মঙ্গলবার, জুন ৩০, ২০২৬
১৬ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ভেনেজুয়েলায় ভূমিকম্পে প্রায় ৫৮ হাজার ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার তথ্য

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ৩০ জুন, ২০২৬, ০৮:০৬ পিএম

ভেনেজুয়েলায় ভূমিকম্পে প্রায় ৫৮ হাজার ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার তথ্য
ছবি: Collected

দক্ষিণ আমেরিকার রাষ্ট্র ভেনেজুয়েলায় গত সপ্তাহে আঘাত হানা প্রলয়ঙ্করী জোড়া ভূমিকম্পে ক্ষয়ক্ষতির এক ভয়াবহ ও অকল্পনীয় চিত্র এবার মহাকাশ থেকে ধরা পড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসার অত্যাধুনিক কৃত্রিম উপগ্রহ বা স্যাটেলাইট থেকে প্রাপ্ত চিত্রগুলো বিশ্লেষণ করে বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন যে, এই প্রাকৃতিক দুর্যোগে দেশটিতে প্রায় ৫৮ হাজারেরও বেশি ভবন ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত অথবা সম্পূর্ণরূপে ধসে পড়েছে।

 

স্থানীয় সময় গত বুধবার সন্ধ্যায় পরপর ৭ দশমিক ২ এবং ৭ দশমিক ৫ মাত্রার দুটি অত্যন্ত শক্তিশালী ভূমিকম্প দেশটিতে আঘাত হানে। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, এই ভয়াবহ দুর্যোগে এখন পর্যন্ত এক হাজার সাতশ মানুষের মর্মান্তিক প্রাণহানি ঘটেছে।

 

ভূতাত্ত্বিক ও ইতিহাসবিদদের মতে, গত এক শতাব্দীরও বেশি সময়ের মধ্যে ভেনেজুয়েলার মাটিতে এটিই সবচেয়ে প্রাণঘাতী ও ধ্বংসাত্মক ভূমিকম্পের ঘটনা। এই বিশাল ক্ষয়ক্ষতির বৈজ্ঞানিক ভিত্তিটি উঠে এসেছে যুক্তরাষ্ট্রের ওরেগন স্টেট ইউনিভার্সিটির দুজন প্রখ্যাত গবেষক কোরে স্কার এবং জেমন ভন ডেন হোয়েকের নিবিড় গবেষণার মাধ্যমে।

 

গত ২৫ জুন ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থার উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন রাডার থেকে প্রাপ্ত উপগ্রহ চিত্রগুলো অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে বিশ্লেষণ করে তারা এই যুগান্তকারী তথ্য জনসমক্ষে প্রকাশ করেছেন। গবেষক দলের তথ্যমতে, ভূমিকম্পের পরপরই ধারণকৃত ওই রাডার উপাত্তগুলো স্পষ্টভাবে নির্দেশ করছে যে, দুর্গত এলাকাগুলোতে অন্তত ৫৮ হাজার ৮৭০টি আবাসিক ও বাণিজ্যিক ভবন আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত বা পুরোপুরি ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে।

 

মহাকাশ থেকে নেওয়া এই উচ্চ রেজ্যুলেশনের ছবিগুলো মূলত ভূপৃষ্ঠের আকস্মিক ও ব্যাপক কাঠামোগত পরিবর্তনের একটি সুস্পষ্ট প্রামাণ্য দলিল হিসেবে কাজ করছে। গবেষক কোরে স্কার এবং জেমন ভন ডেন হোয়েক তাদের এই পর্যবেক্ষণের বিষয়ে অত্যন্ত পেশাদার ও সতর্ক প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন।

 

তারা আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন যে, উপগ্রহ থেকে প্রাপ্ত এই তথ্যগুলো মূলত একটি প্রাথমিক এবং তাৎক্ষণিক পর্যবেক্ষণ। রাডারের ছবিগুলোতে ভূপৃষ্ঠের উপরিভাগে যে আকস্মিক ও অস্বাভাবিক পরিবর্তনগুলো লক্ষ্য করা গেছে, তা মূলত ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির একটি শক্তিশালী ও বৈজ্ঞানিক লক্ষণ।

 

তবে বৈজ্ঞানিক সততার জায়গা থেকে এই দুই বিশেষজ্ঞ গবেষক স্পষ্টভাবেই উল্লেখ করেছেন যে, ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত মাত্রা নিরূপণের জন্য উপগ্রহ চিত্রের ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল না হয়ে সরেজমিন বা মাঠপর্যায়ের তথ্যকেই চূড়ান্ত হিসেবে প্রাধান্য দেওয়া উচিত।

 

তাদের মতে, স্যাটেলাইট ডাটা কেবল ধ্বংসযজ্ঞের একটি বিশাল নির্দেশক হিসেবে কাজ করে, যা উদ্ধারকর্মীদের প্রাথমিক কৌশল নির্ধারণে সহায়তা করতে পারে। অন্যদিকে, ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিয়ে ভেনেজুয়েলার সরকারি পরিসংখ্যান এবং আন্তর্জাতিক গবেষকদের উপগ্রহভিত্তিক তথ্যের মধ্যে এক বিশাল ও বিস্ময়কর ব্যবধান পরিলক্ষিত হয়েছে।

