কংক্রিটের বিশাল স্তূপের নিচে চাপা পড়েও টানা ৩৬ ঘণ্টা নিজের ছোট ভাইকে পরম মমতায় আগলে রেখেছে মাত্র সাত বছর বয়সি এক কন্যাশিশু। হাড়কাঁপানো শীত, ঘুটঘুটে অন্ধকার এবং মৃত্যুর ভয়াল থাবাকে উপেক্ষা করে সে যেভাবে নিজের জীবনের চেয়েও ছোট ভাইয়ের সুরক্ষাকে অগ্রাধিকার দিয়েছে, তা সমগ্র বিশ্বের বিবেককে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে।
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, সিরিয়ার হারেম শহরের অদূরে অবস্থিত বেসনায়া-বসেনেহর নামের একটি ছোট্ট ও শান্ত গ্রামে এই অভাবনীয় ঘটনাটি ঘটেছে। গত সোমবার ভোররাতে যখন ভয়াবহ এই ভূমিকম্প আঘাত হানে, তখন অন্যান্য সাধারণ পরিবারের মতোই এই শিশুটির পরিবারও গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন ছিল।
প্রতিদিনের মতোই সাত বছরের ছোট্ট মেয়ে মরিয়ম তার আদরের ছোট ভাই ইলাফকে বুকে জড়িয়ে পরম নিশ্চিন্তে ঘুমিয়েছিল। কিন্তু ভোরের আলো ফোটার আগেই তাদের জীবনে নেমে আসে এক অবর্ণনীয় অন্ধকার।
আচমকা শুরু হওয়া তীব্র ভূকম্পনে চোখের পলকেই তাদের বহুতল বসতবাড়িটি সম্পূর্ণ ধসে পড়ে এবং তাদের সাজানো সংসার পরিণত হয় কংক্রিটের এক বিশাল ধ্বংসস্তূপে। নরম ও তুলতুলে বিছানা থেকে এক মুহূর্তের ব্যবধানে তারা ছিটকে পড়ে ইট, পাথর আর রডের ভয়াল খাঁচার ভেতর।
মাথার ঠিক ওপরটাই আটকে থাকে বিশাল কংক্রিটের ভারী ছাদ। ডানে, বাঁয়ে, সামনে কিংবা পেছনে-সবখানেই যেন মৃত্যুদূতের মতো চেপে বসেছে ভবনের টুকরো টুকরো ভারী দেয়াল। এমন এক ভয়াবহ, দমবন্ধ করা ও শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতিতে যেকোনো প্রাপ্তবয়স্ক ও মানসিকভাবে শক্তিশালী মানুষের পক্ষেই স্থির থাকা প্রায় অসম্ভব।
কিন্তু অবাক করার বিষয় হলো, মাত্র সাত বছর বয়সি শিশু মরিয়ম সেই ভয়াবহতার মাঝেও নিজের মানসিক দৃঢ়তা হারায়নি। চারপাশের এই মৃত্যুপুরীর মাঝেও নিজের ছোট ভাইকে পরম মমতায় নিজের শরীরের নিচে আগলে রাখে সে।
ঘুটঘুটে অন্ধকারে যখন মৃত্যু শিয়রে দাঁড়িয়ে, প্রচণ্ড ভয়ে গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে আসছে এবং কনকনে শীতে ঠোঁট তিরতির করে কাঁপছে, তখনও বড় বোনের দায়িত্ব পালন করতে একটুও ভোলেনি ছোট্ট মরিয়ম।
নিজের পিঠের ওপর চেপে বসা ভারী দেয়ালের নির্মম আঘাত সহ্য করেও সে এটি নিশ্চিত করেছে যেন তার আদরের ভাইয়ের শরীরে কোনোভাবেই কোনো আঘাত না লাগে। অন্ধকার সেই কংক্রিটের কবরের নিচেই দরদি পরশে বারবার ভাইয়ের চুলে আঙুল বুলিয়ে তাকে শান্ত রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করে গেছে সে।
তার এই কোমল স্পর্শ যেন নিঃশব্দে বলে দিচ্ছিল, ‘ভয় নেই ভাই, আমি তো আছি।’ বাবা-মা কোথায় আছেন, তারা আদৌ বেঁচে আছেন কি না, কিংবা কেউ তাদের বাঁচাতে এই ধ্বংসস্তূপের কাছে আসবে কি না-এসব অজানা শঙ্কার মাঝেই টানা ৩৬ ঘণ্টা জীবনযুদ্ধে টিকে ছিল এই দুই অবুঝ শিশু।
