বৃহস্পতিবার, জুলাই ২, ২০২৬
১৮ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

'কাতারের দেওয়া এমন উড়োজাহাজ যুক্তরাষ্ট্র তৈরি করতে পারত না'- ট্রাম্প

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ০২ জুলাই, ২০২৬, ০১:২৫ পিএম

'কাতারের দেওয়া এমন উড়োজাহাজ যুক্তরাষ্ট্র তৈরি করতে পারত না'- ট্রাম্প
ছবি : Collected

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম মিত্র দেশ কাতারের সরকারের পক্ষ থেকে উপহার হিসেবে পাওয়া এক নতুন ও অত্যাধুনিক বিলাসবহুল বোয়িং উড়োজাহাজে প্রথমবারের মতো আরোহণ করেছেন।

 

এই বিশেষ বিমানটিকে তিনি বর্তমানে মার্কিন প্রেসিডেন্টের সরকারি বাহন বা 'এয়ার ফোর্স ওয়ান' হিসেবে ব্যবহার শুরু করেছেন। নতুন এই উড়োজাহাজটি নিয়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প অভাবনীয় উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছেন।

 

সংবাদমাধ্যমের সামনে নিজের মুগ্ধতা প্রকাশ করতে গিয়ে তিনি অকপটে স্বীকার করেছেন যে, খোদ যুক্তরাষ্ট্রও চাইলেও এত বিপুল অর্থ ব্যয় করে এমন নিখুঁত এবং বিলাসবহুল একটি উড়োজাহাজ তৈরি করতে পারত না।

 

বিশ্বজুড়ে এই ঘটনাটি একইসঙ্গে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক মহলে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। গত বুধবার, ১ জুলাই ২০২৬ তারিখে যুক্তরাষ্ট্রের মেরিল্যান্ড অঙ্গরাজ্যের জয়েন্ট বেস অ্যান্ড্রুজ থেকে উড়োজাহাজটি তার প্রথম আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু করে।

 

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প উত্তর ডাকোটা অঙ্গরাজ্যে অনুষ্ঠিতব্য 'আমেরিকা ২৫০' নামক একটি বিশেষ জাতীয় উদযাপন অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়ার উদ্দেশ্যে এই বিমানে ভ্রমণ করেন। যাত্রার প্রাক্কালে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে তিনি নিজের প্রবল উত্তেজনা ও আনন্দ ব্যক্ত করেন।

 

তিনি জানান যে, এটি এই বিমানে তার জীবনের প্রথম যাত্রা এবং তিনি এর প্রতিটি মুহূর্ত নিয়ে অত্যন্ত আনন্দিত। তার মতে, বিমানটির অভ্যন্তরীণ কারুকাজ থেকে শুরু করে প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ-সবকিছুই এক কথায় অনন্য ও তুলনাহীন।

 

কাতার সরকারের পক্ষ থেকে কোনো প্রকার শর্ত ছাড়াই সম্পূর্ণ বিনামূল্যে যুক্তরাষ্ট্রকে এই বিশেষ উড়োজাহাজটি প্রদান করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারদর অনুযায়ী এই অত্যাধুনিক বোয়িং বিমানটির আনুমানিক মূল্য প্রায় চল্লিশ কোটি মার্কিন ডলারের কাছাকাছি।

 

তবে বিদেশি কোনো রাষ্ট্রপ্রধান বা মিত্র সরকারের কাছ থেকে এত বিপুল মূল্যের একটি উপহার গ্রহণ করা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে নানামুখী আইনি, নৈতিক এবং জাতীয় নিরাপত্তা সংক্রান্ত প্রশ্নের উদ্ভব হয়েছে।

 

ওয়াশিংটনের অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সমালোচক মনে করছেন, এই ধরনের বিলাসবহুল উপহার ভবিষ্যতের মার্কিন পররাষ্ট্রনীতি বা মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক কূটনৈতিক সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলতে পারে।

 

যদিও মার্কিন প্রশাসন নিশ্চিত করেছে যে, সমস্ত আইনি প্রক্রিয়া ও স্বচ্ছতা বজায় রেখে বিমানটিকে আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা দপ্তরের অধীনে একটি রাষ্ট্রীয় উপহার হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছে।

 

শুরুতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নিজের মেয়াদ শেষে বিমানটিকে তার নিজস্ব প্রেসিডেন্সিয়াল লাইব্রেরিতে দান করার একটি প্রাথমিক পরিকল্পনা করেছিলেন, তবে পরবর্তীতে নৈতিক বিতর্কের অবসান ঘটাতে এটি সরাসরি রাষ্ট্রীয় সম্পত্তিতে পরিণত হয়।

 

নজরকাড়া এই উড়োজাহাজটির বাহ্যিক আবরণ সাদা, লাল এবং গাঢ় নীল রঙের এক অনন্য মিশ্রণে সাজানো হয়েছে, যা দূর থেকেই দৃষ্টি আকর্ষণ করে। এর ভেতরের সাজসজ্জা এবং নকশা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের পূর্বের ব্যক্তিগত উড়োজাহাজের বিলাসবহুল ইন্টেরিয়রের সঙ্গে দারুণভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

 