 

ভেনেজুয়েলার সরকারি কর্তৃপক্ষের সর্বশেষ আনুষ্ঠানিক ঘোষণা অনুযায়ী, এই প্রলয়ঙ্করী ভূমিকম্পে দেশজুড়ে মোট ৮৫৫টি ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যার মধ্যে মাত্র ১৮৯টি ভবন সম্পূর্ণভাবে ধসে পড়ার কথা স্বীকার করা হয়েছে।

 

সরকারি হিসাবের সঙ্গে স্যাটেলাইট থেকে প্রাপ্ত ৫৮ হাজারের বেশি ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার তথ্যের এই বিপুল ফারাক আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞদের মতে, এত বড় মাপের ভূমিকম্পের পর যোগাযোগ ব্যবস্থা সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া, প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলোতে উদ্ধারকর্মীদের পৌঁছাতে বিলম্ব এবং প্রাথমিক পর্যায়ে ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণের কাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণেই এমন তথ্যগত বিভ্রাট দেখা দিতে পারে।

 

গত একশ বছরের ইতিহাসে ভেনেজুয়েলার জন্য সবচেয়ে ভয়াবহ এই ভূমিকম্পটি কেবল অবকাঠামোগত ধ্বংসযজ্ঞই চালায়নি, বরং দেশটির সাধারণ মানুষের জীবনে এক অবর্ণনীয় মানবিক বিপর্যয় ডেকে এনেছে। এক হাজার সাতশ মানুষের মৃত্যু একটি জাতির জন্য কত গভীর শোকের, তা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন।

 

ধ্বংসস্তূপের নিচে এখনো অনেকেই চাপা পড়ে থাকতে পারেন বলে স্থানীয়দের মাঝে গভীর আশঙ্কা বিরাজ করছে। উদ্ধারকাজ যত দীর্ঘ হচ্ছে, লাশের সারি ততই দীর্ঘ হওয়ার সম্ভাবনা বাড়ছে।

 

এরকম একটি চরম সংকটময় মুহূর্তে উপগ্রহ প্রযুক্তির মাধ্যমে প্রাপ্ত ক্ষয়ক্ষতির এই প্রাথমিক ধারণাটি আন্তর্জাতিক ত্রাণ সংস্থা এবং স্থানীয় প্রশাসনকে তাদের উদ্ধার ও পুনর্বাসন কার্যক্রম আরও সুপরিকল্পিতভাবে পরিচালনা করতে ব্যাপকভাবে সাহায্য করবে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।

 

ভেনেজুয়েলার এই ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ও গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো ইতোমধ্যে ভেনেজুয়েলার জনগণের প্রতি সমবেদনা জানানোর পাশাপাশি জরুরি মানবিক সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে।

 

এত বিপুল সংখ্যক ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার অর্থ হলো, লাখ লাখ মানুষ এক মুহূর্তে তাদের মাথা গোঁজার ঠাঁই হারিয়ে সম্পূর্ণ গৃহহীন হয়ে পড়েছেন। খোলা আকাশের নিচে মানবেতর জীবনযাপন করা এই অসংখ্য দুর্গত মানুষের জন্য এখন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন জরুরি আশ্রয়, বিশুদ্ধ পানীয় জল, চিকিৎসা সামগ্রী এবং পর্যাপ্ত খাবার।

 

স্থানীয় হাসপাতালগুলো আহতদের ভিড়ে উপচে পড়ছে এবং চিকিৎসকরা সীমিত সম্পদ দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছেন। আধুনিক দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় প্রযুক্তির ব্যবহার কতটা অপরিহার্য, ভেনেজুয়েলার এই ভূমিকম্পের ঘটনা তা আবারও স্পষ্টভাবে প্রমাণ করল।

 

যখন কোনো বিশাল এলাকায় প্রলয়ঙ্করী প্রাকৃতিক দুর্যোগ আঘাত হানে, তখন প্রচলিত উপায়ে দ্রুত ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। ঠিক সেই মুহূর্তেই নাসার মতো প্রতিষ্ঠান এবং ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থার উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন কৃত্রিম উপগ্রহগুলো আশার আলো হয়ে দেখা দেয়।

 

মহাকাশ থেকে পাঠানো রাডার তরঙ্গ ভূপৃষ্ঠের কাঠামোগত পরিবর্তন নিখুঁতভাবে শনাক্ত করতে পারে, যা দুর্যোগের প্রথম প্রহরে নীতিনির্ধারকদের সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে অমূল্য সহায়তা প্রদান করে। ওরেগন স্টেট ইউনিভার্সিটির গবেষকদের এই বিশ্লেষণ সেই প্রযুক্তিরই একটি সফল ও যুগান্তকারী প্রয়োগ, যা আগামী দিনে প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় বিশ্বের অন্যান্য দেশের জন্যও একটি কার্যকর নির্দেশিকা হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

 

- এএফপি