সোমবার, জুন ২৯, ২০২৬
১৫ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ট্রাম্পকে দুর্নীতিগ্রস্ত ও অযোগ্য আখ্যা দিলেন জো বাইডেন

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৯ জুন, ২০২৬, ০২:১১ পিএম

ট্রাম্পকে দুর্নীতিগ্রস্ত ও অযোগ্য আখ্যা দিলেন জো বাইডেন
ছবি: Collected

যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান রাজনৈতিক অঙ্গনে আবারও উত্তেজনাপূর্ণ বাক্যবিনিময় ও তীব্র সমালোচনার ঝড় উঠেছে। আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে আক্রমণাত্মক বক্তব্য প্রদানের মাত্রা ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে।

 

এরই ধারাবাহিকতায় যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন বর্তমান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিরুদ্ধে অত্যন্ত কঠোর ও তীক্ষ্ণ ভাষায় সমালোচনা করেছেন। তিনি বর্তমান প্রেসিডেন্টকে একজন ‘পরাজিত মানুষ’ হিসেবে আখ্যায়িত করার পাশাপাশি তাকে চরম মাত্রায় অযোগ্য ও দুর্নীতিগ্রস্ত একজন রাষ্ট্রনেতা হিসেবে জনসমক্ষে তুলে ধরেছেন।

 

আগামী নির্বাচনকে ঘিরে ডেমোক্র্যাট শিবিরের এই আক্রমণাত্মক অবস্থান মার্কিন রাজনীতিতে নতুন মেরুকরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন। শনিবার যুক্তরাষ্ট্রের মেরিল্যান্ড অঙ্গরাজ্যের হ্যানোভার শহরে ডেমোক্রেটিক পার্টির উদ্যোগে একটি বিশেষ নৈশভোজের আয়োজন করা হয়।

 

মূলত আগামী নভেম্বরে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মধ্যবর্তী নির্বাচনে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ রিপাবলিকান পার্টির হাত থেকে পুনরুদ্ধারের সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য ও কৌশল নির্ধারণ করতেই এই দলীয় সমাবেশের আয়োজন করা হয়েছিল।

 

দলের তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মী এবং শীর্ষ নেতাদের মধ্যে নতুন করে প্রাণসঞ্চার করার উদ্দেশ্যে জো বাইডেন এই মঞ্চকে সুকৌশলে কাজে লাগান। এই অনুষ্ঠানে প্রধান বক্তা হিসেবে উপস্থিত হয়ে সাবেক প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন প্রায় দশ মিনিটের একটি সংক্ষিপ্ত অথচ অত্যন্ত আক্রমণাত্মক বক্তৃতা প্রদান করেন।

 

নিজের বক্তব্যের একটি বড় অংশ জুড়ে তিনি রাজধানী ওয়াশিংটন ডিসিতে বর্তমান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের গৃহীত বিভিন্ন বিতর্কিত প্রকল্প ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের কঠোর সমালোচনা করেন। সাবেক প্রেসিডেন্ট বাইডেন তার বক্তব্যে বর্তমান প্রশাসনের আত্মপ্রদর্শনের প্রবণতার বিভিন্ন সুনির্দিষ্ট উদাহরণ তুলে ধরেন।

 

তিনি অভিযোগ করেন যে, ট্রাম্প নিজের ব্যক্তিস্বার্থ ও আত্মতুষ্টির জন্য রাষ্ট্রীয় কোষাগারের অর্থ যথেচ্ছভাবে ব্যয় করছেন। হোয়াইট হাউসের ঐতিহ্যবাহী ইস্ট উইং ভেঙে সেখানে একটি বিলাসবহুল বলরুম নির্মাণের উদ্যোগ, জন এফ কেনেডি পারফর্মিং আর্টস সেন্টারের ভবনের নামের সঙ্গে জোরপূর্বক নিজের নাম যুক্ত করার প্রয়াস এবং শুধুমাত্র নিজের সম্মানার্থে একটি বিশালাকার বিজয়তোরণ নির্মাণের পরিকল্পনাকে তিনি ট্রাম্পের চরম আত্মমুগ্ধতা হিসেবে বর্ণনা করেন।

 

বাইডেন বিশেষভাবে উল্লেখ করেন যে, এক কোটি সাতচল্লিশ লাখ ডলারের মতো বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করে একটি বড় ধরনের সংস্কার প্রকল্প গ্রহণ করার পরও ঐতিহাসিক লিংকন মেমোরিয়ালের প্রতিফলন পুকুরে ব্যাপকভাবে শৈবালের বিস্তার ঘটেছে, যা বর্তমান প্রশাসনের প্রশাসনিক ব্যর্থতার একটি অন্যতম জ্বলন্ত প্রমাণ।

