নিজের স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে এই স্পর্শকাতর বিষয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে তিনি প্রায়শই নতুন আলোচনার জন্ম দেন। এবার তিনি প্রকাশ্যে জানালেন যে, তার স্ত্রী এবং যুক্তরাষ্ট্রের ফার্স্ট লেডি মেলানিয়া ট্রাম্প তাকে মঞ্চে নাচতে এবং রূপান্তরকামী অ্যাথলেটদের নিয়ে কোনো ধরনের কৌতুক বা উপহাস করতে কঠোরভাবে নিষেধ করেছিলেন।
কিন্তু স্ত্রীর সেই বারণ ও গঠনমূলক পরামর্শকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে গত মঙ্গলবার, ২৩ জুন রাতে পেনসিলভানিয়া অঙ্গরাজ্যে আয়োজিত এক বিশাল জনসভায় রূপান্তরকামী ক্রীড়াবিদদের নিয়ে প্রকাশ্যেই উপহাস করেছেন ট্রাম্প। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোতে তার এই মন্তব্যের বিষয়টি বেশ গুরুত্বের সঙ্গে প্রচার করা হচ্ছে।
পেনসিলভানিয়ার ওই গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনী জনসভায় প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার চেনা নাটকীয় ভঙ্গিতে উপস্থিত হাজারো সমর্থকের সামনে বক্তব্য রাখছিলেন। বক্তব্যের একপর্যায়ে তিনি নিজেই তার স্ত্রীর দেওয়া সতর্কবার্তার কথা অকপটে জনতার সামনে স্বীকার করেন।
ট্রাম্প উপস্থিত জনতাকে উদ্দেশ্য করে বলেন যে, মেলানিয়া তাকে একজন প্রকৃত রাষ্ট্রনেতার মতো আচরণ করার পরামর্শ দিয়েছিলেন। ট্রাম্পের ভাষায়, "মেলানিয়া আমাকে বলেছে, ডার্লিং, দয়া করে মঞ্চে নেচো না। এটি একেবারেই প্রেসিডেন্টসুলভ আচরণ নয়।
বিশেষ করে ছেলে ও মেয়েদের ভারোত্তলন প্রতিযোগিতা এবং সাঁতার নিয়ে জনসমক্ষে কোনো কথা বলো না। দয়া করে মঞ্চের ওপর দাঁড়িয়ে সাঁতার কাটার মতো কোনো শারীরিক অঙ্গভঙ্গি করে দেখিও না।"
ফার্স্ট লেডি মূলত চেয়েছিলেন তার স্বামী যেন এমন কোনো আচরণ বা মন্তব্য না করেন, যা প্রেসিডেন্ট পদের মর্যাদাকে ক্ষুণ্ণ করতে পারে অথবা নির্দিষ্ট কোনো প্রান্তিক গোষ্ঠীর মানুষের অনুভূতিতে আঘাত হানতে পারে।
কিন্তু মেলানিয়ার এই অত্যন্ত যৌক্তিক, সংযত ও ভাবমূর্তি রক্ষাকারী পরামর্শ প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ওপর কোনো ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারেনি। স্ত্রীর বারণের কথা জনসমক্ষে প্রকাশ করার ঠিক পরপরই তিনি ঠিক সেই কাজটিই অবলীলায় করে বসেন, যা করতে তাকে নিষেধ করা হয়েছিল।
নারী ভারোত্তলন প্রতিযোগিতায় রূপান্তরকামী অ্যাথলেটদের অংশগ্রহণের চরম বিতর্কিত বিষয়টি টেনে এনে তিনি তীব্র সমালোচনা শুরু করেন। শুধু মৌখিক সমালোচনায় সীমাবদ্ধ না থেকে, বিশাল মঞ্চের ওপর দাঁড়িয়ে তিনি রীতিমতো শারীরিক অঙ্গভঙ্গি করে পুরো পরিস্থিতিটি ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করেন।
ট্রাম্প অভিনয় করে দেখান, কীভাবে একজন নারী ভারোত্তলক অত্যন্ত ভারী একটি ওজন তুলতে গিয়ে রীতিমতো হিমশিম খাচ্ছেন এবং চরম শারীরিক কষ্টের মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন। তিনি আরও বর্ণনা করেন যে, সেই নারী অ্যাথলেটের এমন কষ্টকর অবস্থা দেখে দর্শকসারিতে বসে থাকা তার বাবা-মা চরম দুশ্চিন্তায় ও হতাশায় পড়ে যান।
কিন্তু ঠিক সেই একই প্রতিযোগিতায় যখন একজন রূপান্তরকামী অ্যাথলেট অংশগ্রহণ করেন, তখন তিনি কোনো ধরনের শারীরিক বেগ না পেয়েই অত্যন্ত সাবলীল ও সহজভাবে সেই একই ওজনের ভারোত্তলন সম্পন্ন করে ফেলেন।
