তিনি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছেন যে, কোনো ইউরোপীয় রাষ্ট্র যদি মার্কিন প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর আয়ের ওপর নতুন করে কোনো ধরনের ডিজিটাল কর বসানোর পদক্ষেপ গ্রহণ করে, তবে এর চরম প্রতিশোধ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রও পাল্টা ব্যবস্থা নেবে।
আর সেই ব্যবস্থার অংশ হিসেবে ওই নির্দিষ্ট দেশের উৎপাদিত এবং যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানিকৃত সব ধরনের পণ্যের ওপর সরাসরি ১০০ শতাংশ পর্যন্ত আমদানি শুল্ক আরোপ করা হবে। বৈশ্বিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে এমন আগ্রাসী অবস্থান আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে তীব্র উত্তেজনার সৃষ্টি করেছে।
নিজের প্রতিষ্ঠিত এবং বহুল ব্যবহৃত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম 'ট্রুথ সোশ্যাল'-এ দেওয়া এক দীর্ঘ ও কঠোর বার্তায় ডোনাল্ড ট্রাম্প এই বিষয়ে তার প্রশাসনের অনড় অবস্থানের কথা অত্যন্ত সুনির্দিষ্টভাবে তুলে ধরেন।
তিনি তার বার্তায় উল্লেখ করেন, ইউরোপের বেশ কয়েকটি দেশ বর্তমানে মার্কিন প্রযুক্তি খাতের শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর বিশেষ ধরনের ডিজিটাল সেবা কর আরোপ করার বিষয়ে নিজেদের মধ্যে আলাপ-আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে।
এমনকি তাদের মধ্যে কেউ কেউ এই কর ব্যবস্থা কার্যকর করার একেবারে চূড়ান্ত পর্যায়ে অবস্থান করছে। এসব দেশের এমন একপাক্ষিক সিদ্ধান্তের তীব্র সমালোচনা করে তিনি বলেন, আমেরিকান ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর অন্যায্যভাবে করের বোঝা চাপিয়ে দেওয়ার এই প্রচেষ্টা কোনোভাবেই বিনা জবাবে ছেড়ে দেওয়া হবে না।
যারা যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক স্বার্থ ক্ষুণ্ণ করার চেষ্টা করবে, তাদের এর চরম মূল্য চোকাতে হবে বলে তিনি দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। ট্রাম্প তার ওই পোস্টে ইউরোপীয় মিত্রদের প্রতি অত্যন্ত কঠোর ভাষায় সতর্কবার্তা উচ্চারণ করে স্পষ্ট করে বলেছেন যে, তার প্রশাসনের এই শাস্তিমূলক শুল্ক ব্যবস্থা নিছক কোনো ফাঁকা বুলি নয়, বরং এটি খুব শিগগিরই বাস্তবে প্রয়োগ করা হতে পারে।
তিনি আরও সতর্ক করে দিয়েছেন যে, যুক্তরাষ্ট্র যদি সত্যি সত্যিই এই ১০০ শতাংশ আমদানি শুল্ক কার্যকর করে, তবে তা কেবল ইউরোপীয় দেশগুলোর অর্থনীতিতেই ভয়াবহ ধস নামাবে না, বরং এর ফলে ওইসব দেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমানে যেসব গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যচুক্তি বা অর্থনৈতিক বোঝাপড়া বহাল রয়েছে, সেগুলোও সম্পূর্ণ অকার্যকর এবং অর্থহীন হয়ে পড়ার এক বিশাল ঝুঁকি তৈরি হবে।
এর মাধ্যমে মূলত তিনি একটি সম্ভাব্য ও ভয়াবহ বাণিজ্যযুদ্ধের দিকেই প্রচ্ছন্ন ইঙ্গিত দিয়েছেন, যা সমগ্র বিশ্বের অর্থনীতিকে একটি গভীর সংকটের মুখে ফেলে দিতে পারে। বিশেষ করে যেসব দেশ অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে নতুন এই ডিজিটাল কর আরোপের পথে অগ্রসর হচ্ছে, তাদের সরাসরি লক্ষ্য করেই ডোনাল্ড ট্রাম্প এই চূড়ান্ত সতর্কবার্তা প্রদান করেছেন।
আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে এটি একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল ইস্যু। মূলত বৃহৎ মার্কিন প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো ইউরোপের বাজার থেকে বিপুল পরিমাণ মুনাফা অর্জন করলেও সেখানে আনুপাতিক হারে খুব একটা কর প্রদান করে না-এমন অভিযোগ ইউরোপীয় দেশগুলোর দীর্ঘদিনের।
সেই ক্ষোভ থেকেই তারা এই ডিজিটাল সেবা কর আরোপের উদ্যোগ নিয়েছে। কিন্তু ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই সাম্প্রতিক হুমকির পর ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলোকে এখন তাদের অর্থনৈতিক নীতি নিয়ে নতুন করে হিসাব-নিকাশ করতে হবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
তবে ট্রাম্পের এই কঠোর হুমকির পর যুক্তরাজ্যের ক্ষেত্রে এর প্রকৃত প্রভাব ঠিক কী ধরনের হতে পারে, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে একধরনের অস্পষ্টতা ও বড়সড় প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। কারণ, যুক্তরাজ্য ২০২০ সাল থেকেই তাদের দেশে ব্যবসা করা বৃহৎ মার্কিন প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর এ ধরনের ডিজিটাল সেবা কর অত্যন্ত সফলতার সঙ্গে আরোপ করে রেখেছে।
এখন ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই নতুন করে দেওয়া ১০০ শতাংশ শুল্ক আরোপের হুমকি কি কেবল নতুন কর আরোপকারী দেশগুলোর ওপরই বর্তাবে, নাকি যুক্তরাজ্যের মতো আগে থেকেই কর আদায়কারী দেশগুলোও এই শাস্তিমূলক ব্যবস্থার আওতায় পড়বে, সে বিষয়টি এখনো যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে পুরোপুরি পরিষ্কার করা হয়নি।
পরিশেষে, নিজের সামাজিক মাধ্যমের বার্তায় ডোনাল্ড ট্রাম্প অত্যন্ত দ্ব্যর্থহীন ভাষায় উপসংহার টেনে বলেছেন, তার এই বক্তব্যকে কেবল একটি সাধারণ মন্তব্য হিসেবে দেখলে ভুল হবে, বরং এটি একটি চূড়ান্ত এবং পরিষ্কার সতর্কবার্তা হিসেবেই সংশ্লিষ্ট দেশগুলোকে গ্রহণ করতে হবে।
যে বা যেসব দেশ যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর এ ধরনের কোনো বৈষম্যমূলক কর আরোপের দুঃসাহস দেখাবে, যুক্তরাষ্ট্রে পাঠানো তাদের সমস্ত রপ্তানিকৃত পণ্যের ওপর অবিলম্বে এবং তাৎক্ষণিকভাবে ১০০ শতাংশ শাস্তিমূলক শুল্ক আরোপ করা হবে। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি তাদের এক বিশেষ প্রতিবেদনে ট্রাম্পের এই অনড় অবস্থানের কথা প্রকাশ করেছে, যা বিশ্বজুড়ে এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।