তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ এই রান-অফ নির্বাচনে তিনি তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বামপন্থি জোটের প্রার্থী ইভান সেপেদাকে মাত্র এক শতাংশ ভোটের ব্যবধানে পেছনে ফেলেছেন।
আনুষ্ঠানিক ও চূড়ান্ত ফলাফল এখনও সরকারিভাবে ঘোষণা করা না হলেও, এসপ্রিয়েলার সমর্থকেরা দেশজুড়ে ইতোমধ্যে ব্যাপক বিজয় উদযাপন শুরু করে দিয়েছেন।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই নির্বাচনী ফলাফল কলম্বিয়ার রাজনৈতিক ও সামাজিক মেরুকরণকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে। ৯৯ শতাংশেরও বেশি ভোট গণনা শেষে দেখা গেছে, ডানপন্থি প্রার্থী দে লা এসপ্রিয়েলা প্রায় ৪৯ দশমিক ৭ শতাংশ ভোট পেয়েছেন।
অন্যদিকে বর্তমান প্রেসিডেন্ট গুস্তাভো পেত্রোর ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে পরিচিত বামপন্থি প্রার্থী ইভান সেপেদা পেয়েছেন ৪৮ দশমিক ৭ শতাংশ ভোট। যুক্তরাজ্যের সংবাদমাধ্যম বিবিসির তথ্যমতে, এসপ্রিয়েলা তাঁর নির্বাচনী প্রচারণায় কলম্বিয়ার দীর্ঘদিনের সংকট অবৈধ সশস্ত্র গোষ্ঠী, মাদক পাচার এবং ক্রমবর্ধমান অপরাধ দমনে কঠোর সামরিক অভিযান পরিচালনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, যা দেশের ভোটারদের একটি বড় অংশকে আকর্ষণ করেছে।
অন্যদিকে, সেপেদা এখনও তাঁর পরাজয় স্বীকার করেননি। তিনি এক বিবৃতিতে জানিয়েছেন, প্রাথমিক এই ফলাফল এখনও চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছায়নি এবং সরকারিভাবে সম্পূর্ণ ভোট গণনা ও প্রয়োজনীয় আইনি যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পরেই তাঁরা চূড়ান্ত রায়কে মেনে নেবেন।
আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, এর আগে গত ৩১ মে অনুষ্ঠিত প্রথম দফার ভোটের ক্ষেত্রেও প্রাথমিক ও চূড়ান্ত ফলাফলের মধ্যে সামান্য পার্থক্য দেখা গিয়েছিল।
নির্বাচনী ফলাফলের এই ধারা স্পষ্ট হওয়ার পর কলম্বিয়ার ক্যারিবীয় উপকূলীয় অঞ্চল, যেখানে দে লা এসপ্রিয়েলা বিপুল সমর্থন পেয়েছেন, সেখানকার বাররнакিয়া শহরে হাজার হাজার উল্লাসিত মানুষের ঢল নামে।
সেখানে উপস্থিত সমর্থকদের সামনে আবেগঘন বক্তব্য প্রদান করেন এসপ্রিয়েলা। নিজেকে ‘এল টাইগ্রে’ বা বাঘ নামে অভিহিত করে তিনি ঘোষণা করেন যে, আজ রাত থেকেই কলম্বিয়ার জন্য এক নতুন ইতিহাসের সূচনা হচ্ছে এবং দেশ এক নতুন পরিবর্তনের যুগে পদার্পণ করল।
তিনি আরও বলেন, এই জয় লাখো নাগরিকের স্বাধীন ও গণতান্ত্রিক সিদ্ধান্তের বহিঃপ্রকাশ, যা একটি নিরাপদ ও সমৃদ্ধ কলম্বিয়ার পক্ষে রায় দিয়েছে। তিনি দেশের সকল নাগরিকের জন্য কাজ করার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন এবং ১৯৯১ সালের ঐতিহাসিক সংবিধানের প্রতি পূর্ণ আনুগত্য প্রকাশ করে তা রক্ষার অঙ্গীকার করেন।
