বৃহস্পতিবার, জুন ২৫, ২০২৬
১১ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ভেনেজুয়েলায় জোড়া ভূমিকম্পে নিহত ৩২, আহত অন্তত ৭০০

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৫ জুন, ২০২৬, ০১:১৫ পিএম

ভেনেজুয়েলায় জোড়া ভূমিকম্পে নিহত ৩২, আহত অন্তত ৭০০
ছবি : Collected

দক্ষিণ আমেরিকার দেশ ভেনেজুয়েলায় এক নজিরবিহীন ও ভয়াবহ প্রাকৃতিক বিপর্যয় নেমে এসেছে। রিখটার স্কেলে ৭ মাত্রা ছাড়িয়ে যাওয়া প্রলয়ঙ্কারী জোড়া ভূমিকম্পের আঘাতে দেশটিতে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞের সৃষ্টি হয়েছে।

 

রাজধানী কারাকাসসহ দেশের বিভিন্ন শহর ও প্রত্যন্ত গ্রামের ধ্বংসস্তূপ থেকে এখন পর্যন্ত অন্তত ৩২ জনের মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। এছাড়া এই ভয়াবহ বিপর্যয়ে আহত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়েছে আরও অন্তত ৭০০ জন মানুষকে।

 

উদ্ধারকাজ যতই সামনের দিকে অগ্রসর হচ্ছে, ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে নতুন নতুন মৃতদেহ উদ্ধারের কারণে হতাহতের সংখ্যা আরও ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পাওয়ার গভীর আশঙ্কা করা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো এই ঘটনাটিকে সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম মর্মান্তিক প্রাকৃতিক বিপর্যয় হিসেবে আখ্যায়িত করেছে।

 

ভেনেজুয়েলার ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগুয়েজ বৃহস্পতিবার এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতির মাধ্যমে হতাহতের এই প্রাথমিক পরিসংখ্যান নিশ্চিত করেছেন। ভয়াবহ এই দুর্যোগ মোকাবিলায় এবং দেশব্যাপী উদ্ধার তৎপরতা ত্বরান্বিত করতে তিনি ইতোমধ্যে সমগ্র দেশজুড়ে জরুরি অবস্থা জারি করেছেন।

 

দেশের যোগাযোগ ও তথ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, রাজধানী কারাকাসসহ বিভিন্ন অঞ্চলে ইতোমধ্যে অসংখ্য ভবন ও বাড়িঘর সম্পূর্ণ ধসে পড়েছে। তাছাড়া বহু ভবন চরম ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় হেলে পড়ায় জনগণের সার্বিক নিরাপত্তার স্বার্থে দেশজুড়ে বিপুলসংখ্যক নিরাপত্তা বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে।

 

সরকার ও স্থানীয় প্রশাসন সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে ধ্বংসস্তূপে আটকে পড়া মানুষদের জীবিত উদ্ধারে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ ও গবেষণা সংস্থা (ইউএসজিএস)-এর বিস্তারিত তথ্য অনুযায়ী, স্থানীয় সময় গতকাল বুধবার ঠিক সন্ধ্যা ৬টা ৪ মিনিটে এই ভয়াবহ ভূমিকম্প আঘাত হানে।

 

প্রথম কম্পনের পর আতঙ্ক কাটতে না কাটতেই মাত্র চল্লিশ সেকেন্ডের ব্যবধানে দ্বিতীয় আরেকটি অত্যন্ত শক্তিশালী ভূকম্পন অনুভূত হয়। রিখটার স্কেলে প্রলয়ঙ্কারী এই জোড়া ভূমিকম্পের মাত্রা ছিল যথাক্রমে ৭ দশমিক ২ এবং ৭ দশমিক ৫।

 

সংস্থাটি তাদের বিবৃতিতে আরও জানিয়েছে যে, ভেনেজুয়েলার উত্তরাঞ্চলীয় উপকূলীয় এলাকা ছিল এই বিধ্বংসী ভূমিকম্পের মূল কেন্দ্র বা এপিসেন্টার। ভৌগোলিক ও অর্থনৈতিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই অঞ্চলে দেশটির বেশ কয়েকটি প্রধান জ্বালানি তেল শোধনাগার অবস্থিত, যা এই মাত্রার দুর্যোগের ফলে মারাত্মক অগ্নিকাণ্ড বা পরিবেশগত আনুষঙ্গিক বিপর্যয়ের চরম ঝুঁকিতে পড়েছে।

 

