সম্পূর্ণ সীমিত সংস্করণের এই ভ্রমণ নথিতে প্রথমবারের মতো বর্তমান প্রেসিডেন্টের ছবি ও স্বাক্ষর অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে এক অভিনব সংযোজন। গত শুক্রবার প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তার নিজস্ব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ আনুষ্ঠানিকভাবে এই বহুল আলোচিত পাসপোর্টের একটি প্রাথমিক নমুনা প্রকাশ করেন, যা মুহূর্তের মধ্যেই আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ও সাধারণ নাগরিকদের মধ্যে ব্যাপক কৌতূহলের জন্ম দিয়েছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া ওই পোস্টে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তার স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে নতুন এই পাসপোর্টের একটি চিত্র শেয়ার করে ক্যাপশনে লেখেন, “যুক্তরাষ্ট্রের নতুন পাসপোর্ট, যা বলছে-‘স্বাগতম, তবে ভালো হয়ে থাকুন!’”
প্রেসিডেন্টের এই বার্তার পরপরই বিষয়টি নিয়ে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে ব্যাপক আলোচনার সূত্রপাত হয়। পরবর্তীতে একই দিনে হোয়াইট হাউসের অফিশিয়াল ‘এক্স’ (সাবেক টুইটার) অ্যাকাউন্ট থেকেও পাসপোর্টের এই হুবহু একই নকশার ছবি পোস্ট করা হয়।
হোয়াইট হাউসের ওই পোস্টের ক্যাপশনে লেখা ছিল, “আমেরিকার ২৫০তম বার্ষিকী স্মরণে নতুন ইউএস পাসপোর্ট।” শীর্ষ পর্যায় থেকে এমন জোরালো প্রচারণার ফলে এটি যে আসন্ন প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপনের একটি অন্যতম প্রধান আকর্ষণ হতে যাচ্ছে, তা অনেকটাই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
প্রকাশিত নতুন এই পাসপোর্টের অভ্যন্তরীণ নকশাটি অত্যন্ত নিখুঁত এবং গভীর জাতীয়তাবাদী চেতনায় উদ্বুদ্ধ। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের শেয়ার করা নমুনার একটি পৃষ্ঠার পটভূমিতে বা ব্যাকগ্রাউন্ডে স্থান পেয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের ঐতিহাসিক ‘স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র’ বা ডিক্লারেশন অব ইনডিপেনডেন্স-এর মূল বাণীর জলছাপ।
এর ঠিক ওপরেই হোয়াইট হাউসের বিখ্যাত ‘রেজোলিউট ডেস্ক’-এর সামনে উপবিষ্ট প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের একটি গম্ভীর ও রাজকীয় ছবি যুক্ত করা হয়েছে। পৃষ্ঠার একেবারে নিচের অংশে জ্বলজ্বল করছে খোদ প্রেসিডেন্টের নিজস্ব স্বাক্ষর।
অপরদিকে, পাসপোর্টের বিপরীত পৃষ্ঠায় স্থান পেয়েছে প্রখ্যাত মার্কিন চিত্রশিল্পী জন ট্রাম্বুলের আঁকা বিশ্বখ্যাত চিত্রকর্ম ‘দ্য ডিক্লারেশন অব ইনডিপেনডেন্স’, যা আমেরিকার জন্মলগ্নের এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি হিসেবে সর্বজনস্বীকৃত।
পাসপোর্টে ব্যবহৃত প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ছবিটি নিয়ে শিল্পবোদ্ধা ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মাঝে বেশ আগ্রহ তৈরি হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, নতুন এই পাসপোর্টে ব্যবহৃত ট্রাম্পের ছবিটি মূলত ওয়াশিংটন ডিসিতে অবস্থিত স্বনামধন্য ‘স্মিথসোনিয়ান ন্যাশনাল পোর্ট্রেট গ্যালারি’-তে সংরক্ষিত রাষ্ট্রপতির প্রতিকৃতির অনুকরণে তৈরি করা হয়েছে।