এ সময় তাঁর সমর্থকেরা কলম্বিয়ার ঐতিহ্যবাহী হলুদ ফুটবল জার্সি পরে এবং জাতীয় পতাকা হাতে উদযাপনে মেতে ওঠেন। অনেক সমর্থককে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের রাজনৈতিক ঘরানার মতো টুপি পরতেও দেখা যায়, যাতে লেখা ছিল ‘কলম্বিয়াকে আবারও মহান করুন’।
এই জয়ের পর ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজেও তাঁর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ একটি পোস্টে এসপ্রিয়ালাকে অভিনন্দন জানিয়ে একে একটি বিশাল জয় বলে অভিহিত করেছেন।
বিপরীতে, বামপন্থি শিবিরের সমর্থকেরা এই ফলাফলে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। বাররнакিয়ার রাস্তায় জড়ো হওয়া সেপেদার সমর্থক ক্যাটালিনা লা গ্রান্দে নামের এক অধিকারকর্মী জানান, এত অল্প ব্যবধানের এই ফলাফল সাধারণ মানুষের মনে এক ধরনের অস্বস্তি ও শঙ্কা তৈরি করছে।
এটি মূলত কলম্বিয়ার অভ্যন্তরীণ গভীর বিভক্তি এবং আগামী দিনে গণতন্ত্র, শান্তি ও মানবাধিকার রক্ষার ক্ষেত্রে এক বিশাল চ্যালেঞ্জের ইঙ্গিত দেয়। তবে মারিয়া নামের আরেক সমর্থক উল্লেখ করেন যে, তীব্র রাজনৈতিক মেরুকরণ ও মতপার্থক্য থাকা সত্ত্বেও সাধারণ মানুষ রাস্তায় বড় ধরনের কোনো সহিংসতা না ঘটিয়ে ধৈর্য ধারণ করেছে, যা দেশের রাজনৈতিক পরিপক্বতার একটি ইতিবাচক দিক।
নির্বাচনের এই তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও দুই প্রার্থীর বিপরীতমুখী আদর্শের কারণে দেশজুড়ে এক ধরনের চাপা উত্তেজনা বিরাজ করছে। বিশেষ করে কোনো পক্ষ যদি চূড়ান্ত ফলাফল মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানায়, তবে পরিস্থিতি আরও জটিল হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ইতিমধ্যে রোববার রাতে দেশের তৃতীয় বৃহত্তম শহর কালি থেকে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তীব্র সংঘর্ষের খবর পাওয়া গেছে। সেখানে দে লা এসপ্রিয়েলার সম্ভাব্য বিজয়ের প্রতিবাদে কিছু বিক্ষোভকারী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় পতাকা পুড়িয়ে ক্ষোভ প্রদর্শন করে।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে স্থানীয় পুলিশকে কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করতে হয়। এদিকে বর্তমান বামপন্থি প্রেসিডেন্ট গুস্তাভো পেত্রো এই প্রাথমিক ফলাফলকে চ্যালেঞ্জ করার স্পষ্ট ইঙ্গিত দিয়েছেন।
তিনি তাঁর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন যে, প্রাথমিক গণনার ওপর ভিত্তি করে এখনই কাউকে আনুষ্ঠানিকভাবে বিজয়ী বা দেশের প্রেসিডেন্ট ঘোষণা করা যায় না।
তিনি ভোট সফটওয়্যারটি সম্পূর্ণভাবে নিরীক্ষা করার জোর দাবি জানান এবং প্রমাণ ছাড়াই কিছু নির্দিষ্ট ভোটকেন্দ্রে বাইরের প্রভাব খাটানোর অভিযোগ তোলেন। সব মিলিয়ে, কলম্বিয়ার ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব নির্ধারণের এই প্রক্রিয়াটি এখন আইনি ও রাজনৈতিক টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।