ট্রাম্পের করা এই ব্যঙ্গাত্মক শারীরিক অঙ্গভঙ্গি এবং তুলনামূলক অভিনয়ের দৃশ্য দেখে জনসভায় উপস্থিত তার হাজারো কট্টর সমর্থক উল্লাসে ফেটে পড়েন এবং হাসিতে মেতে ওঠেন। সমর্থকদের এই ব্যাপক সমর্থন ও উচ্ছ্বাস প্রেসিডেন্টকে তার রাজনৈতিক মতাদর্শ প্রকাশে আরও বেশি উৎসাহিত করে তোলে।
এরপর অত্যন্ত দৃঢ় কণ্ঠে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তার মূল রাজনৈতিক বার্তাটি পরিষ্কার করেন। তিনি স্পষ্টভাবে দাবি করেন যে, যেসব ব্যক্তি শারীরবৃত্তীয়ভাবে পুরুষ হিসেবে জন্মগ্রহণ করেছেন এবং পরবর্তীতে রূপান্তরিত হয়েছেন, তাদের কোনোভাবেই নারীদের জন্য নির্ধারিত ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়া উচিত নয়।
তার মতে, শারীরিকভাবে পুরুষদের পেশি ও গঠনগত সুবিধা থাকায় নারীদের প্রতিযোগিতায় তাদের অংশগ্রহণ সাধারণ নারী অ্যাথলেটদের প্রতি এক চরম অবিচার। ট্রাম্পের এই বক্তব্য যুক্তরাষ্ট্রের রক্ষণশীল ভোটারদের মধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেলেও, মানবাধিকার কর্মী এবং রূপান্তরকামী সম্প্রদায়ের অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলো এর তীব্র নিন্দা জানিয়েছে।
আন্তর্জাতিক ক্রীড়াঙ্গনে এবং যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে নারী ইভেন্টে রূপান্তরকামী ক্রীড়াবিদদের অংশগ্রহণের বিষয়টি বর্তমানে একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল, জটিল ও মেরুকরণ সৃষ্টিকারী ইস্যু।
একদিকে যেমন মানবাধিকার কর্মীরা সব ধরনের বৈষম্য দূর করে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সমানাধিকারভিত্তিক ক্রীড়া পরিবেশ নিশ্চিত করার জন্য জোরালো দাবি জানাচ্ছেন, ঠিক অন্যদিকে রক্ষণশীল রাজনীতিক ও ক্রীড়া বিশ্লেষকরা নারী অ্যাথলেটদের অধিকার সুরক্ষার কথা বলছেন।
তাদের প্রধান যুক্তি হলো, শারীরিক সক্ষমতা এবং পেশিশক্তির জন্মগত পার্থক্যের কারণে রূপান্তরকামী অ্যাথলেটরা নারী ইভেন্টে বাড়তি সুবিধা পেয়ে থাকেন, যা প্রতিযোগিতার সুস্থ ও নিরপেক্ষ পরিবেশকে চরমভাবে নষ্ট করে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার দীর্ঘ রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই এই নির্দিষ্ট ইস্যুতে রক্ষণশীল গোষ্ঠীর নেতৃত্ব দিয়ে আসছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, পেনসিলভানিয়ার এই জনসভায় ট্রাম্পের এমন আচরণ মোটেও অপরিকল্পিত নয়; বরং এটি তার বৃহত্তর রাজনৈতিক প্রচারণার একটি অত্যন্ত সুচিন্তিত কৌশল। তিনি খুব ভালোভাবে জানেন যে তার সমর্থক গোষ্ঠী এই ধরনের খোলামেলা ও বিতর্কিত মন্তব্যগুলো দারুণভাবে উপভোগ করে।
তবে স্ত্রীর বারণ সত্ত্বেও জনসমক্ষে প্রকাশ্যে এমন উপহাসমূলক শারীরিক অঙ্গভঙ্গি করার এই ঘটনা আবারও প্রমাণ করে যে, নিজের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য ট্রাম্প যেকোনো প্রতিষ্ঠিত শিষ্টাচারের সীমারেখা অতিক্রম করতে কুণ্ঠাবোধ করেন না। আগামী দিনগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক অঙ্গনে এই ধরনের বক্তব্য ও বিতর্ক যে আরও তীব্র আকার ধারণ করবে, তা রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের কাছে এখন অনেকটাই স্পষ্ট।