কিন্তু তার সেই ঐতিহাসিক মুকুট খুব বেশি দিন স্থায়ী হলো না। মাত্র দুই সপ্তাহেরও কম সময়ের ব্যবধানে অভাবনীয় এক আর্থিক পতনের মুখে পড়ে তিনি তার এই অনন্য মর্যাদা হারিয়েছেন।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম বিবিসির এক বিস্তৃত প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে যে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই খাতের দীর্ঘমেয়াদি মুনাফা নিয়ে বিনিয়োগকারীদের মনে সৃষ্ট গভীর সংশয় এবং বিশ্ববাজারের প্রযুক্তি খাতে অনাকাঙ্ক্ষিত এক বিশাল ধসের কারণেই মূলত ইলন মাস্ককে এমন অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হয়েছে।
সম্প্রতি বিশ্বের প্রথম ব্যক্তি হিসেবে এক ট্রিলিয়ন ডলারের জাদুকরী মাইলফলক স্পর্শ করার পর গত মঙ্গলবার তিনি এই মর্যাদাপূর্ণ খেতাবটি হারান। বিশ্বখ্যাত আর্থিক বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান ব্লুমবার্গের ‘বিলিয়নিয়ার্স ইনডেক্স’-এর সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবার মাস্কের মোট সম্পদের পরিমাণ কমে দাঁড়িয়েছে ৯৫৭ বিলিয়ন ডলারে, যা ব্রিটিশ মুদ্রায় প্রায় ৭২৭ বিলিয়ন পাউন্ডের সমতুল্য।
অথচ হিসাব করে দেখা গেছে, মাত্র দুই সপ্তাহেরও কম সময় আগে তার ব্যক্তিগত সম্পদের মোট মূল্য ছিল ১.১১ ট্রিলিয়ন ডলার। তবে সম্পদের এই বিপুল পরিমাণ পতনের পরও ইলন মাস্ক এখনও পর্যন্ত বিশ্বের সবচেয়ে ধনী ব্যক্তির আসনটি বেশ শক্তভাবেই ধরে রেখেছেন, কারণ তার সম্পদের পরিমাণ তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বীদের তুলনায় এখনও যোজন যোজন এগিয়ে রয়েছে।
ইলন মাস্কের এই ট্রিলিয়নিয়ার হওয়ার পেছনের গল্পটি শুরু হয়েছিল মূলত গত ১২ জুন। ওই দিন তার স্বপ্নের মহাকাশ গবেষণা ও অনুসন্ধান প্রতিষ্ঠান স্পেসএক্স-এর বহুল প্রতীক্ষিত শেয়ারবাজারে অত্যন্ত সফলভাবে আত্মপ্রকাশ ঘটে। যুক্তরাষ্ট্রের নাসডাক স্টক এক্সচেঞ্জে কোম্পানিটির প্রাথমিক শেয়ার বিক্রয় বা আইপিও প্রতি শেয়ার ১৩৫ ডলার দরে নির্ধারণ করা হয়েছিল।
তবে বিনিয়োগকারীদের প্রবল আগ্রহের কারণে লেনদেনের শুরুতেই এর দাম ১৫০ ডলারে গিয়ে পৌঁছায়। এই যুগান্তকারী আইপিওর ফলে স্পেসএক্সের সামগ্রিক বাজারমূল্য এক লাফে ১.৭৭ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যায়।
যেহেতু কোম্পানিটির প্রায় ৪২ শতাংশ শেয়ারের একক মালিক ইলন মাস্ক নিজে, তাই তার ব্যক্তিগত সম্পদও সেই সুবাদে এক লাফে এক ট্রিলিয়ন ডলারের ঐতিহাসিক সীমানা অতিক্রম করে। শেয়ারবাজারে অভিষেকের পর স্পেসএক্সের জয়যাত্রা যেন থামার নামই নিচ্ছিল না।
গত ১৬ জুন বিনিয়োগকারীদের ব্যাপক আগ্রহ ও বিপুল চাহিদার কারণে স্পেসএক্সের শেয়ারের দাম হু হু করে বেড়ে ২২৫ দশমিক ৬৪ ডলারে গিয়ে পৌঁছায়। এর ফলে মাস্কের মোট সম্পদের পরিমাণও তার সর্বোচ্চ শিখর ১.৩২ ট্রিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়।
