মঙ্গলবার, জুলাই ১৪, ২০২৬
৩০ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

হরমুজ প্রণালির ‘অভিভাবক’ হিসেবে বাণিজ্যিক জাহাজ থেকে টোল আদায় করবে যুক্তরাষ্ট্র

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৪ জুলাই, ২০২৬, ০৫:১০ পিএম

হরমুজ প্রণালির ‘অভিভাবক’ হিসেবে বাণিজ্যিক জাহাজ থেকে টোল আদায় করবে যুক্তরাষ্ট্র
ছবি : Collected

আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর জলপথ হরমুজ প্রণালির পূর্ণাঙ্গ নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পাশাপাশি এর ‘অভিভাবক’ হিসেবে আত্মপ্রকাশের এক যুগান্তকারী ঘোষণা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।

 

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অতি সম্প্রতি এক আনুষ্ঠানিক ঘোষণায় জানিয়েছেন, এই প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে এখন থেকে মার্কিন নিরাপত্তা প্রদানের বিনিময়ে ২০ শতাংশ হারে টোল বা শুল্ক প্রদান করতে হবে।

 

এই অভাবনীয় সিদ্ধান্তের ফলে মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতি, আন্তর্জাতিক সমুদ্রবাণিজ্য এবং বিশ্ব অর্থনীতিতে এক নতুন মেরুকরণ ও চরম উত্তেজনার সৃষ্টি হয়েছে। মার্কিন সম্প্রচারমাধ্যম ফক্স নিউজকে দেওয়া এক বিশেষ ও তাৎপর্যপূর্ণ সাক্ষাৎকারে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প প্রথমবারের মতো যুক্তরাষ্ট্রকে হরমুজ প্রণালির অভিভাবক হিসেবে আখ্যায়িত করেন।

 

তিনি অত্যন্ত জোরালো ভাষায় এবং স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেন যে, অতি শিগগিরই ওয়াশিংটন এই কৌশলগত জলপথটির সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে তুলে নেবে। ফক্স নিউজে দেওয়া ওই চাঞ্চল্যকর সাক্ষাৎকারের কয়েক ঘণ্টা পরেই তিনি নিজস্ব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ একটি সুদীর্ঘ ও বিস্তারিত বার্তা প্রকাশ করেন।

 

সেখানে তিনি হরমুজ প্রণালির ভবিষ্যৎ রূপরেখা, মার্কিন প্রশাসনের নতুন নীতি এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে এর প্রভাব সম্পর্কে বিস্তারিত ব্যাখ্যা তুলে ধরেন। ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া বার্তায় ট্রাম্প অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে বলেন, হরমুজ প্রণালি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য সর্বদা উন্মুক্ত ছিল, বর্তমানে উন্মুক্ত আছে এবং ভবিষ্যতেও নিরবচ্ছিন্নভাবে উন্মুক্ত থাকবে।

 

এক্ষেত্রে ওই অঞ্চলে ইরানের উপস্থিতি বা অনুপস্থিতি কোনো ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে না। এখন থেকে যুক্তরাষ্ট্র এই প্রণালির অভিভাবকের গুরুদায়িত্ব এককভাবে পালন করবে। এমন এক অস্থিতিশীল ও সংঘাতময় পরিস্থিতিতে প্রণালিতে চলাচলরত বিশ্বের বিভিন্ন দেশের পণ্যবাহী বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা এবং সর্বোচ্চ মাত্রার সুরক্ষা প্রদানের সার্বিক দায়িত্ব এখন সম্পূর্ণভাবে যুক্তরাষ্ট্রের কাঁধে বর্তেছে।

 

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আরও ব্যাখ্যা করেন যে, এই বিশাল আন্তর্জাতিক দায়িত্ব পালন এবং প্রণালির সার্বিক নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করার জন্য যে বিপুল পরিমাণ অর্থ নিয়মিত ব্যয় হবে, তা সংগ্রহ করতেই প্রণালিতে চলাচলকারী পণ্যবাহী জাহাজগুলোর পরিবাহিত পণ্যের মোট মূল্যের ওপর ২০ শতাংশ হারে টোল আদায় করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে।

 

তিনি তার ঘোষণায় বিষয়টি আরও সুস্পষ্ট করেন যে, এখন থেকে বিশ্বমঞ্চে যুক্তরাষ্ট্র আনুষ্ঠানিকভাবে ‘হরমুজ প্রণালীর অভিভাবক’ হিসেবেই সমধিক পরিচিতি লাভ করবে। নিরাপত্তার স্বার্থে এবং ন্যায্যতার আন্তর্জাতিক নীতি কঠোরভাবে অনুসরণ করে এই সুরক্ষা কার্যক্রম সম্পাদনে প্রয়োজনীয় যাবতীয় খরচের জোগান দিতে প্রেরিত সমস্ত পণ্যের ওপর উল্লেখিত ২০ শতাংশ অর্থ পরিশোধ করা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।

