মুহূর্তের মধ্যে শত শত বহুতল ভবন, বাণিজ্যিক ও আবাসিক স্থাপনা তাসের ঘরের মতো ধসে পড়েছে। এই ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞের পর ধসে পড়া কংক্রিটের স্তূপের নিচে চাপা পড়েছেন অসংখ্য নিরীহ মানুষ। উদ্ধার তৎপরতা চলাকালে ধ্বংসস্তূপের গভীর থেকে প্রতিনিয়ত ভেসে আসছে আটকে পড়া বিপন্ন মানুষদের বাঁচার করুণ আকুতি ও আর্তনাদ।
চারদিকের হাহাকার এবং স্বজন হারানোর কান্নায় সেখানকার পরিবেশ এখন চরম শোকাবহ ও হৃদয়বিদারক রূপ ধারণ করেছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো এই ঘটনাটিকে সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম বড় মানবিক বিপর্যয় হিসেবে আখ্যায়িত করছে এবং উদ্ধারকাজের প্রতিটি মুহূর্ত এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
এই প্রলয়ঙ্কারী প্রাকৃতিক দুর্যোগের ভয়াবহতা ঠিক কতটা তীব্র ছিল, তা স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে রাজধানী কারাকাসের পঁচিশ বছর বয়সী এক তরুণ বাসিন্দা আলেজান্দ্রো রুইজ গার্সিয়ার বর্ণনায়। মৃত্যুর খুব কাছ থেকে ফিরে আসা এই প্রত্যক্ষদর্শী আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার কাছে সেই ভয়াল মুহূর্তের লোমহর্ষক অভিজ্ঞতা বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেছেন।
আলেজান্দ্রো জানান, ভূমিকম্পটি আঘাত হানার ঠিক এক সেকেন্ডেরও কম সময় আগে আধুনিক প্রযুক্তির কল্যাণে তিনি গুগলের একটি জরুরি সতর্কবার্তা বা অ্যালার্ট পেয়েছিলেন। কিন্তু সেই সতর্কবার্তা ভালোভাবে বুঝে ওঠার আগেই চারপাশ অত্যন্ত ভয়ঙ্কর ও অস্বাভাবিকভাবে কাঁপতে শুরু করে।
প্রকৃতির এই আকস্মিক ও তীব্র রোষানলে তিনি কোনোমতে নিজের প্রাণ বাঁচাতে সক্ষম হলেও, তার অত্যন্ত কাছের বেশ কয়েকজন আত্মীয় এবং প্রতিবেশী চোখের পলকে ধসে পড়া ভবনের নিচে চাপা পড়ে যান। চোখের সামনে প্রিয়জনদের এমন বিপদে পড়তে দেখা তার জন্য এক অবর্ণনীয় মানসিক আঘাত ছিল।
ভূমিকম্প চলাকালীন মুহূর্তের শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতির বর্ণনা দিতে গিয়ে আল জাজিরাকে আলেজান্দ্রো বলেন, "চারপাশের সবকিছু যেন চোখের সামনেই ধসে পড়ছিল, যা কেবল সেই পরিস্থিতিতে থাকা মানুষই গভীরভাবে অনুভব করতে পারবে।
তীব্র কম্পনের একপর্যায়ে আমি হঠাৎ করেই আমার নিজের বাড়ির একটি মজবুত দেওয়ালে বড় ধরনের ফাটল ধরতে দেখি। বিশ্বাস করুন, এটি ছিল আমার জীবনের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর ও আতঙ্কের একটি মুহূর্ত।"
তিনি আরও জানান, ভূমিকম্পটি যখন পূর্ণ শক্তিতে আঘাত হানছিল, তখন মাটির নিচ থেকে ঠিক একটি বিশালাকার বিমানের ইঞ্জিনের মতো কান ফাটানো ও বিকট শব্দ আসছিল। সেই চরম আতঙ্কের মধ্যেও তিনি তার পরিবারের সদস্যদের নিয়ে কোনোমতে ভবন থেকে নিরাপদে বাইরে বেরিয়ে আসতে সমর্থ হন।
