রাজধানী কারাকাস এবং এর আশপাশের অঞ্চলে আঘাত হানা এই প্রলয়ংকরী ভূমিকম্পে নিজের অমূল্য জীবন উৎসর্গ করে শিশুকন্যাকে মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা করেছেন এক সাহসী মা। নিহত এই মহীয়সী নারীর নাম আন্দ্রেয়া, যিনি ভেনেজুয়েলার পরিচিত ফুটবলার হেক্টর বেলোর সহধর্মিণী ছিলেন।
এই মর্মান্তিক ও একইসঙ্গে বীরত্বপূর্ণ ঘটনাটি প্রাকৃতিক দুর্যোগের ভয়াবহতার মাঝেও মাতৃত্বের অসীম শক্তির এক উজ্জ্বল প্রমাণ হিসেবে মানুষের হৃদয়ে দাগ কেটেছে। পারিবারিক ও স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের সূত্র অনুযায়ী, ভূমিকম্পের সময় আন্দ্রেয়া তার ছোট মেয়েকে নিয়ে নিজেদের বাসভবনেই অবস্থান করছিলেন।
আকস্মিক ও প্রচণ্ড কম্পনে যখন তাদের বহুতল ভবনটি তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ছিল, তখন নিজের জীবনের বিন্দুমাত্র পরোয়া না করে সন্তানকে পরম মমতায় বুকে আগলে রেখেছিলেন তিনি। কংক্রিটের ভারী ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে আন্দ্রেয়া শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেও, তার তৈরি করা সেই নিরাপদ আশ্রয়ে অলৌকিকভাবে প্রাণে বেঁচে যায় তাদের অবুঝ শিশুকন্যা।
ভেনেজুয়েলার অন্যতম ক্রীড়া সংগঠন 'কুমানা দে কাম্পেওনেস' এবং যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক স্প্যানিশ ভাষার শীর্ষস্থানীয় সংবাদমাধ্যম 'ইউনিভিশন' এই মর্মান্তিক মৃত্যুর খবরটি আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেছে। ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে উদ্ধারকর্মীরা যখন তাদের উদ্ধার করেন, তখন দেখা যায় মা চিরকালের জন্য ঘুমিয়ে গেলেও তার কোলের শিশুটি সম্পূর্ণ সুরক্ষিত রয়েছে।
এই অভাবনীয় ক্ষতির সম্মুখীন হয়ে ফুটবলার হেক্টর বেলো মানসিকভাবে সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছেন। দুর্ঘটনার খবর পাওয়া মাত্রই তিনি দ্রুততম সময়ের মধ্যে কারাকাসে ছুটে যান। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ইনস্টাগ্রামে তিনি তার প্রয়াত স্ত্রীর প্রতি এক গভীর আবেগঘন ও মর্মস্পর্শী বার্তা শেয়ার করেছেন, যা পড়ে নেটিজেনদের চোখও অশ্রুসজল হয়ে উঠেছে।
নিজের অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে এই শোকাহত স্বামী ও বাবা লেখেন যে, তার স্ত্রী একেবারে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত তাদের আদরের ছোট মেয়েকে নিজের বুকের মাঝে শক্ত করে আগলে রেখেছিলেন।
তিনি তার পোস্টে অঙ্গীকার করে লেখেন, ভবিষ্যতে কোনো একদিন তিনি তার মেয়েকে শোনাবেন কীভাবে তার মা তাকে বাঁচাতে গিয়ে নিজের জীবনকে অনায়াসে উৎসর্গ করেছিলেন। হেক্টর বেলো তার স্ত্রীকে এক অকুতোভয় সাহসী মা হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন, যিনি মৃত্যু নিশ্চিত জেনেও শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত নিজের নাড়িছেঁড়া ধনকে একা ছেড়ে যাননি।
বর্তমানে তাদের সেই শিশুকন্যা এবং তার খালা স্থানীয় একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। হেক্টর বেলো জানিয়েছেন যে তারা শারীরিকভাবে অনেকটাই বিপদমুক্ত হলেও এখনই তাদের হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র দেওয়া হচ্ছে না।