ইউএসজিএস অত্যন্ত স্পষ্টভাবে সতর্ক করে বলেছে, এই ভূমিকম্পের ফলে দেশটিতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি সাধিত হয়েছে এবং আগামী দিনগুলোতে এই মানবিক দুর্যোগ আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে।

 

দুর্যোগের ভয়াবহতা এবং প্রাণহানি বহুগুণ বৃদ্ধি পাওয়ার পেছনে অন্যতম একটি প্রধান কারণ ছিল গতকালের সরকারি ছুটি। স্পেনের একসময়ের উপনিবেশ ভেনেজুয়েলায় প্রতি বছরের ২৪ জুন সেইন্ট জন ব্যাপটিস্টের জন্মদিবস এবং জাতীয় স্বাধীনতা দিবস হিসেবে অত্যন্ত আনন্দঘন পরিবেশে উদযাপন করা হয়।

 

সরকারি ছুটির দিন হওয়ায় দেশের অধিকাংশ মানুষ তাদের দৈনন্দিন কর্মস্থল থেকে দূরে নিজেদের বাড়িতে কিংবা বন্ধু-বান্ধব ও আত্মীয়স্বজনদের সাথে উৎসবমুখর সময় কাটাচ্ছিলেন। ছুটির আনন্দের এমন একটি মুহূর্তে হঠাৎ নেমে আসা এই প্রাকৃতিক বিপর্যয় সাধারণ জনজীবনে এক অবর্ণনীয় বিভীষিকা, আতঙ্ক ও গভীর শোকের ছায়া নামিয়ে এনেছে।

 

দেশটির ভবনগুলোর অবকাঠামোগত দুর্বলতা এই ক্ষয়ক্ষতির মাত্রাকে আরও প্রকট করে তুলেছে। ইউএসজিএস-এর ভূতাত্ত্বিক পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, ভেনেজুয়েলার অধিকাংশ আবাসিক ও বাণিজ্যিক ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে আধুনিক ও ভূমিকম্প সহনশীল প্রযুক্তি বা নিয়মকানুন যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়নি।

 

মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন-এর জিওলোকেশন বা অবস্থান চিহ্নিত করা একাধিক ভিডিও ফুটেজে ভেনেজুয়েলাজুড়ে ভবন ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির অত্যন্ত মর্মান্তিক চিত্র বিশ্ববাসীর সামনে উঠে এসেছে। রাজধানী কারাকাস এবং উপকূলীয় শহর কাতিয়া লা মার-এ ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ সবচেয়ে বেশি বলে ধারণা করা হচ্ছে।

 

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও ফুটেজগুলোতে দেখা যায়, পাহাড়ের ঢালে অবস্থিত বেশ কয়েকটি বহুতল ভবন তাসের ঘরের মতো মুহূর্তে ধসে পড়ছে। প্রাণভয়ে আতঙ্কিত বাসিন্দারা তাদের পরিবারের সদস্য এবং পোষা প্রাণীদের নিয়ে তীব্র ঝাঁকুনির মধ্যেই ভবনগুলো থেকে বেরিয়ে এসে রাস্তায় ও খোলা মাঠে জড়ো হচ্ছেন।

 

স্বজন হারানো মানুষের বুকফাটা আর্তনাদ এবং চারদিকের ধ্বংসলীলা এক হৃদয়বিদারক ও থমথমে পরিবেশের সৃষ্টি করেছে। ভূমিকম্পের পর থেকেই রাজধানী কারাকাসের বিস্তীর্ণ এলাকাসহ ভেনেজুয়েলার বহু গ্রাম ও শহর সম্পূর্ণ বিদ্যুৎহীন অবস্থায় রয়েছে।

 

টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হওয়ায় এবং রাস্তাঘাট ফেটে যাওয়ায় প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলোতে উদ্ধারকাজ পরিচালনা করা ক্রমশ কঠিন হয়ে পড়ছে। সার্বিক নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে কারাকাসের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরটি সাময়িকভাবে বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।

 

বিদ্যুৎহীন অন্ধকার রাতে ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে পড়া স্বজনদের সন্ধানে বহু মানুষ খালি হাতেই উদ্ধারকাজ চালানোর আপ্রাণ চেষ্টা করছেন। হাসপাতালগুলোতে আহত মানুষের উপচে পড়া ভিড় লক্ষ্য করা গেছে এবং চিকিৎসা ব্যবস্থা চরম চাপের মুখে পড়েছে। সরকার, স্থানীয় প্রশাসন ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো সমন্বিতভাবে এই ভয়াবহ মানবিক সংকট থেকে উত্তরণের আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।