কিন্তু বাইরে বেরিয়ে আসার পর তার চোখের সামনে ভেসে ওঠে আরেক বিভীষিকাময় দৃশ্য। তিনি দেখতে পান, তাদের আশপাশের অসংখ্য সুউচ্চ ভবন ততক্ষণে সম্পূর্ণ ধসে মাটিতে মিশে গেছে। নিজের পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পরপরই আলেজান্দ্রো তার বৃদ্ধা দাদিকে উদ্ধার করে আনতে ছুটে যান।
সেই সময়কার রাস্তার ধ্বংসযজ্ঞের দৃশ্যপট বর্ণনা করে তিনি বলেন, "যখন আমি আমার দাদিকে আনতে যাচ্ছিলাম, তখন দেখলাম আশপাশের পুরো আবাসিক এলাকাটি আক্ষরিক অর্থেই ইট-পাথরের এক বিশাল ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। চারপাশের এই ধ্বংসলীলা দেখে মনে হচ্ছিল এটি যেন কোনো যুদ্ধবিধ্বস্ত জনপদের দৃশ্য।
অসংখ্য বাড়ির দেওয়াল ভেঙে চুরমার হয়ে পড়ে আছে।" সবচেয়ে হৃদয়বিদারক বিষয়টি উল্লেখ করে তিনি বলেন, "আমি খুব স্পষ্টভাবে শুনতে পাচ্ছিলাম, যারা ওই বিশাল কংক্রিটের ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকা পড়েছেন, তারা কোনোমতে বের হওয়ার জন্য মরিয়া হয়ে চিৎকার করছেন এবং নানাভাবে শব্দ করে উদ্ধারকর্মীদের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করছেন।"
এই অসহায় মানুষগুলোর আর্তনাদ তাকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে। ধীরে ধীরে সময় গড়ানোর সাথে সাথে এই জোড়া ভূমিকম্পের ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত ও ভয়াবহ চিত্র মানুষের সামনে উন্মোচিত হতে শুরু করেছে।
চারদিকের ধ্বংসলীলা দেখে আলেজান্দ্রো অত্যন্ত হতাশা ও গভীর শোকের সাথে জানান, "ধ্বংসস্তূপের নতুন নতুন চিত্র ধীরে ধীরে আমাদের সামনে আসছে, আর এই নতুন দৃশ্যগুলো আগের চেয়ে আরও অনেক বেশি ভয়ঙ্কর ও অমানবিক।"
উদ্ধারকর্মীরা যতই গভীরে প্রবেশ করছেন, ক্ষয়ক্ষতি ও আটকে পড়া মানুষের সংখ্যা ততই বৃদ্ধি পাচ্ছে বলে প্রতীয়মান হচ্ছে। পুরো রাজধানী শহর জুড়ে এখন কেবলই অ্যাম্বুলেন্স আর উদ্ধারকারী দলের সাইরেনের শব্দ।
এই অবর্ণনীয় ট্র্যাজেডির কথা স্মরণ করে আলেজান্দ্রো তার বক্তব্যের শেষ পর্যায়ে বলেন, "সত্যি কথা বলতে, আজকের এই দিনটি আমাদের ভেনেজুয়েলাবাসীর জন্য অত্যন্ত ভয়ঙ্কর এবং বিভীষিকাময় একটি দিন। এটি নিঃসন্দেহে ভেনেজুয়েলার ইতিহাসের একটি কালো দিন হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে।
এমন ভয়াবহ দুর্যোগ ও ধ্বংসযজ্ঞের এই মর্মান্তিক স্মৃতিগুলো বেঁচে থাকা প্রতিটি মানুষের জীবনে চিরস্থায়ী এক ক্ষত হয়ে থাকবে।" বর্তমান পরিস্থিতিতে দেশটির সরকার ও আন্তর্জাতিক উদ্ধারকারী দলগুলো আটকে পড়া মানুষদের জীবিত উদ্ধারে আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে, তবে সময়ের সাথে সাথে ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়া মানুষদের বেঁচে থাকার সম্ভাবনা ক্রমশ ক্ষীণ হয়ে আসছে, যা উদ্ধারকারীদের জন্য এক বিশাল চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।