তবে এই নকশাটি মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর কর্তৃক চলতি বছরের শুরুর দিকে প্রকাশিত প্রাথমিক নকশার চেয়ে বেশ আলাদা। পূর্ববর্তী সেই নকশায় প্রেসিডেন্টের সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি ছবি ব্যবহার করা হয়েছিল, যা নিয়ে পরবর্তীতে পরিবর্তন আনা হয়েছে বলে প্রতীয়মান হয়।
তবে সম্প্রতি প্রকাশিত এই ছবিটিই স্মারক পাসপোর্টের চূড়ান্ত বা অফিশিয়াল নকশা কি না, সে বিষয়ে এখনো পুরোপুরি নিশ্চিত হওয়া যায়নি। এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক বক্তব্য জানার জন্য সাংবাদিকদের পক্ষ থেকে হোয়াইট হাউসের সাথে যোগাযোগ করা হলে তারা কোনো সরাসরি মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকে।
বরং সম্পূর্ণ বিষয়টি মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের এখতিয়ারভুক্ত বলে তারা সেই দিকে নির্দেশ করে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম সিএনএন এই বিষয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যার জন্য পররাষ্ট্র দপ্তরের সাথেও যোগাযোগ করেছে, তবে এখন পর্যন্ত তাদের পক্ষ থেকে চূড়ান্ত কোনো ঘোষণা গণমাধ্যমের কাছে আসেনি।
উল্লেখ্য, চলতি বছরের এপ্রিল মাসে যুক্তরাষ্ট্রের ২৫০তম বার্ষিকী উদযাপনের এক বিস্তৃত ও বর্ণাঢ্য পরিকল্পনার অংশ হিসেবে সর্বপ্রথম এই সীমিত সংস্করণের ভ্রমণ নথি বা পাসপোর্ট প্রকাশের কথা ঘোষণা করা হয়েছিল।
সেই সময় মার্কিন প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছিল যে, আমেরিকার আড়াই শতকের এই ঐতিহাসিক ক্ষণটিকে স্মরণীয় করে রাখতে একটি বিশেষ সংস্করণের পাসপোর্ট নাগরিকদের জন্য উন্মুক্ত করা হবে। এর সামনে, পেছনে এবং ভেতরের কভারে কাস্টম আর্টওয়ার্ক এবং অত্যন্ত উন্নতমানের ছবি যুক্ত থাকবে, যা এর আগে কখনো দেখা যায়নি।
ওই সময় মার্কিন প্রশাসনের এক পদস্থ কর্মকর্তা সিএনএন-কে নিশ্চিত করেছিলেন যে, এই বিশেষ স্মারক পাসপোর্টটি সবার জন্য ঢালাওভাবে উন্মুক্ত থাকবে না। মূলত যে সমস্ত নাগরিক সরাসরি ‘ওয়াশিংটন পাসপোর্ট এজেন্সি’-তে সশরীরে উপস্থিত হয়ে নিজেদের পাসপোর্ট নবায়ন করবেন, কেবলমাত্র তাদের জন্যই এই বিশেষ নকশার পাসপোর্টটি ডিফল্ট বা স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রদান করা হবে।
অন্যদিকে, যারা অনলাইনের মাধ্যমে আবেদন করবেন অথবা দেশের অন্যান্য স্থান ও লোকেশন থেকে পাসপোর্ট তৈরি বা নবায়ন করবেন, তাদের ক্ষেত্রে আগের মতো বিদ্যমান সাধারণ নকশাই বহাল থাকবে।
বর্তমানে প্রচলিত মার্কিন পাসপোর্টের নকশাও আমেরিকার গৌরবময় ইতিহাসকে ধারণ করে আছে। বর্তমান পাসপোর্টের ভেতরের প্রথম কভারে প্রখ্যাত শিল্পী পার্সি মোরানের একটি ঐতিহাসিক চিত্রকর্মের ছবি মুদ্রিত রয়েছে।
এটি মূলত ১৮১৪ সালে ফোর্ট ম্যাকহেনরিতে ব্রিটিশ বাহিনীর ভয়াবহ বোমাবর্ষণের পরদিন সকালে ফ্রান্সিস স্কট কি-র আঁকা একটি স্কেচ বা দৃশ্যের ওপর ভিত্তি করে তৈরি, যে ঘটনাটি পরবর্তীতে যুক্তরাষ্ট্রের বিখ্যাত জাতীয় সংগীত রচনায় তাকে সরাসরি অনুপ্রেরণা জুগিয়েছিল।
বর্তমান পাসপোর্টের ওই একই কভারে মার্কিন জাতীয় সংগীতের বেশ কয়েকটি অবিস্মরণীয় লাইনও মুদ্রিত রয়েছে। তবে ট্রাম্প প্রশাসনের এই নতুন স্মারক পাসপোর্টটি নকশা ও ঐতিহ্যের দিক থেকে প্রচলিত প্রথাকে ভেঙে এক নতুন ও ব্যতিক্রমী ধারার সূচনা করতে যাচ্ছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।