কিন্তু শেয়ারবাজারের এই ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা খুব বেশি দিন দীর্ঘস্থায়ী হতে পারেনি। মূলধনী ব্যয় বৃদ্ধি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অবকাঠামো নির্মাণের বিপুল খরচ এবং সেই সাথে বিশ্ব অর্থনীতিতে উচ্চ সুদের হার নিয়ে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে ক্রমবর্ধমান উদ্বেগের কারণে হঠাৎ করেই বৈশ্বিক প্রযুক্তি খাতে বড় ধরনের দরপতন শুরু হয়।
এই অপ্রত্যাশিত পতনের ধাক্কায় এনভিডিয়া, ইন্টেল ও এএমডির মতো বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় প্রযুক্তি জায়ান্টরাও প্রবল চাপের মুখে পড়ে যায়। তবে এই সামগ্রিক দরপতনের বাজারে সবচেয়ে বড় এবং ভয়াবহ ধাক্কাটি খেতে হয়েছে স্পেসএক্সকে।
জুনের মাঝামাঝি সময়ে সর্বোচ্চ অবস্থান থেকে কোম্পানিটির শেয়ারের দাম অবিশ্বাস্যভাবে ৩০ শতাংশেরও বেশি কমে গিয়ে প্রায় ১৫৬ ডলারে নেমে আসে। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, শুধু ২২ জুনের একদিনেই স্পেসএক্সের শেয়ার ১৬ শতাংশ পড়ে যায়।
আর এর প্রত্যক্ষ ফলস্বরূপ ইলন মাস্কের ব্যক্তিগত সম্পদ থেকে এক দিনেই আনুমানিক ২৪০ বিলিয়ন ডলার উধাও হয়ে যায়, যা বৈশ্বিক শেয়ারবাজারের ইতিহাসে অন্যতম বড় এক বিপর্যয়। এর ঠিক একই সময়ে তার মালিকানাধীন জনপ্রিয় বৈদ্যুতিক গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান টেসলার শেয়ারের দামও প্রায় ৬ শতাংশ কমে যায়।
টেসলার প্রায় ১২ শতাংশ শেয়ারের মালিক হওয়ায় মাস্কের জন্য এটি ছিল এক মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব, যা তার সামগ্রিক আর্থিক ক্ষতিকে আরও বহুগুণে বাড়িয়ে দেয়। আন্তর্জাতিক আর্থিক বিশ্লেষকদের মতে, ইলন মাস্কের এই ট্রিলিয়নিয়ার মর্যাদা অন্যান্য শীর্ষ ধনকুবেরদের তুলনায় কৌশলগতভাবে অনেক বেশি ঝুঁকিপূর্ণ ও অস্থিতিশীল।
এর মূল কারণ হলো, তার এই বিশাল সম্পদের সিংহভাগই মূলত মাত্র দুটি প্রতিষ্ঠানের শেয়ারের ওপর সরাসরি নির্ভরশীল। পরিসংখ্যান বলছে, তার মোট সম্পদের প্রায় ৮০ শতাংশই স্পেসএক্সে বিনিয়োগকৃত এবং বাকি বড় অংশটি রয়েছে টেসলায়।
ফলে এই দুটি প্রতিষ্ঠানের শেয়ারের দামের সামান্যতম ওঠানামাও তার মোট সম্পদে বিশাল প্রভাব ফেলে। তবে আশার কথা হলো, বাজার পরিস্থিতি কিছুটা অনুকূলে এলে এবং স্পেসএক্সের শেয়ারদর যদি মাত্র ৬ শতাংশও পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হয়, তবে ইলন মাস্কের সম্পদ আবারও খুব সহজেই এক ট্রিলিয়ন ডলারের মাইলফলক অতিক্রম করবে এবং তিনি আবারও তার হারানো ট্রিলিয়নিয়ার খেতাব ফিরে পাবেন।