যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ ও গবেষণা সংস্থা এই বিপর্যয় নিয়ে একটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক বিবৃতি প্রকাশ করেছে। সংস্থাটির প্রাথমিক ধারণা অনুযায়ী, এই ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগে নিহতের সংখ্যা দশ হাজার ছাড়িয়ে যেতে পারে।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো এই ঘটনাটিকে সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম মর্মান্তিক বিপর্যয় হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। মার্কিন সংবাদমাধ্যম এবং অন্যান্য নির্ভরযোগ্য সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, গতকাল বুধবার স্থানীয় সময় ঠিক সন্ধ্যা ৬টা ৪ মিনিটের দিকে এই প্রলয়ঙ্কারী ভূমিকম্প আঘাত হানে।
প্রথম কম্পনের রেশ কাটতে না কাটতেই মাত্র কয়েক সেকেন্ডের ব্যবধানে দ্বিতীয় আরেকটি শক্তিশালী ভূকম্পন অনুভূত হয়, যা জনমনে চরম আতঙ্ক ও বিভীষিকার সৃষ্টি করে। রিখটার স্কেলে এই জোড়া ভূমিকম্পের মাত্রা ছিল যথাক্রমে ৭ দশমিক ২ এবং ৭ দশমিক ৫।
এই মাত্রার ভূমিকম্প ভূতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে অত্যন্ত ধ্বংসাত্মক হিসেবে বিবেচিত হয়। জানা গেছে, ভেনেজুয়েলার উত্তরাঞ্চলীয় উপকূলীয় এলাকা ছিল এই প্রলয়ঙ্কারী ভূমিকম্পের প্রধান উৎপত্তিস্থল বা মূল কেন্দ্র।
ভৌগোলিক ও অর্থনৈতিক দিক থেকে এই অঞ্চলটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এখানেই দেশটির বেশ কয়েকটি প্রধান জ্বালানি তেল শোধনাগার অবস্থিত। ফলে ভূমিকম্পের ধ্বংসলীলার পাশাপাশি এই শোধনাগারগুলোতে অগ্নিকাণ্ড বা অন্যান্য আনুষঙ্গিক বিপর্যয়ের ঝুঁকিও চরম আকার ধারণ করেছে।
দুর্যোগের ভয়াবহতা বহুগুণ বৃদ্ধি পাওয়ার পেছনে একটি মর্মান্তিক কারণ ছিল গতকালের দিনটি। গতকাল ভেনেজুয়েলায় সরকারি ছুটি থাকায় দেশের অধিকাংশ মানুষ তাদের কর্মস্থল থেকে দূরে নিজেদের বাড়িতে অবস্থান করছিলেন।
পরিবারের সদস্যদের সাথে ছুটির আনন্দ উপভোগ করার সময়ই হঠাৎ এই প্রাণঘাতী দুর্যোগ নেমে আসে। বহুতল ভবন ও ঘরবাড়ি প্রচণ্ড বেগে দুলতে শুরু করলে মানুষ প্রাণভয়ে দিগ্বিদিক ছুটে পালানোর চেষ্টা করে।
তবে অনেকেই ভবনের ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকা পড়েছেন বলে প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনায় উঠে এসেছে। রাজধানী কারাকাসসহ দেশের বিভিন্ন বড় শহর এবং প্রত্যন্ত গ্রামগুলোর বহু ভবন তাসের ঘরের মতো ধসে পড়েছে, যা উদ্ধারকর্মীদের জন্য এক বিশাল ও জটিল চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা তাদের বিস্তারিত বিবৃতিতে এই বিপুল সংখ্যক প্রাণহানির আশঙ্কার পেছনের বৈজ্ঞানিক ও কাঠামোগত কারণগুলো স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করেছে। সংস্থাটির বিশেষজ্ঞদের মতে, ভেনেজুয়েলার অধিকাংশ আবাসিক ভবন, বাণিজ্যিক স্থাপনা এবং ঘরবাড়ি নির্মাণের ক্ষেত্রে আধুনিক ভূমিকম্প সহনশীল প্রযুক্তি বা নিয়মকানুন যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়নি।
দুর্বল অবকাঠামো এবং অপরিকল্পিত নগরায়ণের কারণে মাঝারি মাত্রার কম্পনেই এসব ভবন ধসে পড়ার ঝুঁকিতে থাকে, সেখানে ৭ মাত্রার অধিক এমন জোড়া কম্পন আক্ষরিক অর্থেই কাঠামোগুলোকে মাটির সাথে মিশিয়ে দিয়েছে।
