এই বিস্তৃত বিবরণী স্পষ্টভাবে প্রমাণ করছে যে, তিনি কেবল একজন সাধারণ ধনকুবের ব্যবসায়ীই নন, বরং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সুদীর্ঘ আড়াইশ বছরের ইতিহাসে সম্পদের দিক থেকে সবচেয়ে ধনী প্রেসিডেন্ট হিসেবে এক অবিস্মরণীয় নতুন রেকর্ড গড়েছেন।
আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও অর্থনীতির বিশ্লেষকরা মনে করছেন, তার এই বিপুল পরিমাণ সম্পদ মার্কিন রাজনীতির ইতিহাসে এক অভাবনীয় মাইলফলক, যা আগামী দিনগুলোতেও ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেবে।
যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি নৈতিকতা দপ্তরে বা অফিস অব গভর্নমেন্ট এথিকস-এ জমা দেওয়া ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই বিস্তৃত আর্থিক বিবরণীটি নিবিড়ভাবে বিশ্লেষণ করেছে স্বনামধন্য আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্স।
তাদের সেই গভীর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, গত এক বছরে মার্কিন এই প্রেসিডেন্টের আয়ের সবচেয়ে বড় এবং চমকপ্রদ উৎস ছিল আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর ডিজিটাল মুদ্রা বা ক্রিপ্টোকারেন্সি ভিত্তিক বৈশ্বিক ব্যবসা।
নথিপত্র বলছে, সম্পূর্ণ নতুন এবং অভিনব এই খাতটি থেকেই তিনি এক হাজার চারশ কোটি মার্কিন ডলারেরও বেশি আয় আনুষ্ঠানিকভাবে প্রদর্শন করেছেন। এর মধ্যে কেবল একটি সুনির্দিষ্ট ডিজিটাল প্রতিষ্ঠান থেকেই তার মুনাফা এসেছে প্রায় আটশো কোটি ডলার।
এর পাশাপাশি, তার নিজস্ব নামে বাজারে আসা বিভিন্ন ডিজিটাল মুদ্রা বিক্রি করেও তিনি আরও কয়েকশ কোটি ডলারের বিশাল মুনাফা অর্জন করেছেন, যা তার ব্যক্তিগত সম্পদের পাহাড়কে আরও বহুগুণ স্ফীত করে তুলেছে।
তবে ডোনাল্ড ট্রাম্প কেবল প্রযুক্তিনির্ভর নতুন খাতেই আটকে নেই, তার দীর্ঘদিনের ঐতিহ্যবাহী আবাসন ও বিলাসবহুল বিনোদনমূলক ব্যবসাগুলোও সমানতালে বিপুল লাভজনক অবস্থায় রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে ছড়িয়ে থাকা তার চোখধাঁধানো বিলাসবহুল গলফ ক্লাব, আধুনিক সুযোগ-সুবিধা সম্বলিত অবকাশযাপন কেন্দ্র, পাঁচতারা মানের হোটেল এবং সুবিশাল বাণিজ্যিক ভবনগুলো থেকে গত বছরও তিনি পাহাড়সম আয় নিজেদের কোষাগারে যুক্ত করেছেন।
রয়টার্সের প্রকাশিত নির্ভরযোগ্য তথ্য অনুযায়ী, শুধুমাত্র গলফ ক্লাব এবং অবকাশযাপন কেন্দ্রগুলো থেকেই তার মুনাফা এসেছে পাঁচশো কোটি ডলারের বেশি। বিশেষ করে ফ্লোরিডা অঙ্গরাজ্যে অবস্থিত তার অত্যন্ত সুপরিচিত ও রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ মার-আ-লাগো অভিজাত ক্লাব থেকেও কয়েক কোটি ডলার অবিরাম আয় হয়েছে।
এগুলোর পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্য, এশিয়া এবং ইউরোপের বিভিন্ন দেশের বড় বড় আবাসন ও বিলাসবহুল বাণিজ্যিক প্রকল্পে নিজের প্রতিষ্ঠানের নাম ব্যবহারের আইনি অনুমতি বা লাইসেন্সিং চুক্তির মাধ্যমেও তিনি প্রতি বছর কোটি কোটি ডলার অনায়াসে আয় করে চলেছেন।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসির এক বস্তুনিষ্ঠ বিশ্লেষণে বলা হয়েছে যে, একটা সময় ছিল যখন ডোনাল্ড ট্রাম্পের আয়ের প্রধান ও প্রায় একমাত্র ভিত্তি ছিল স্থাবর সম্পত্তি, সুরম্য ভবন ও হোটেল ব্যবসা। কিন্তু সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে তিনি এখন প্রযুক্তিনির্ভর আর্থিক খাতেও অত্যন্ত প্রভাবশালী ও নেতৃস্থানীয় ভূমিকা পালন করছেন।
