সাম্প্রতিক সময়ে মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার কেন্দ্রবিন্দু ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের পরিচালিত সামরিক অভিযানের সময় ন্যাটো মিত্রদের কাছ থেকে কাঙ্ক্ষিত ও পর্যাপ্ত সমর্থন না পাওয়ার কারণে তিনি এই তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।
একই সঙ্গে মার্কিন প্রেসিডেন্ট অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় সতর্ক করে দিয়েছেন যে, মিত্রদের এমন স্বার্থপর আচরণের কারণে ভবিষ্যতে কোনো ন্যাটোভুক্ত দেশের ক্রান্তিলগ্নে বা জরুরি প্রয়োজনে যুক্তরাষ্ট্রও হয়তো তাদের পাশে দাঁড়াবে না।
আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতিতে প্রভাবশালী মার্কিন নেতার এমন মন্তব্য পশ্চিমা জোটের অভ্যন্তরীণ ফাটল এবং আস্থার সংকটকে আরও একবার গোটা বিশ্বের সামনে প্রকাশ্যে নিয়ে এসেছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক ও সামরিক বিশ্লেষকেরা।
গত সোমবার হোয়াইট হাউসের ওভাল অফিসে আয়োজিত এক বিশেষ সংবাদ সম্মেলনে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় গণমাধ্যমগুলোর প্রতিনিধিদের সামনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট তাঁর এই গভীর হতাশা ও ক্ষোভের কথা বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেন।
তিনি ন্যাটো জোটের সুরক্ষার পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের বিপুল পরিমাণ আর্থিক অবদানের কথা জোরালোভাবে স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন, ইউরোপীয় মিত্রদের সুরক্ষায় আমেরিকা বছরের পর বছর ধরে নিজেদের কোষাগার থেকে অঢেল অর্থ ব্যয় করে আসছে।
কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে, যখনই ওয়াশিংটনের কোনো ছোটখাটো বিষয়ে বা কৌশলগত পদক্ষেপে মিত্রদের সহযোগিতার সামান্যতম প্রয়োজন হয়, তখন ন্যাটোর অন্যান্য সদস্য দেশগুলো এক ধরনের চরম অনাগ্রহ বা অনীহা প্রদর্শন করে।
তারা কার্যত কোনো ধরনের সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিতে চায় না বলে তিনি সরাসরি অভিযোগ করেন। স্বনামধন্য ফরাসি বার্তা সংস্থা এএফপি এই অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ সংবাদটি বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে প্রচার করেছে।
সংবাদ সম্মেলনে ডোনাল্ড ট্রাম্প অত্যন্ত কঠোর ভাষায় মিত্রদের এই দ্বিমুখী আচরণের সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের মতো একটি প্রধান বৈশ্বিক শক্তির প্রতি মিত্রদের এ ধরনের উদাসীনতা ও অসহযোগিতাপূর্ণ কথা বলাটা তাদের জন্য চরম বোকামির শামিল।
কারণ, আমেরিকা যদি মিত্রদের এককভাবে সুরক্ষার দায়িত্ব থেকে সরে আসে, তবে তা পুরো ইউরোপের দীর্ঘস্থায়ী নিরাপত্তার জন্য এক ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প অত্যন্ত জোর দিয়ে উল্লেখ করেন যে, যুক্তরাষ্ট্রও চাইলে মিত্রদের সেই একই অসহযোগিতার কথা নির্দ্বিধায় ফিরিয়ে দিতে পারে এবং উদ্ভূত পরিস্থিতিতে হয়তো ওয়াশিংটন সেই কঠিন পথেই হাঁটবে।
তাঁর এই মন্তব্যের পর আন্তর্জাতিক সামরিক মহলে এক নতুন বিতর্কের সূচনা হয়েছে, যেখানে ন্যাটোর পারস্পরিক সুরক্ষার অন্যতম প্রধান ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত ঐতিহাসিক 'আর্টিকেল ফাইভ' বা অনুচ্ছেদ পাঁচ-এর কার্যকারিতা নিয়ে নতুন করে গভীর সংশয় দেখা দিয়েছে।
