মাদুরো সরকারের সাবেক এই ভাইস প্রেসিডেন্ট বর্তমানে রাষ্ট্র পরিচালনার গুরুদায়িত্ব পালন করছেন এবং তাঁর বলিষ্ঠ নেতৃত্বে দেশটিতে ব্যাপক কাঠামোগত ও নীতিগত পরিবর্তন লক্ষ করা যাচ্ছে।
সোমবার রাজধানী কারাকাসে আয়োজিত এক বিশেষ অনুষ্ঠানে দেওয়া ভাষণে তিনি দেশের এই যুগান্তকারী রাজনৈতিক পটপরিবর্তন এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের নতুন সমীকরণ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন।
চলতি বছরের শুরুতে ভেনেজুয়েলার রাজনৈতিক অঙ্গনে এক অভাবনীয় ও ঐতিহাসিক পরিবর্তন সাধিত হয়। ২০২৬ সালের জানুয়ারি মাসে রাজধানী কারাকাসে মার্কিন সামরিক বাহিনীর এক অতর্কিত ও শ্বাসরুদ্ধকর অভিযানের মধ্য দিয়ে তৎকালীন সমাজতান্ত্রিক প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়।
এরপরই দেশের শাসনভার গ্রহণ করেন প্রবীণ রাজনীতিক ডেলসি রদ্রিগেজ। রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই তিনি দেশের স্থবির হয়ে পড়া অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করার লক্ষ্যে নানামুখী সাহসী উদ্যোগ গ্রহণ করেন।
বিশেষ করে, দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারকে বেসরকারি বিনিয়োগ এবং বিদেশি স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যবসায়িক কার্যক্রমের জন্য সম্পূর্ণভাবে উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়েছে, যা পূর্ববর্তী সরকারের কট্টর নীতির একেবারে বিপরীত একটি পদক্ষেপ।
আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা এএফপি জানিয়েছে, ভেনেজুয়েলার এই রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক রূপান্তরের পুরো প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
রাজধানী কারাকাসে আয়োজিত ওই বিশেষ অনুষ্ঠানে ডেলসি রদ্রিগেজ মূলত যুক্তরাষ্ট্রের রাজধানী ওয়াশিংটনের সাথে ভেনেজুয়েলার স্থগিত হয়ে থাকা কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনঃস্থাপনের বিষয়টিকেই ব্যাপকভাবে উদ্যাপন করেন।
নিকোলাস মাদুরোকে আটক করার পর থেকে দুই দেশের মধ্যকার দীর্ঘদিনের শীতল ও বৈরী সম্পর্কের বরফ গলতে শুরু করে এবং বর্তমানে তা এক নতুন ও ইতিবাচক মাত্রায় উপনীত হয়েছে।
অনুষ্ঠানে দেওয়া আবেগঘন ভাষণে রদ্রিগেজ বলেন, ৩ জানুয়ারি, ২০২৬ তারিখটি আমাদের জাতীয় রাজনীতি এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের প্রতি আমাদের দীর্ঘদিনের দৃষ্টিভঙ্গিতে একটি অভাবনীয় মোড় ঘোরানো দিন হিসেবে ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে চিহ্নিত হয়ে থাকবে।
এই ঐতিহাসিক দিনটির তাৎপর্য তুলে ধরে তিনি উপস্থিত আন্তর্জাতিক অতিথি ও বিদেশি কূটনীতিকদের উদ্দেশে বলেন, মাত্র এক বছর আগেও এই সময়ে ভেনেজুয়েলার কোনো সাধারণ নাগরিক মাদুরো-পরবর্তী এমন একটি স্বাধীন ও উন্মুক্ত সময়ের কথা কল্পনাও করতে পারেননি।
মাদুরো-পরবর্তী নতুন ভেনেজুয়েলার বর্তমান পরিস্থিতি ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা মূল্যায়ন করতে গিয়ে অন্তর্বর্তীকালীন এই নেতা অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সাথে বলেন, ইতোমধ্যে প্রায় ছয় মাস সময় পেরিয়ে গেছে এবং আমরা যে নতুন নীতি ও সংস্কারের পথে অগ্রসর হচ্ছি, আমার দৃঢ় বিশ্বাস, এটিই আমাদের জাতীয় স্বার্থের জন্য একমাত্র সঠিক পথ ছিল।
