বৃহস্পতিবার, জুন ২৫, ২০২৬
১১ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ভেনেজুয়েলার পাশে থাকার আশ্বাস যুক্তরাষ্ট্রের, সব ধরনের সহায়তার ঘোষণা ট্রাম্পের

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৫ জুন, ২০২৬, ০১:৩৮ পিএম

ভেনেজুয়েলার পাশে থাকার আশ্বাস যুক্তরাষ্ট্রের, সব ধরনের সহায়তার ঘোষণা ট্রাম্পের
ছবি : Collected

দক্ষিণ আমেরিকার দেশ ভেনেজুয়েলায় আঘাত হানা ভয়াবহ ও বিধ্বংসী জোড়া ভূমিকম্পের পর দেশটির পাশে দাঁড়ানোর আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এক বিশেষ বার্তায় জানিয়েছেন, এই চরম সংকটের মুহূর্তে দুর্গত ভেনেজুয়েলাকে যেকোনো ধরনের মানবিক ও কারিগরি সহায়তা প্রদানে যুক্তরাষ্ট্র সম্পূর্ণ প্রস্তুত, ইচ্ছুক এবং সক্ষম।

 

ভেনেজুয়েলাকে একটি ‘মহান বন্ধু’ রাষ্ট্র হিসেবে অভিহিত করে মার্কিন প্রশাসন জানিয়েছে, এই কঠিন সময়ে তারা ভেনেজুয়েলার বিপন্ন জনগণের পাশে থেকে সমস্ত প্রয়োজনীয় সহযোগিতা নিশ্চিত করবে।

 

আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক মহলের মতে, ওয়াশিংটনের এই মানবিক সাড়া ও সংহতি প্রকাশ দুই দেশের মধ্যকার বিদ্যমান সম্পর্কে একটি নতুন ও ইতিবাচক মাত্রা যোগ করতে পারে। বৃহস্পতিবার নিজের প্রতিষ্ঠিত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ দেওয়া এক তাৎপর্যপূর্ণ পোস্টে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ভেনেজুয়েলার বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন।

 

তিনি তাঁর বার্তায় উল্লেখ করেন, ভেনেজুয়েলায় ঘটে যাওয়া ভয়াবহ ভূমিকম্পের বিষয়ে এ পর্যন্ত ওয়াশিংটনে যেসব তথ্য ও প্রতিবেদন এসে পৌঁছেছে, তা থেকে এটি অত্যন্ত স্পষ্ট যে সেখানকার সার্বিক পরিস্থিতি ভালো নয় এবং তা দিনে দিনে আরও উদ্বেগজনক হয়ে উঠছে।

 

এই চরম দুর্যোগপূর্ণ পরিস্থিতিতে মানবিক দায়িত্ববোধ থেকে যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলাকে সব ধরনের সাহায্য-সহযোগিতা করতে আন্তরিকভাবে ইচ্ছুক এবং সম্পূর্ণ সক্ষম। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আরও জানান যে, দুর্গত এলাকায় দ্রুত ও কার্যকর সহায়তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে তিনি ইতিমধ্যেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সমস্ত সরকারি সংস্থাকে প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা ও জরুরি আদেশ প্রদান করেছেন, যাতে নতুন ও মহান এই বন্ধুরাষ্ট্রের সংকটে তাৎক্ষণিক সাড়া দেওয়া সম্ভব হয়।

 

প্রেসিডেন্টের এই জরুরি নির্দেশনার পরপরই মার্কিন কূটনৈতিক মিশনগুলো দুর্গতদের সহায়তায় সক্রিয় হয়ে উঠেছে। যুক্তরাষ্ট্রের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী ক্রিস্টোফার লান্দাও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘এক্স’-এ দেওয়া এক বিবৃতিতে ভেনেজুয়েলার সরকারের সাথে যৌথভাবে কাজ করার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

 

তিনি জানান, মার্কিন প্রশাসন ভেনেজুয়েলা সরকারের সঙ্গে সার্বক্ষণিক ও নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষা করে চলেছে এবং একটি সুনির্দিষ্ট ও সুসংগঠিত উপায়ে রাষ্ট্রীয় সহায়তা কার্যক্রম পরিচালনার প্রস্তুতি নিচ্ছে।

 

একই সাথে, ভেনেজুয়েলায় অবস্থিত মার্কিন দূতাবাসগুলি বা দূতাবাসের পক্ষ থেকে প্রকাশিত একটি আনুষ্ঠানিক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, ভূমিকম্প-পরবর্তী সার্বিক পরিস্থিতি এবং ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ মার্কিন কর্তৃপক্ষ অত্যন্ত নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে, যাতে স্থানীয় প্রয়োজন অনুযায়ী দ্রুত ও কার্যকর উদ্ধারসামগ্রী পৌঁছানো যায়।