উল্লেখ্য, মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান অত্যন্ত উত্তপ্ত ও অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে ইরানে মার্কিন সামরিক অভিযানের বিষয়টি বিশ্বজুড়ে ব্যাপক সমালোচনা ও আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
এই অত্যন্ত স্পর্শকাতর, জটিল ও ঝুঁকিপূর্ণ সামরিক পদক্ষেপে মার্কিন প্রশাসন দৃঢ়ভাবে প্রত্যাশা করেছিল যে, তাদের ঐতিহ্যবাহী ইউরোপীয় মিত্ররা অন্তত রাজনৈতিক, কূটনৈতিক বা কৌশলগত সমর্থন দিয়ে তাদের পাশে শক্তভাবে অবস্থান করবে।
কিন্তু ন্যাটোভুক্ত অধিকাংশ বৃহৎ দেশ মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে কোনো সর্বাত্মক যুদ্ধ, মানবিক সংকট বা সংঘাতের বিস্তারের আশঙ্কায় মার্কিন এই একতরফা সামরিক পদক্ষেপ থেকে কৌশলগত দূরত্ব বজায় রাখার অত্যন্ত সতর্ক নীতি গ্রহণ করে।
মিত্রদের এই সতর্কতা ও প্রকাশ্য নীরবতাকে মার্কিন প্রশাসন নিজেদের প্রতি এক ধরনের চরম অবজ্ঞা ও মিত্রতার বরখেলাপ হিসেবে দেখছে, যার সরাসরি ও রূঢ় প্রতিফলন ঘটেছে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের এই সাম্প্রতিক ও ঝাঁজালো মন্তব্যে।
পশ্চিমা সামরিক জোট ন্যাটোর অভ্যন্তরীণ এই গভীর টানাপোড়েন ও প্রকাশ্য মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্বের মধ্যেই আগামী মাসে তুরস্কের রাজধানী আঙ্কারায় জোটের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও নীতিনির্ধারণী শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে।
আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক সূত্রগুলো নিশ্চিত করেছে যে, জোটের ভেতরে এত বড় মাত্রার মতবিরোধ এবং প্রকাশ্য বাগ্যুদ্ধ থাকা সত্ত্বেও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে ওই সম্মেলনে সশরীরে যোগ দেবেন।
তবে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের বদ্ধমূল ধারণা, আঙ্কারার এই শীর্ষ সম্মেলনটি সাম্প্রতিক ইতিহাসের অন্যান্য যেকোনো বারের চেয়ে অনেক বেশি উত্তপ্ত, বিতর্কিত ও চ্যালেঞ্জিং হতে যাচ্ছে।
কারণ, সেখানে ডোনাল্ড ট্রাম্প মিত্রদের প্রতিরক্ষা বাজেট বৃদ্ধি, আমেরিকার শর্তহীন স্বার্থ রক্ষা এবং বৈশ্বিক যেকোনো পদক্ষেপে ন্যাটো দেশগুলোর নিঃশর্ত সমর্থন আদায়ের বিষয়ে অভাবনীয় মাত্রায় চাপ প্রয়োগ করতে পারেন।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ এবং বৈশ্বিক নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, মার্কিন প্রেসিডেন্টের এই প্রকাশ্য ক্ষোভ এবং ভবিষ্যতে অসহযোগিতার প্রচ্ছন্ন হুমকি পুরো পশ্চিমা বিশ্বের সংহতির জন্য এক বড় ধরনের অশনিসংকেত।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে বৈশ্বিক স্থিতিশীলতা, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও সামরিক নিরাপত্তার যে সুদৃঢ় কাঠামো ন্যাটো তৈরি করেছিল, তা এখন এক নজিরবিহীন আস্থার সংকট ও ভাঙনের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে।
মিত্রদের প্রতি ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই কঠোর শর্তারোপ এবং মিত্রতাকে কেবল লেনদেনের দৃষ্টিভঙ্গিতে বিচার করার নীতি আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে এক নতুন ও অনিশ্চিত মেরুকরণের স্পষ্ট ইঙ্গিত দিচ্ছে।
পশ্চিমা বিশ্বের এই অভ্যন্তরীণ টানাপোড়েন শেষ পর্যন্ত বৈশ্বিক ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণকে ঠিক কোন দিকে নিয়ে যায় এবং আন্তর্জাতিক শক্তির ভারসাম্য কীভাবে পরিবর্তিত হয়, সেটিই এখন পুরো বিশ্ব অত্যন্ত গভীর, নিবিড় ও উৎকণ্ঠিত পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে লক্ষ করছে।