দীর্ঘ কয়েক দশকের রাজনৈতিক বৈরিতা ও আদর্শগত মতপার্থক্য ভুলে তিনি উন্নত বিশ্বের সাথে, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখার ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব আরোপ করেন।
রদ্রিগেজ স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন যে, ভেনেজুয়েলা ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে অতীতে যে সমস্ত গভীর রাজনৈতিক ও আদর্শগত মতপার্থক্য বিদ্যমান ছিল, তা এখন যেকোনো সংঘাত বা উত্তেজনার পরিবর্তে কেবল 'কূটনৈতিক চ্যানেলের মাধ্যমে' শান্তিপূর্ণভাবে সমাধান করা সম্ভব।
আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক অঙ্গন থেকে বহু বছর ধরে প্রায় সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন থাকার পর অবশেষে কারাকাস ও ওয়াশিংটন আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের পূর্ণাঙ্গ কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনঃস্থাপন করেছে, যা গোটা অঞ্চলের ভূ-রাজনীতিতে একটি বড় অর্জন।
এই অসামান্য কূটনৈতিক সাফল্যের পাশাপাশি অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও ভেনেজুয়েলা ব্যাপক সুবিধা পেতে শুরু করেছে। বিশেষ করে, দেশটির অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি এবং আয়ের মূল উৎস তেল শিল্পের ওপর যুক্তরাষ্ট্র যে দীর্ঘমেয়াদি ও কঠোর অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ করে রেখেছিল, তা ইতোমধ্যে উল্লেখযোগ্য হারে শিথিল করা হয়েছে।
আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ভেনেজুয়েলার ভূগর্ভে লুকিয়ে থাকা বিপুল পরিমাণ প্রাকৃতিক সম্পদ এবং অপরিশোধিত তেলের মজুতের প্রতি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের গভীর অর্থনৈতিক ও কৌশলগত আগ্রহ রয়েছে, যা দুই দেশের এই দ্রুত ও অভাবনীয় সম্পর্ক উন্নয়নের অন্যতম প্রধান নিয়ামক হিসেবে কাজ করেছে।
একদিকে যখন ভেনেজুয়েলায় নতুন রাজনৈতিক মেরুকরণ, গণতান্ত্রিক সংস্কার ও অর্থনৈতিক স্বাধীনতার সুবাতাস বইছে, ঠিক তখনই সাবেক প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো তাঁর জীবনের সবচেয়ে অন্ধকার ও দুর্বিষহ সময় পার করছেন।
একসময়ের প্রতাপশালী ও ক্ষমতাচ্যুত এই নেতা বর্তমানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক শহরের একটি কঠোর নিরাপত্তাবেষ্টিত কারাগারে বন্দিজীবন যাপন করতে বাধ্য হচ্ছেন।
সেখানে তাঁর বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক মাদক পাচার, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং অন্যান্য গুরুতর অপরাধের অভিযোগ এনে মার্কিন বিচার বিভাগে আইনি প্রক্রিয়া পরিচালনা করা হচ্ছে।
তবে সোমবার রাজধানী কারাকাসে আয়োজিত ডেলসি রদ্রিগেজের এই আনন্দঘন উদ্যাপন অনুষ্ঠানে একটি অত্যন্ত কৌতূহলোদ্দীপক ও বিস্ময়কর বিষয় উপস্থিত সবার নজর কাড়ে।
ওই অনুষ্ঠানে ক্ষমতাচ্যুত প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোর ছেলে নিকোলাস মাদুরো গুয়েরাও শারীরিকভাবে উপস্থিত ছিলেন, যা দেশটির ভবিষ্যৎ অভ্যন্তরীণ রাজনীতির এক নতুন, সহনশীল ও জটিল সমীকরণের ইঙ্গিত প্রদান করে।