সোমবার, জুন ২২, ২০২৬
৮ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

পাকিস্তান সফরে যাচ্ছেন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ২২ জুন, ২০২৬, ০৯:১৪ পিএম

পাকিস্তান সফরে যাচ্ছেন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান
ছবি : File Photo

আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতিতে এক নাটকীয় এবং কৌতূহলোদ্দীপক মোড় তৈরি করে হঠাৎ করেই প্রতিবেশী রাষ্ট্র পাকিস্তানে এক আকস্মিক সফরে যাচ্ছেন ইসলামিক প্রজাতন্ত্র ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান।

 

ইউরোপের দেশ সুইজারল্যান্ডে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যখন ইরানের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং উচ্চপর্যায়ের ধারাবাহিক আলোচনা চলছে, ঠিক সেই স্পর্শকাতর মুহূর্তেই তাঁর এই ঝটিকা সফরের ঘোষণা আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

 

বিশেষ করে, গত ফেব্রুয়ারি মাসে ইরানের ভূখণ্ডে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলের যৌথ সামরিক হামলার পর এটিই হতে যাচ্ছে প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ানের প্রথম আনুষ্ঠানিক কোনো বিদেশ সফর।

 

এমন একটি ভয়াবহ এবং ধ্বংসাত্মক হামলার পর দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা এবং সামরিক সক্ষমতা পুনরুদ্ধারের দিকেই তেহরানকে বেশি মনোযোগ দিতে হয়েছিল।

 

সেই কঠিন পরিস্থিতি সামলে ওঠার পর আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ানের এই প্রথম পদচারণা অত্যন্ত প্রতীকী এবং শক্তিশালী একটি বার্তা বহন করছে। বৈশ্বিক কূটনীতির বিশ্লেষকদের নজর এখন দক্ষিণ এশিয়ার এই শক্তিশালী মিত্র দেশের সঙ্গে ইরানের কৌশলগত সম্পর্কের দিকে নিবদ্ধ হয়েছে।

 

সোমবার, ২২ জুন ইরানের রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ের জনসংযোগ বিভাগের মহাপরিচালক হাবিব আব্বাসী দেশটির রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম তাসনিম নিউজ এজেন্সির বরাত দিয়ে এই অতি গুরুত্বপূর্ণ সফরের বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেছেন।

 

আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা আনাদোলু এজেন্সি এবং সিএনএন-এর বিশদ প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, আগামীকালের এই রাষ্ট্রীয় সফরটি সম্পূর্ণ আকস্মিক হলেও এর কূটনৈতিক তাৎপর্য অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী।

 

পূর্বনির্ধারিত কোনো দীর্ঘ প্রস্তুতি না থাকলেও আন্তর্জাতিক প্রটোকল মেনেই এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সফর অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। হাবিব আব্বাসী সংবাদমাধ্যমকে নিশ্চিত করে জানান যে, সময়ের সীমাবদ্ধতা এবং অন্যান্য রাষ্ট্রীয় ব্যস্ততার কারণে ইরানের প্রেসিডেন্টের এই সফরটি সম্ভবত মাত্র একদিনের জন্যই স্থায়ী হবে।

 

তবে অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত সময়ের এই সফরের সূচিতে বেশ কয়েকটি উচ্চপর্যায়ের এবং নীতিনির্ধারণী বৈঠক অন্তর্ভুক্ত রয়েছে, যা আঞ্চলিক কূটনীতির বর্তমান গতিপ্রকৃতি নির্ধারণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।

 

ইসলামাবাদে পৌঁছানোর পর ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান পাকিস্তানের শীর্ষ রাষ্ট্রীয় নেতৃত্বের সঙ্গে সরাসরি এবং নিবিড় আলোচনায় মিলিত হবেন। কূটনৈতিক সূত্রগুলো নিশ্চিত করেছে যে, এই একদিনের কর্মব্যস্ত সফরে তিনি পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট আসিফ আলী জারদারি এবং প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের সঙ্গে পৃথক ও একান্ত বৈঠকে বসবেন।

 

এই দ্বিপাক্ষিক বৈঠকগুলোতে মূলত দুই দেশের মধ্যকার অমীমাংসিত এবং চলমান বিভিন্ন চুক্তির সর্বশেষ অগ্রগতি নিয়ে বিশদ পর্যালোচনা করা হবে। বিশেষ করে বহুল আলোচিত জ্বালানি খাতের সহযোগিতা এবং সীমান্ত বাণিজ্যের মতো দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্পগুলো নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত আসতে পারে।