 

ভেনেজুয়েলায় আঘাত হানা এই প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের ভয়াবহতা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে গভীরভাবে স্তব্ধ করেছে। মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ ও গবেষণা সংস্থা বা ইউএসজিএস-এর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত বুধবার স্থানীয় সময় সন্ধ্যা ৬টা ৪ মিনিটের দিকে মাত্র ৪০ সেকেন্ডের ব্যবধানে দেশটিতে দুটি অত্যন্ত শক্তিশালী ও বিধ্বংসী ভূকম্পন অনুভূত হয়।

 

রিখটার স্কেলে এই জোড়া ভূমিকম্পের মাত্রা ছিল যথাক্রমে ৭ দশমিক ২ এবং ৭ দশমিক ৫। এই মাত্রার ভূকম্পন যেকোনো জনপদের অবকাঠামোকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করতে সক্ষম। আকস্মিক এই বিপর্যয়ের পরপরই ভেনেজুয়েলার ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগুয়েজ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে এবং উদ্ধার অভিযান জোরদার করতে অনতিবিলম্বে দেশজুড়ে জরুরি অবস্থা জারি করেন।

 

মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন-এর পক্ষ থেকে কৃত্রিম উপগ্রহ ও ভৌগোলিক অবস্থান নিশ্চিত করা একাধিক ভিডিও ফুটেজে ভেনেজুয়েলাজুড়ে অবকাঠামোগত ধ্বংসযজ্ঞের এক ভয়াবহ চিত্র ফুটে উঠেছে।

 

রাজধানী কারাকাস এবং উপকূলীয় শহর কাতিয়া লা মার-সহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তের বহুতল ভবন ও সাধারণ ঘরবাড়ি তাসের ঘরের মতো ধসে পড়েছে। বিশেষ করে কাতিয়া লা মার শহরের একটি পাহাড়ি ঢালে অবস্থিত বেশ কয়েকটি আবাসিক ভবন সম্পূর্ণ মাটির সাথে মিশে যাওয়ার দৃশ্য আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক উদ্বেগ তৈরি করেছে।

 

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন ভিডিওতে দেখা গেছে, তীব্র আতঙ্কে সাধারণ মানুষ তাদের প্রিয়জন ও গৃহপালিত পোষা প্রাণীসহ বহুতল ভবনগুলো থেকে বেরিয়ে এসে খোলা রাস্তায় ও নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নিচ্ছেন। স্বজন হারানো মানুষের হাহাকারে দুর্গত এলাকার বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে।

 

এখন পর্যন্ত পাওয়া সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, রাজধানী কারাকাসসহ বিভিন্ন ক্ষতিগ্রস্ত অঞ্চলের ধসে পড়া ভবনের ধ্বংসস্তূপ থেকে সেনা, পুলিশ এবং বেসামরিক প্রতিরক্ষা বিভাগের কর্মীদের সমন্বয়ে গঠিত একটি যৌথ উদ্ধারকারী দল ৩২ জনের মৃতদেহ উদ্ধার করেছে।

 

এছাড়া এই প্রলয়ঙ্কারী দুর্যোগে গুরুতর আহত অবস্থায় আরও অন্তত ৭০০ জনকে উদ্ধার করে স্থানীয় হাসপাতালগুলোতে স্থানান্তর করা হয়েছে। উদ্ধারকাজ এখনো চলমান থাকায় হতাহতের এই সংখ্যা আরও অনেক বৃদ্ধি পেতে পারে বলে উদ্ধারকর্মীরা আশঙ্কা প্রকাশ করছেন।

 

ভেনেজুয়েলার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দিওসদাদো কাবেল্লো দেশটির রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেওয়া এক ভাষণে বর্তমান পরিস্থিতির রূঢ় বাস্তবতা স্বীকার করে বলেন, দেশের বহু ভবন ও ঘরবাড়ি সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত হয়েছে।

 

এই মুহূর্তে স্থানীয় প্রশাসন ও জাতীয় নিরাপত্তা বাহিনীর কাছে যা কিছু লজিস্টিকস এবং বেসামরিক সহায়তা সামগ্রী রয়েছে, তা দিয়েই সর্বোচ্চ শক্তি প্রয়োগ করে এই নজিরবিহীন দুর্যোগপূর্ণ পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা চালানো হচ্ছে। এই চরম সংকটে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দ্রুত মানবিক সাড়া ভেনেজুয়েলার জন্য অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে।

 

- সিএনএন