অবশেষে দীর্ঘ ও যন্ত্রণাদায়ক প্রতীক্ষার পর ধ্বংসস্তূপের ওপর থেকে উদ্ধারকারীদের ক্ষীণ কথোপকথনের আওয়াজ ভেসে আসে নিচে। জীবনের আলো দেখতে পেয়ে নিজের শেষ শারীরিক শক্তিটুকু জড়ো করে সাহায্যের আশায় আর্তনাদ করে ওঠে মরিয়ম।
ধুলোবালিতে মাখা শুকনো ও খসখসে গলায় সে চিৎকার করে বলে ওঠে, “স্যার, আমাকে এখান থেকে বের করুন। আমাকে বাঁচান। আপনি যা বলবেন, আমি তাই করব। সারাজীবন আমি আপনার গোলাম হয়ে থাকব।”
ছোট্ট ও অবুঝ একটি শিশুর মুখ থেকে এমন করুণ, অসহায় ও হৃদয়বিদারক আর্তনাদ শুনে মুহূর্তের জন্য থমকে যান উদ্ধারকর্মীরাও। এই একটি আকুতি যেন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের হৃদয়কে ছিন্নভিন্ন করে দেয়।
পরবর্তীতে এই ঘটনার একটি ভিডিও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ও বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে তা মুহূর্তের মধ্যেই বিশ্বজুড়ে ভাইরাল হয়ে যায়। বিশ্বের লাখো-কোটি মানুষ এই দৃশ্য দেখে চোখের পানি ধরে রাখতে পারেননি।
‘বিপদে বড় বোন মায়ের সমতুল্য হয়’-যুগ যুগ ধরে সমাজে প্রচলিত এই অমূল্য বাণীর এক জলজ্যান্ত প্রতিচ্ছবি যেন সারা বিশ্ব দেখতে পেয়েছে ছোট্ট মরিয়মের আত্মত্যাগের মাঝে। নিজের বয়স মাত্র সাত হলেও সে যে সাহসিকতা, পরিপক্বতা ও দায়িত্ববোধের বিরল পরিচয় দিয়েছে, তা সত্যিই প্রশংসনীয়।
মরিয়মের সেই আকুতি শোনার পর উদ্ধারকারী দল অত্যন্ত সতর্কতা ও পেশাদারিত্বের সঙ্গে তাদের উদ্ধার তৎপরতা শুরু করে। দীর্ঘ প্রচেষ্টার পর অবশেষে কংক্রিটের স্ল্যাব সরিয়ে নিরাপদে বের করে আনা হয় দুই শিশু মরিয়ম ও ইলাফকে।
শুধু তা-ই নয়, পরবর্তীতে তাদের পরিবারের অন্যান্য সদস্যকেও জীবিত অবস্থায় উদ্ধার করতে সক্ষম হন উদ্ধারকর্মীরা। উদ্ধার পাওয়ার পর শিশু দুটির বাবা মোস্তফা জহির আল সাঈদ এই ভয়াবহ অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন।
তিনি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমকে জানান, সোমবার ভোরে ভূমিকম্প আঘাত হানার ঠিক আগমুহূর্তেও তিনি তার স্ত্রী ও সন্তানদের নিয়ে নিশ্চিন্তে ঘুমাচ্ছিলেন। হঠাৎ তিনি অনুভব করেন যে মাটি প্রচণ্ড শক্তিতে কাঁপছে এবং চোখের নিমিষেই তাদের ভবনের ছাদ মাথার ওপর ভেঙে পড়ছে।
এরপর দীর্ঘ দুই দিন ধরে তারা সম্পূর্ণ ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে ছিলেন, যেখানে প্রতিটি মুহূর্ত কেটেছে চরম উৎকণ্ঠা ও মৃত্যুভয়ে। এই ঘটনাটি কেবল একটি প্রলয়ংকরী প্রাকৃতিক দুর্যোগের ভয়াবহতাকেই তুলে ধরে না, বরং এটি প্রমাণ করে যে মানুষের বেঁচে থাকার অদম্য ইচ্ছা এবং পারিবারিক অটুট বন্ধন যেকোনো প্রতিকূলতাকে জয় করতে পারে।
ছোট্ট মরিয়মের অসীম সাহসিকতা ও শর্তহীন ভালোবাসা সিরিয়ার এই ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞের মাঝেও মানবতার এক উজ্জ্বল আলোকবর্তিকা হয়ে বিশ্ববাসীর মনে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।