ভবনগুলোর এই কাঠামোগত দুর্বলতার কারণেই ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে নিহতের সংখ্যা দশ হাজার বা তার চেয়েও অনেক বেশি হতে পারে বলে ভূতাত্ত্বিকরা জোরালো আশঙ্কা প্রকাশ করছেন।
ভূমিকম্পের পরপরই উপকূলীয় অঞ্চলগুলোতে এক নতুন আতঙ্কের সৃষ্টি হয়। শক্তিশালী কম্পনের কারণে সমুদ্রে বড় ধরনের সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাস বা সুনামির আশঙ্কা দেখা দেওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক সংস্থা তাৎক্ষণিকভাবে একটি সতর্কতা জারি করেছিল।
এর ফলে উপকূলীয় বাসিন্দাদের মধ্যে ব্যাপক আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে এবং অনেকেই নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে উঁচু স্থানে ছুটতে শুরু করেন। তবে কয়েক ঘণ্টা নিবিড় পর্যবেক্ষণের পর সমুদ্রপৃষ্ঠের স্বাভাবিক অবস্থা নিশ্চিত করে সংস্থাটি পরবর্তীতে সেই সতর্কতা প্রত্যাহার করে নেয়, যা উপকূলীয় বাসিন্দাদের জন্য কিছুটা স্বস্তির কারণ হলেও মূল ভূখণ্ডের ধ্বংসলীলার শোকাবহ পরিস্থিতি অপরিবর্তিত রয়েছে।
বর্তমানে ভেনেজুয়েলার সরকার এবং স্থানীয় উদ্ধারকারী দলগুলো ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে পড়া মানুষদের জীবিত উদ্ধারে আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। তবে দেশের বিস্তীর্ণ এলাকায় বিদ্যুৎ সংযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন থাকা, টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থার ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি এবং প্রধান সড়কগুলো ভেঙে চুরমার হয়ে যাওয়ার কারণে প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলোতে উদ্ধার অভিযান চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
ভারী যন্ত্রপাতি পৌঁছাতে না পারায় অনেক স্থানে স্থানীয় জনগণ খালি হাতেই আপনজনদের সন্ধান করছেন। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে যে, এই মুহূর্তে আনুষ্ঠানিকভাবে নিহতের সঠিক সংখ্যা নিরূপণ করা প্রায় অসম্ভব।
কারণ, উদ্ধারকর্মীরা যতই ধ্বংসস্তূপ সরাচ্ছেন, ততই নতুন নতুন মৃতদেহ উদ্ধার হচ্ছে, যা পরিস্থিতিকে আরও হৃদয়বিদারক করে তুলছে। হাসপাতালগুলোতে আহতদের উপচে পড়া ভিড় এবং চিকিৎসা সরঞ্জামের তীব্র সংকট স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থাকে খাদের কিনারায় ঠেলে দিয়েছে।
দক্ষিণ আমেরিকার এই অঞ্চলটি ভূতাত্ত্বিকভাবে অত্যন্ত সক্রিয় এবং ভূমিকম্পপ্রবণ হিসেবে পরিচিত হলেও, এমন মাত্রার জোড়া ভূমিকম্পের ঘটনা সাম্প্রতিক ইতিহাসে সত্যিই বিরল। পুরো দেশ এখন এক গভীর শোক, হাহাকার ও চরম অনিশ্চয়তার চাদরে ঢাকা পড়েছে।
স্বজন হারানো মানুষের আর্তনাদে বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ইতিমধ্যে ভেনেজুয়েলার এই চরম দুঃসময়ে গভীর শোক ও সমবেদনা প্রকাশ করেছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মানবিক সহায়তা সংস্থা এবং প্রতিবেশী দেশগুলো জরুরি ভিত্তিতে চিকিৎসা সামগ্রী, খাদ্য এবং দক্ষ উদ্ধারকারী দল পাঠানোর জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করতে শুরু করেছে। এই ভয়াবহ প্রাকৃতিক বিপর্যয় কাটিয়ে উঠতে ভেনেজুয়েলার দীর্ঘ সময় এবং ব্যাপক আন্তর্জাতিক সহায়তার প্রয়োজন হবে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।