আন্তর্জাতিক অর্থনীতিবিদ ও বাজার বিশেষজ্ঞদের মতে, বিনিয়োগের এই দূরদর্শী ও সময়োপযোগী পরিবর্তনের কারণেই মূলত তার সম্পদের পরিমাণ অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় অভাবনীয় দ্রুতগতিতে বৃদ্ধি পেয়েছে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসের অন্যান্য সাবেক প্রেসিডেন্টদের সম্পদের সাথে তুলনা করলে ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই আর্থিক বিশালত্বের পার্থক্যটি আরও বেশি সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে। অর্থনীতিবিদদের মূল্যস্ফীতির হিসাব যথাযথভাবে সমন্বয় করার পরও সাবেক প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডির মোট সম্পদের পরিমাণ ছিল আনুমানিক একশ কোটি ডলারের সামান্য বেশি।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম প্রেসিডেন্ট জর্জ ওয়াশিংটনের মোট সম্পদের মূল্যমানও ছিল সর্বোচ্চ কয়েকশ কোটি ডলারের সমপরিমাণ। কিন্তু ডোনাল্ড ট্রাম্পের বর্তমান মোট সম্পদের পরিমাণ গিয়ে ঠেকেছে কয়েক হাজার কোটি ডলারে।
অর্থাৎ, নিছক সম্পদের বিশালতার বিচারে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসের অন্য সব প্রেসিডেন্টকে যোজন যোজন পেছনে ফেলে এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে গেছেন। তবে একজন ক্ষমতাসীন রাষ্ট্রপ্রধানের এই বিপুল পরিমাণ সম্পদ ও বিশ্বব্যাপী বিস্তৃত ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান নিয়ে মার্কিন রাজনৈতিক অঙ্গনে বিস্তর বিতর্ক ও সমালোচনারও সৃষ্টি হয়েছে।
বিরোধী রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের জোরালো অভিযোগ, দেশের সর্বোচ্চ শাসনক্ষমতায় থাকা একজন প্রেসিডেন্টের এত বিশাল ও আন্তর্জাতিকভাবে বিস্তৃত ব্যবসায়িক সাম্রাজ্য রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত স্বার্থ ও রাষ্ট্রীয় দায়িত্বের মধ্যে এক ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত স্বার্থের সংঘাত তৈরি করতে পারে।
তবে হোয়াইট হাউসের পক্ষ থেকে এ ধরনের যাবতীয় অভিযোগ অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে সরাসরি অস্বীকার করা হয়েছে। তাদের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য হলো, ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর থেকে তার ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো আর সরাসরি নিজে পরিচালনা করেন না।
বর্তমানে তার পরিবারের বিশ্বস্ত সদস্য ও বিশেষভাবে নিযুক্ত অভিজ্ঞ ব্যবস্থাপকরাই এই সুবিশাল সাম্রাজ্যের দৈনন্দিন দেখভাল অত্যন্ত পেশাদারিত্বের সাথে করছেন। সব মিলিয়ে তার সর্বশেষ আর্থিক বিবরণী থেকে এটি সম্পূর্ণ পরিষ্কার যে, প্রথাগত ব্যবসা, প্রযুক্তিনির্ভর নতুন বিনিয়োগ, বিলাসবহুল স্থাপনা এবং দেশ-বিদেশের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক চুক্তির এক অনবদ্য সমন্বয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্প এমন এক বিপুল সম্পদের একচ্ছত্র মালিক হয়েছেন, যা যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘ ইতিহাসে অন্য কোনো প্রেসিডেন্টের ক্ষেত্রে কখনোই দেখা যায়নি।
আর ঠিক এই অসামান্য ব্যবসায়িক সাফল্যের কারণেই তাকে বর্তমানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসের সবচেয়ে ধনী প্রেসিডেন্ট হিসেবে নতুন রেকর্ডের অবিসংবাদিত মালিক বলে স্বীকৃতি দেওয়া হচ্ছে।