) সূত্রে এই চাঞ্চল্যকর ও গুরুত্বপূর্ণ সংবাদটি নিশ্চিত করা হয়েছে।

 

- এপি