মঙ্গলবার, জুন ৩০, ২০২৬
১৬ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

দেশে ফিরতে বাধা দিচ্ছে ভেনেজুয়েলা সরকার, মাচাদো

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ৩০ জুন, ২০২৬, ০৭:৩২ পিএম

দেশে ফিরতে বাধা দিচ্ছে ভেনেজুয়েলা সরকার, মাচাদো
ছবি: সংগৃহীত

সাম্প্রতিক এক ভয়াবহ ও প্রলয়ঙ্করী জোড়া ভূমিকম্পের আঘাতে সম্পূর্ণরূপে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে দক্ষিণ আমেরিকার রাষ্ট্র ভেনেজুয়েলা। এই অপ্রত্যাশিত ও ভয়ংকর প্রাকৃতিক দুর্যোগে দেশটিতে এখন পর্যন্ত এক হাজার সাতশরও বেশি নিরীহ মানুষের মর্মান্তিক প্রাণহানি ঘটেছে।

 

ধ্বংসস্তূপের নিচে এখনো অনেকেই চাপা পড়ে আছেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে, যার ফলে উদ্ধারকাজ যত গড়াচ্ছে, লাশের সারি ততই দীর্ঘ হচ্ছে। দেশের এমন এক চরম সংকটময়, হৃদয়বিদারক ও শোকাবহ পরিস্থিতিতে দেশবাসীর পাশে দাঁড়াতে নিজ মাতৃভূমিতে ফিরে আসতে চাইছেন ভেনেজুয়েলার প্রখ্যাত বিরোধীদলীয় নেত্রী এবং নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী রাজনীতিক মারিয়া কোরিনা মাচাদো।

 

তবে তার গুরুতর অভিযোগ, ভেনেজুয়েলার বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার সম্পূর্ণ উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে তাকে দেশে প্রবেশে বাধা প্রদান করছে। সোমবার মধ্য আমেরিকার দেশ পানামা থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) প্রকাশিত এক আবেগঘন ভিডিও বার্তায় তিনি এই চাঞ্চল্যকর অভিযোগ উত্থাপন করেন।

 

প্রকাশিত ওই ভিডিও বার্তায় মাচাদো অত্যন্ত দৃঢ় ও আবেগপূর্ণ কণ্ঠে বিশ্ববাসীকে জানান, ভেনেজুয়েলার সাধারণ মানুষের এই চরম দুর্দশা ও শোকাবহ সময়ে তাদের পাশে থাকা তার নৈতিক দায়িত্ব এবং তিনি যেকোনো মূল্যে দেশে ফিরতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।

 

কিন্তু তাকে দেশে ফিরতে না দেওয়ার জন্য সরকার অত্যন্ত সুকৌশলে দেশের বাণিজ্যিক আকাশসীমা বন্ধ করে দেওয়ার মতো হঠকারী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিল। তিনি অভিযোগ করেন, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ও মানবাধিকার সংস্থাগুলোর তীব্র সমালোচনার মুখে বর্তমান প্রশাসন তাদের সেই আকাশসীমা বন্ধের সিদ্ধান্ত থেকে সাময়িকভাবে সরে আসতে বাধ্য হয়েছে।

 

কিন্তু তাতেও তার দেশে ফেরার পথ সুগম হয়নি। কারণ, দেশে ফেরার এই প্রক্রিয়াকে যারা সহজ করতে চাইছেন বা তাকে যৌক্তিক সহযোগিতা প্রদান করছেন, তাদের প্রতিনিয়ত নানাভাবে হুমকি, ভয়ভীতি ও হয়রানি করা হচ্ছে। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠনের কারিগর হিসেবে তার এই অভিযোগ আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে।

 

প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে ভেনেজুয়েলার যোগাযোগ ও পরিবহন ব্যবস্থা এমনিতেই এক চরম বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে। গত সপ্তাহের ওই ভয়াবহ জোড়া ভূমিকম্পে ভেনেজুয়েলার অন্যান্য স্থাপনার পাশাপাশি বিমানবন্দরগুলোরও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।

 

বিশেষ করে, রাজধানী কারাকাসের প্রধান প্রবেশদ্বার হিসেবে পরিচিত মাইকেতিয়া আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরটি ভূমিকম্পের প্রবল তীব্রতায় মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ এতটাই বেশি ছিল যে, কর্তৃপক্ষ বাধ্য হয়ে এটি সম্পূর্ণ বন্ধ ঘোষণা করেছিল।

 

তবে বর্তমানে আন্তর্জাতিক বিশ্ব থেকে আসা জরুরি মানবিক সহায়তা, ওষুধ ও ত্রাণবাহী ফ্লাইটগুলো পরিচালনার স্বার্থে বিমানবন্দরটি অত্যন্ত সীমিত পরিসরে ও আংশিকভাবে পুনরায় চালু করা হয়েছে।

 

অন্যদিকে, দেশের মধ্যাঞ্চলীয় শহর ভ্যালেন্সিয়া এবং পূর্বাঞ্চলীয় শহর মারাকাইবোর আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরগুলো তুলনামূলক কম ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় সেগুলো দিয়ে বর্তমানে সীমিত আকারে আন্তর্জাতিক ফ্লাইট চলাচল অব্যাহত রয়েছে।