 

মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিশেষভাবে জোর দিয়ে বলেন যে, এই নতুন টোল ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা কোনো ধরনের কালক্ষেপণ বা বিলম্ব ছাড়াই অবিলম্বে কার্যকর করা হবে, যাতে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে কোনো ব্যাঘাত না ঘটে।

 

এই অভিভাবকত্ব ও টোল আদায়ের ঘোষণার পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের চিরবৈরী প্রতিপক্ষ ইরানের ওপর নতুন করে অত্যন্ত কঠোর মাত্রার অর্থনৈতিক ও নৌ অবরোধ আরোপের কথাও জানিয়েছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প।

 

তিনি বলেন, ওয়াশিংটন ইতোমধ্যেই আন্তর্জাতিক নীতি অনুযায়ী ইরানের বন্দরগুলোর ওপর পুনরায় সর্বাত্মক অবরোধ কার্যকর করেছে। এই কঠোর পদক্ষেপের ফলে এখন থেকে ইরানের নিজস্ব কোনো বাণিজ্যিক বা সামরিক জাহাজ কিংবা তাদের সঙ্গে বাণিজ্যিকভাবে যুক্ত কোনো গ্রাহক দেশের জাহাজ হরমুজ প্রণালি ব্যবহার করে প্রবেশ বা প্রস্থান করতে পারবে না।

 

তবে ট্রাম্প বিশ্ব সম্প্রদায়কে আশ্বস্ত করে বলেছেন, কেবলমাত্র ইরানের নৌযান ব্যতীত বিশ্বের অন্যান্য সব দেশের বৈধ বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপদ যাতায়াতের জন্য হরমুজ প্রণালি সম্পূর্ণ উন্মুক্ত ও বাধামুক্ত থাকবে।

 

আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরানের মধ্যকার এই সাম্প্রতিক উত্তেজনার পেছনে একটি সুদীর্ঘ ও জটিল দ্বন্দ্ব কাজ করছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি দুই দেশের মধ্যে একটি বড় ধরনের সামরিক ও কৌশলগত সংঘাত শুরু হয়, যা প্রায় দীর্ঘ তিন মাস ধরে স্থায়ী হয়েছিল এবং পুরো মধ্যপ্রাচ্যকে অস্থিতিশীল করে তুলেছিল।

 

পরবর্তীতে অনেক কূটনৈতিক দেনদরবারের পর ১৭ জুন উভয় পক্ষ বহুল আলোচিত ‘ইসলামাবাদ শান্তি চুক্তি’ স্বাক্ষর করে। কিন্তু সেই শান্তি চুক্তির কালি শুকাতে না শুকাতেই গত ৫ জুলাই আন্তর্জাতিক বাণিজ্যপথ হরমুজ প্রণালিতে চলাচলরত সাধারণ বাণিজ্যিক জাহাজ লক্ষ্য করে ইরানের অত্যন্ত প্রভাবশালী সামরিক শাখা ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর বা আইআরজিসি আকস্মিক ও অনাকাঙ্ক্ষিত হামলা চালায়।

 

আইআরজিসির এই হামলার পর থেকেই ওয়াশিংটন এবং তেহরানের মধ্যে পুনরায় তীব্র মাত্রায় সংঘাত উসকে ওঠে, যার ধারাবাহিকতা বর্তমান সময় পর্যন্ত চলমান রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে বিরাজমান বর্তমান সংঘাতের অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে হরমুজ প্রণালিতে চলাচলকারী বিদেশি বাণিজ্যিক জাহাজগুলো থেকে ইরানের নিজস্ব পদ্ধতিতে টোল আদায়ের গভীর আকাঙ্ক্ষাকে।

 

এর আগে তেহরান আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেছিল যে, ইসলামাবাদ সমঝোতা চুক্তিতে উল্লেখিত ৬০ দিনের যুদ্ধবিরতির মেয়াদ শেষ হওয়া মাত্রই তারা তাদের নিজস্ব নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্বার্থে হরমুজ প্রণালি দিয়ে যাতায়াতকারী সব জাহাজ থেকে টোল আদায় কার্যক্রম শুরু করবে।

 

ইরানের এই একতরফা ও আগ্রাসী সিদ্ধান্তের একটি মোক্ষম ও সরাসরি পাল্টা জবাব হিসেবেই যুক্তরাষ্ট্র প্রণালির পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিজেদের অভিভাবকত্ব ঘোষণা এবং টোল আদায়ের এই অভিনব ও কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা এএফপি এবং ফার্স্টপোস্টের প্রতিবেদনে এই সংঘাতময় ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতির বিস্তারিত ও বস্তুনিষ্ঠ তথ্য উঠে এসেছে।

 

- এএফপি, ফার্স্টপোস্ট