এই অবর্ণনীয় ও অসহনীয় কষ্টের সময়ে যারা তাদের পরিবারের পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন, তাদের সকলের প্রতি তিনি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করেছেন। তবে তার মনে একটি আক্ষেপ ক্রমাগত বেজে চলেছে।
অপর একটি পোস্টে তিনি নিজের অসহায়ত্ব প্রকাশ করে লিখেছেন যে, তিনি কীভাবে তার মেয়েকে এই কঠিন সত্যটি বোঝাবেন যে তাকে বাঁচাতে গিয়েই তার মা আর পৃথিবীতে নেই। দুর্ঘটনার সময় তিনি পরিবারের পাশে থাকতে পারেননি এবং তাদের রক্ষা করার জন্য কোনো পদক্ষেপই নিতে পারেননি-এই অপরাধবোধ তাকে প্রতিনিয়ত কুড়ে কুড়ে খাচ্ছে।
তিনি এই কঠিন পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য স্রষ্টার কাছে শক্তি প্রার্থনা করেছেন। এই ভয়াবহ ভূমিকম্পে ভেনেজুয়েলার ক্রীড়াঙ্গনেও নেমে এসেছে শোকের ঘন ছায়া। ভেনেজুয়েলা ফুটবল ফেডারেশন এবং সংশ্লিষ্ট ক্লাবগুলোর সরবরাহকৃত সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দেশের উদীয়মান দুই ফুটবলারও এই প্রাকৃতিক দুর্যোগের নির্মম শিকার হয়ে প্রাণ হারিয়েছেন।
কারাকাস ফুটবল ক্লাবের পক্ষ থেকে এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে জানানো হয়েছে যে, তাদের অনূর্ধ্ব-১৮ দলের প্রতিশ্রুতিশীল খেলোয়াড় রাজান সিজা লা গুয়াইরা এলাকায় নিজের বাড়িতে অবস্থানরত অবস্থায় পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের সঙ্গেই নিহত হয়েছেন।
অন্যদিকে, ক্লাব স্পোর্ট সান আগুস্তিন অত্যন্ত দুঃখের সাথে জানিয়েছে যে, তাদের একাডেমির নিয়মিত খেলোয়াড় ভিক্টর পালাসিওসও এই ধ্বংসলীলায় প্রাণ হারিয়েছেন। তরুণ এই খেলোয়াড়ের অকাল মৃত্যুতে ক্লাবের অভ্যন্তরে যে গভীর শূন্যতা তৈরি হয়েছে, তা কোনো ভাষাতেই প্রকাশ করা সম্ভব নয় বলে ক্লাব কর্তৃপক্ষ উল্লেখ করেছে।
ক্রীড়াবিদদের পাশাপাশি সমাজের অন্যান্য স্তরের বিশিষ্টজনরাও এই বিপর্যয়ের শিকার হয়েছেন। সাবেক মিস ভেনেজুয়েলা গিসেল রেয়েস এক মর্মস্পর্শী বিবৃতিতে জানিয়েছেন যে, ভূমিকম্পের তীব্রতায় লা গুয়াইরায় অবস্থিত তার মায়ের আবাসিক ভবনটি সম্পূর্ণভাবে ধসে পড়ে।
ভবন ধসে পড়ার সেই ভয়ংকর দৃশ্য এবং প্রবল আতঙ্কের কারণে আকস্মিক হৃদ্রোগে আক্রান্ত হয়ে তার মা মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। ওই সময় তার মায়ের সার্বক্ষণিক দেখাশোনার দায়িত্বে থাকা এক নার্স ভাগ্যক্রমে জীবিত উদ্ধার হয়েছেন এবং তিনিই পরবর্তীতে গিসেলের পরিবারকে এই মর্মান্তিক দুঃসংবাদটি পৌঁছে দেন।
উল্লেখ্য, গত বুধবার, ২৪ জুন ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাস এবং এর পার্শ্ববর্তী অঞ্চলগুলোতে পরপর দুটি শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হানে। এই ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগে এখন পর্যন্ত অন্তত ৯২০ জনের প্রাণহানির খবর সরকারিভাবে নিশ্চিত করা হয়েছে এবং তিন হাজারেরও বেশি মানুষ গুরুতরভাবে আহত হয়ে বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
ধ্বংসস্তূপের নিচে এখনো অসংখ্য মানুষ আটকা পড়ে আছেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। নিরলসভাবে কাজ করে চলা উদ্ধারকর্মীরা এখনো জীবনের ঝুঁকি নিয়ে জীবিতদের সন্ধানে তাদের উদ্ধার অভিযান অব্যাহত রেখেছেন।
পুরো দেশ জুড়ে এখন কেবলই স্বজন হারানোর কান্না এবং ধ্বংসের বিভীষিকা বিরাজ করছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এই দুর্দিনে ভেনেজুয়েলার জনগণের প্রতি গভীর সমবেদনা জানিয়েছে।