 

তা সত্ত্বেও, সরকারি অসহযোগিতার কারণে মাচাদোর দেশে ফেরার বিষয়টি এখনো গভীর অনিশ্চয়তার চাদরে ঢাকা পড়ে আছে। ভেনেজুয়েলার বর্তমান এই গভীর মানবিক সংকটের পাশাপাশি দেশটির রাজনৈতিক পরিস্থিতিও বিগত বেশ কয়েক মাস ধরে অত্যন্ত টালমাটাল ও অস্থিতিশীল।

 

মাত্র ছয় মাস আগে এক অভাবনীয় ও নাটকীয় ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর পরিচালিত এক আকস্মিক ও গোপন শ্বাসরুদ্ধকর অভিযানে দেশটির দীর্ঘকালীন শাসক ও সাবেক প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো আটক হন। ওই ঘটনার পর ভেনেজুয়েলার রাজনীতিতে এক বিশাল শূন্যতা ও অস্থিরতার সৃষ্টি হয়।

 

এরপর থেকেই মূলত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাপক রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক চাপের মুখে দেশটির অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট হিসেবে সরকার পরিচালনার কঠিন দায়িত্ব পালন করছেন মাদুরো আমলের ভাইস প্রেসিডেন্ট ডেলসি রড্রিগেজ।

 

ওয়াশিংটনের কড়া নজরদারির মধ্যে রড্রিগেজ প্রশাসন দেশটিকে স্থিতিশীল রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করলেও বিরোধী দলের সঙ্গে তাদের দূরত্বের কোনো উন্নতি হয়নি। দেশটির বর্তমান রাজনৈতিক সংকটের বীজ মূলত রোপিত হয়েছিল ২০২৪ সালের বিতর্কিত প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের সময়।

 

সেই নির্বাচনে মারিয়া কোরিনা মাচাদোর নেতৃত্বাধীন শক্তিশালী বিরোধী জোট তাদের মনোনীত প্রার্থী এদমুন্দো গঞ্জালেস উরুতিয়ার বিপুল ভোটের ব্যবধানে বিজয়ের জোরালো দাবি করেছিল। কিন্তু সেই সময় দেশি-বিদেশি পর্যবেক্ষকদের সমস্ত জালিয়াতির অভিযোগ ও সাধারণ জনগণের রায়কে সম্পূর্ণভাবে পদদলিত করে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো নিজেকে একতরফাভাবে পুনর্নির্বাচিত ঘোষণা করেছিলেন।

 

মাদুরোর এই স্বৈরতান্ত্রিক সিদ্ধান্তের পর দেশটিতে ব্যাপক গণবিক্ষোভ ও রাজনৈতিক অস্থিরতার সূত্রপাত হয় এবং সরকার বিরোধীদের ওপর ব্যাপক দমন-পীড়ন শুরু করে। সরকারের সেই লাগাতার রাজনৈতিক নিপীড়ন ও প্রাণনাশের হুমকির মুখে গত ডিসেম্বরে একপ্রকার বাধ্য হয়েই নিজের মাতৃভূমি ছাড়েন মারিয়া কোরিনা মাচাদো।

 

এরপর থেকে তিনি পানামাসহ বিভিন্ন দেশে নির্বাসিত জীবনযাপন শুরু করেন। তবে দেশের গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার ও মানবাধিকার রক্ষায় তার অসামান্য, অক্লান্ত ও সাহসী অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় তার পাশে দাঁড়ায়।

 

নরওয়ের রাজধানী অসলোতে এক আড়ম্বরপূর্ণ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে তাকে মর্যাদাপূর্ণ নোবেল শান্তি পুরস্কারে ভূষিত করা হয়, যা তার রাজনৈতিক সংগ্রামকে বৈশ্বিক বৈধতা প্রদান করে। সর্বশেষ গত মে মাসে পানামা থেকে দেওয়া এক আনুষ্ঠানিক ঘোষণায় মাচাদো অত্যন্ত স্পষ্টভাবে জানিয়েছিলেন যে, ভেনেজুয়েলার বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সঙ্গে একটি সুষ্ঠু, অবাধ ও গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে ক্ষমতা হস্তান্তরের বিষয়ে অর্থবহ আলোচনা করতে তিনি পুরোপুরি প্রস্তুত।

 

তবে ডেলসি রড্রিগেজের নেতৃত্বাধীন বর্তমান প্রশাসন এখন পর্যন্ত মাচাদোর সেই আহ্বানের কোনো আনুষ্ঠানিক বা সন্তোষজনক জবাব দেয়নি। বর্তমান ভূমিকম্পের ভয়াবহতা, হাজারো মানুষের মৃত্যু এবং ত্রাণের হাহাকারের মাঝে মাচাদোর এই নতুন অভিযোগ ভেনেজুয়েলার চলমান রাজনৈতিক ও মানবিক সংকটকে আরও বেশি ঘনীভূত করেছে। দেশবাসীর এই দুর্দিনে একজন নোবেলজয়ী নেত্রীকে দেশে প্রবেশে বাধা প্রদানের ঘটনা আন্তর্জাতিক বিশ্বে ভেনেজুয়েলার ভাবমূর্তিকে নতুন করে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।

 

- বাসস