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বিমানটির প্রস্তুতকারী দলের প্রশংসা করে জানিয়েছেন যে, তারা অত্যন্ত সুনিপুণভাবে এর প্রতিটি কাজ সম্পন্ন করেছেন এবং এটিকে সত্যিকার অর্থেই বিশ্বের অন্যতম ক্ষমতাধর একজন রাষ্ট্রপতির সম্পূর্ণ উপযুক্ত একটি বাহনে পরিণত করেছেন।

 

বিমানটিতে স্থাপিত নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং আধুনিক সুযোগ-সুবিধাগুলো অসাধারণ। এটিকে তিনি আধুনিক ও অত্যন্ত জটিল প্রযুক্তির এক অনবদ্য মাস্টারপিস হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।

 

এই বিলাসবহুল বোয়িং বিমানটি মার্কিন বহরে যুক্ত হওয়ার পেছনের গল্পটিও বেশ কৌতূহলোদ্দীপক। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সংবাদমাধ্যমকে জানান যে, বোয়িং কোম্পানির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ব্যক্তিগতভাবে তাকে নিশ্চিত করেছিলেন যে, কাতারের জন্য নির্মিত এই উড়োজাহাজটি তাদের তৈরি সেরা মডেলগুলোর একটি।

 

এই তথ্য জানার পর ট্রাম্প কাতারের আমিরের কাছে বিমানটি সাময়িকভাবে ব্যবহারের জন্য অনুমতি চেয়েছিলেন। কিন্তু মার্কিন প্রেসিডেন্টের এমন প্রস্তাবের পর বন্ধুত্বের নিদর্শনস্বরূপ কাতারের আমির পুরো বিমানটিই বিনা শর্তে যুক্তরাষ্ট্রকে উপহার হিসেবে দিয়ে দেন।

 

গত মাসে জয়েন্ট বেস অ্যান্ড্রুজে এক অনাড়ম্বর কিন্তু অভিজাত অনুষ্ঠানে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নিজে এর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন এবং এটিকে বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে বিলাসবহুল উড়োজাহাজ হিসেবে স্বীকৃতি দেন।

 

উড়োজাহাজটির অভ্যন্তরে প্রবেশ করলে এর রাজকীয় আভিজাত্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ভেতরে রয়েছে পুরোপুরি সমতল করে শোয়ার উপযোগী অত্যন্ত আরামদায়ক চামড়ার তৈরি আসন। প্রতিটি আসনের নিরাপত্তা বেল্টে খোদাই করা রয়েছে মার্কিন প্রেসিডেন্টের দাপ্তরিক প্রতীক।

 

এর পাশাপাশি হালকা বাদামি রঙের নান্দনিক দেওয়াল, মেঝেতে বিছানো চোখজুড়ানো কার্পেট এবং পুরো কেবিন জুড়ে সোনালি আলোর এক মোহময় ব্যবস্থা বিমানটির আভিজাত্যকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। এই প্রথম ফ্লাইটে সফররত সাংবাদিকদের জন্য ছিল বিশেষ আপ্যায়নের ব্যবস্থা।

 

তাদের হ্যাম পনির ক্রোয়াসাঁ, সতেজ সবুজ সালাদ এবং বিভিন্ন ধরনের তাজা ফল পরিবেশন করা হয়। খাবার পরিবেশনের জন্য ব্যবহৃত সোনালি ও সাদা রঙের প্রতিটি পাত্রেও প্রেসিডেন্টের অফিশিয়াল প্রতীক অত্যন্ত সযত্নে খোদাই করা ছিল।

 

কাতারের এই উপহারটি এমন এক সময়ে মার্কিন প্রেসিডেন্টের বহরে যুক্ত হলো, যখন যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব প্রেসিডেন্সিয়াল বিমান বহরের আধুনিকায়নের কাজ চলছিল। নব্বইয়ের দশক থেকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টরা বোয়িং ৭৪৭-২০০ মডেলের পুরোনো উড়োজাহাজগুলোকে এয়ার ফোর্স ওয়ান হিসেবে ব্যবহার করে আসছিলেন, যা সময়ের পরিক্রমায় বেশ পুরনো হয়ে পড়েছিল।

 

অত্যাধুনিক প্রযুক্তি সম্বলিত নতুন দুটি মডেলের উড়োজাহাজ তৈরি হতে আরও অন্তত দুই বছর সময়ের প্রয়োজন। এই মধ্যবর্তী সময়ে প্রেসিডেন্টের যাতায়াতের জন্য একটি উপযুক্ত ও সুরক্ষিত বিমানের যে ঘাটতি ছিল, কাতারের উপহার দেওয়া এই বিমানটি তা চমৎকারভাবে পূরণ করেছে।

 

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প অকপটেই স্বীকার করেছেন যে, এ ধরনের উড়োজাহাজ আগে কখনো দেখা যায়নি এবং এত বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করে যুক্তরাষ্ট্রের হয়তো এমন একটি বিমান তৈরি করার কোনো ইচ্ছেই ছিল না, কিন্তু কাতার নিজেদের সর্বোচ্চ সামর্থ্য ও অর্থ ব্যয় করে এই অবিশ্বাস্য উপহারটি প্রস্তুত করেছে।

 

- সিএনএন