 

এর পাশাপাশি, অর্থনৈতিক সম্পর্কের ব্যাপক সম্প্রসারণ, দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বৃদ্ধি, উভয় দেশের সীমান্তবর্তী এলাকার বাজারগুলোর উন্নয়ন এবং সর্বোপরি মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ এশিয়ার বিরাজমান উত্তেজনাকর পরিস্থিতিতে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা রক্ষার মতো অত্যন্ত সংবেদনশীল বিষয়গুলো এই শীর্ষ আলোচনার মূল এজেন্ডা হিসেবে স্থান পাবে।

 

দুই প্রতিবেশী মুসলিম রাষ্ট্র ইরান এবং পাকিস্তানের মধ্যকার সম্পর্ক ঐতিহাসিক হলেও বিভিন্ন সময়ে ভূ-রাজনৈতিক জটিল সমীকরণের কারণে এতে নানা ধরনের উত্থান-পতন পরিলক্ষিত হয়েছে।

 

বিশেষ করে দীর্ঘ সীমান্ত এলাকায় নিরাপত্তা বজায় রাখা এবং আন্তঃসীমান্ত অপরাধ দমনের মতো বিষয়গুলো উভয় দেশের জন্যই বড় একটি চ্যালেঞ্জ। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তেহরান এবং ইসলামাবাদ তাদের মধ্যকার অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও কৌশলগত অংশীদারিত্বকে নতুন একটি ইতিবাচক পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য নিরলস প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

 

উল্লেখ্য, এর আগে গত বছরের আগস্ট মাসেও ইরানের প্রেসিডেন্ট একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ রাষ্ট্রীয় সফরে পাকিস্তানে গিয়েছিলেন। এক বছরেরও কম সময়ের ব্যবধানে পুনরায় এই আকস্মিক সফর এই কথারই প্রমাণ বহন করে যে, উভয় দেশ তাদের পারস্পরিক বোঝাপড়া এবং কূটনৈতিক মেলবন্ধনকে কতটা সর্বোচ্চ গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে।

 

পশ্চিমা দেশগুলোর নানামুখী অর্থনৈতিক অবরোধ এবং সামরিক হুমকির মুখে পড়ে ইরান তার প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে একটি শক্তিশালী আঞ্চলিক বলয় গড়ে তুলতে চাইছে বলে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা মনে করছেন।

 

সবশেষে, সুইজারল্যান্ডে চলমান মার্কিন-ইরান কূটনৈতিক প্রক্রিয়ার সমান্তরালে পেজেশকিয়ানের এই পাকিস্তান সফর নিঃসন্দেহে একটি সুচিন্তিত ও গভীর কৌশলগত বার্তা বিশ্ববাসীর কাছে পৌঁছে দিচ্ছে।

 

একদিকে যখন তেহরান পশ্চিমাদের সঙ্গে নিজেদের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক স্বার্থ সুরক্ষার জন্য আলোচনার টেবিলে অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে দরকষাকষি করছে, ঠিক তখনই আঞ্চলিক মিত্রদের সঙ্গে সম্পর্ক ঝালাই করার এই গঠনমূলক উদ্যোগ আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে ইরানের দরকষাকষির ক্ষমতাকে আরও সুদৃঢ় করবে।

 

অন্যদিকে, পাকিস্তান দীর্ঘদিন ধরেই এই অঞ্চলে একটি অত্যন্ত ভারসাম্যপূর্ণ কূটনৈতিক অবস্থান বজায় রাখার চেষ্টা করছে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তাদের সম্পর্কের পাশাপাশি আঞ্চলিক মিত্র ইরানের সঙ্গে সম্পর্কও অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে সমান্তরালভাবে এগিয়ে নিতে হচ্ছে।

 

ফলে ইরানের প্রেসিডেন্টের এই আকস্মিক সফর শুধু তেহরান ও ইসলামাবাদের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের জন্যই নয়, বরং গোটা এশিয়া অঞ্চলের ভূ-রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, অর্থনৈতিক নিরাপত্তা এবং ভবিষ্যৎ রূপরেখা নির্ধারণে একটি শক্তিশালী ও নিয়ামক হিসেবে কাজ করবে বলে দৃঢ়ভাবে আশা করা হচ্ছে।

 

- আনাদোলু এজেন্সি,সিএনএন