 

যুক্তরাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক ইতিহাসে সবচেয়ে বড় আঘাত হিসেবে বিবেচিত ২০২১ সালের ৬ জানুয়ারির ক্যাপিটল ভবনে হামলায় জড়িতদের প্রতি ট্রাম্পের সহানুভূতিশীল আচরণেরও তীব্র নিন্দা জানান বাইডেন।

 

ওই হামলায় দোষী সাব্যস্ত হওয়া ব্যক্তিদের রাষ্ট্রীয়ভাবে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার জন্য বর্তমান ট্রাম্প প্রশাসন যে অপপ্রয়াস চালাচ্ছে, বাইডেন সেটিকে আইনের শাসনের পরিপন্থী বলে মন্তব্য করেন। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন যে, ক্যাপিটল হামলায় দণ্ডিত ওই অপরাধীদের প্রেসিডেন্ট হিসেবে ট্রাম্প স্বপ্রণোদিত হয়ে ক্ষমা ঘোষণা করেছিলেন।

 

এসব নজিরবিহীন প্রসঙ্গের অবতারণা করে জো বাইডেন চরম ক্ষোভের সঙ্গে বলেন, "বাহ! কী ভয়ংকর পরাজিত মানুষ! বিশেষ করে প্রতিফলন পুকুরের সংস্কার প্রকল্পটি এই প্রশাসনের আত্মমুগ্ধতা ও অযোগ্যতার চেয়েও বড় একটি বিষয়কে সবার সামনে উন্মোচিত করেছে।"

 

বাইডেনের মতে, বর্তমান মার্কিন প্রশাসনের এই চরম অযোগ্যতা আরও গভীর ও ভয়ংকর একটি সত্যকে প্রতিফলিত করে, আর তা হলো রাষ্ট্রজুড়ে ছড়িয়ে পড়া লাগামহীন দুর্নীতি। তিনি এই অবস্থাকে ‘প্রকাশ্য ও বেপরোয়া দুর্নীতি’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে দাবি করেন যে, যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে কোনো প্রশাসনে এমন নজিরবিহীন ও এত বড় মাত্রার দুর্নীতি এর আগে কখনোই দেখা যায়নি।

 

রাষ্ট্রযন্ত্রকে ব্যক্তিগত স্বার্থসিদ্ধির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করার এই অনৈতিক প্রবণতা আমেরিকার সুদৃঢ় গণতান্ত্রিক ভিত্তিকে অত্যন্ত দুর্বল করে দিচ্ছে বলে তিনি সতর্ক করেন। অভ্যন্তরীণ রাজনীতির পাশাপাশি মার্কিন পররাষ্ট্রনীতি নিয়েও ডোনাল্ড ট্রাম্পকে একহাত নেন জো বাইডেন।

 

বিশেষ করে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিতর্কিত সম্পর্ক নিয়ে তিনি তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেন। বাইডেন সুনির্দিষ্টভাবে অভিযোগ করেন যে, ট্রাম্প পরিকল্পিতভাবে পশ্চিমা সামরিক জোট ন্যাটোকে দুর্বল ও ধ্বংস করার বিপজ্জনক পথে অগ্রসর হয়েছেন।

 

তিনি আরও দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ মদদে এবং ইসরায়েলের অংশগ্রহণে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারির শেষের দিকে ইরানের বিরুদ্ধে যে যুদ্ধ পরিস্থিতি তৈরি করা হয়েছিল, তার ফলে ন্যাটো জোটের ভেতরে বিভক্তি বেড়েছে এবং জোটটি আরও বড় ধরনের চাপের মুখে পড়েছে।

 

বক্তৃতার একেবারে শেষ পর্যায়ে জো বাইডেন অত্যন্ত আক্ষেপের সঙ্গে উল্লেখ করেন যে, ডোনাল্ড ট্রাম্প তার আগ্রাসী নীতির কারণে বিশ্বমঞ্চে যুক্তরাষ্ট্রের সম্মান ও মর্যাদাকে এমন এক তলানিতে নিয়ে গেছেন, যা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে অন্য কোনো প্রেসিডেন্টের আমলে এতটা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি। যুক্তরাজ্যের প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের এক বিস্তৃত প্রতিবেদনে মার্কিন রাজনীতির এই সর্বশেষ উত্তেজনাকর পরিস্থিতির বিবরণ নিবিড়ভাবে তুলে ধরা হয়েছে।

 

- দ্য গার্ডিয়ান