গত বুধবার রিখটার স্কেলে যথাক্রমে ৭.২ ও ৭.৫ মাত্রার দুটি শক্তিশালী ভূমিকম্পে লণ্ডভণ্ড হয়ে যাওয়া দেশটিতে এখন পর্যন্ত প্রায় দুই হাজার মানুষের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত হওয়া গেছে। তবে উদ্ধারকারীরা আশঙ্কা করছেন, সময়ের সাথে সাথে হতাহতের এই সংখ্যা আরও অনেক বাড়তে পারে।
ধ্বংসস্তূপের গহিন অন্ধকারে আটকা পড়েও অদম্য মানসিক শক্তি ও দৃঢ় ইচ্ছার জোরে মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আসা আন্দ্রেয়া বার্তা সংস্থা এএফপিকে তার অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিয়েছেন। তিনি জানান, মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়েও তিনি কখনো আশা হারাননি।
ধ্বংসস্তূপের প্রায় ছয় মিটার নিচে আটকা পড়া আন্দ্রেয়া দীর্ঘ ৪৮ ঘণ্টা চরম প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও ধৈর্য ধরে নিজেকে শান্ত রাখার চেষ্টা চালিয়ে গেছেন। আন্দ্রেয়া জানান, সেই বিভীষিকাময় সময়ে তিনি নিজেকে কেবল একটি কথাই বলছিলেন যে, তাকে শান্ত থাকতে হবে এবং উদ্বিগ্ন হওয়া চলবে না।
তার সাথে থাকা মোবাইল ফোনটি তাকে সময় বুঝতে ও সামান্য আলো পেতে সাহায্য করেছিল। তার চেয়ে কিছুটা ওপরে আটকা পড়া অন্য আরেকজন ব্যক্তির সাথে তিনি যোগাযোগ করতে সক্ষম হন। উদ্ধার হওয়ার পর সেই ব্যক্তি উদ্ধারকর্মীদের জানান যে, নিচে আরও একজন জীবিত মানুষ রয়েছেন।
আন্দ্রেয়া জানান, তার ওপরে একটি ফাঁকা জায়গা ছিল, যেটি ব্যবহার করে তিনি কিছুটা ওপরে উঠতে পেরেছিলেন। এরপর উদ্ধারকারীরা যে পথ তৈরি করছিলেন, সেখানে পৌঁছে তিনি ধীরে ধীরে ওপরের দিকে উঠে আসেন এবং তাদের সহায়তায় আলোর মুখ দেখেন।
তবে এই অসীম বেঁচে ফেরার গল্পের মধ্যেও রয়েছে বিষাদ। আন্দ্রেয়া তার পরিবারের সদস্য-২০ বছর বয়সি ভাই এবং ৯১ বছর বয়সি ফুফুকে এখনো খুঁজে পাননি। স্থানীয় কর্তৃপক্ষ তার সেই ভবনটিকে পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন ঘোষণা করলেও, প্রিয়জনদের ফিরে পাওয়ার অপেক্ষায় আছেন তিনি।
এদিকে ধ্বংসস্তূপের নিচে জীবিতদের সন্ধানে লা গুইরায় নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন ২৬ বছর বয়সি সাবেক খনিশ্রমিক মোইসেস ফারামায়া। ‘দ্য মোল’ নামে পরিচিত এই সাহসী তরুণ এখন পর্যন্ত ১৬ জনকে জীবিত এবং ২২টি লাশ উদ্ধার করেছেন।
এল কায়াও অঞ্চলের খনিতে দীর্ঘ ছয় বছর কাজ করার অভিজ্ঞতা তাকে ধ্বংসস্তূপ থেকে মানুষ উদ্ধারে দক্ষ করে তুলেছে, যার ফলে দমকল বাহিনী ও বিশেষজ্ঞ দলগুলোও তার সহায়তা নিচ্ছে। কোনো আধুনিক যন্ত্রপাতি ছাড়াই শুধু একটি গাঁইতি ও কোদাল ব্যবহার করে তিনি উদ্ধারকাজ চালিয়ে যাচ্ছেন।
পচনশীল লাশের তীব্র গন্ধ আর ধুলোবালির মধ্যে না ঘুমিয়ে ও না খেয়ে তিনি একের পর এক জীবন বাঁচানোর চেষ্টা করে যাচ্ছেন। তিনি জানান, দেয়াল থেকে আসা আঁচড়ানোর শব্দ শুনেই তিনি আটকে পড়া মানুষদের শনাক্ত করতে সক্ষম হন।
অন্যদিকে, দুর্যোগ কবলিত এলাকায় উদ্ধার অভিযান ঘিরে তৈরি হয়েছে চরম অনিশ্চয়তা। আন্দ্রেয়ার ভবনে কোনো জীবিত ব্যক্তি নেই-কর্মকর্তাদের এমন ঘোষণার পরও স্প্যানিশ অনুসন্ধানকারী দলের কুকুর এবং মার্কিন উদ্ধারকারী দলের প্রযুক্তি জীবিত মানুষের উপস্থিতির ইঙ্গিত পাওয়ার পর নতুন করে আশা জেগেছে অনেকের মনে।
রেস্তোরাঁ কর্মী আলেকজান্ডার গার্সিয়া, যার মা উদ্ধার পাওয়ার পর মারা গেছেন, তিনি এখনো ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে থাকা তার দুই ভাইয়ের জীবিত ফেরার প্রহর গুনছেন। কিন্তু উদ্ধারকারীদের জন্য সময় এখন বড় প্রতিপক্ষ। সোমবার রাতে টর্চের আলোয় উদ্ধারকাজ অব্যাহত থাকলেও মঙ্গলবার সকালের ভারী বৃষ্টিপাত অভিযানকে বাধাগ্রস্ত করেছে।
বিশেষজ্ঞ ও উদ্ধারকর্মীদের মতে, ভূমিকম্পের পর জীবিত উদ্ধারের জন্য যে ৭২ ঘণ্টার ‘গোল্ডেন আওয়ার’ বা গুরুত্বপূর্ণ সময়সীমা নির্ধারিত থাকে, তা শনিবার সন্ধ্যায়ই শেষ হয়ে গেছে। ফলে এখন জীবিত কাউকে উদ্ধারের আশা অত্যন্ত ক্ষীণ হয়ে পড়েছে, যা পুরো উদ্ধারকারী দল ও শোকার্ত স্বজনদের মনোবলকে চরম সংকটের মুখে ঠেলে দিয়েছে।