মার্কিন প্রশাসনের পক্ষ থেকে আন্তর্জাতিক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট করা এক বিশেষ বিবৃতিতে বলা হয়েছে যে, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান অত্যন্ত উদ্বেগজনক পরিস্থিতির কারণে সামগ্রিক নিরাপত্তা পরিবেশ এখনও বেশ জটিল ও ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে।
এই অঞ্চলের নিরাপত্তা পরিস্থিতি যেকোনো মুহূর্তে অপ্রত্যাশিতভাবে আরও অবনতি হতে পারে এবং নতুন করে চরম উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়তে পারে। সার্বিক নিরাপত্তা ঝুঁকি বিবেচনা করে মার্কিন নাগরিকদের এই মুহূর্তে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে ভ্রমণের ব্যাপারে কঠোরভাবে নিরুৎসাহিত করছে দেশটির সরকার।
একই সঙ্গে বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে অবস্থানরত মার্কিন নাগরিকদের উদ্দেশ্যে বিশেষ নির্দেশনা দিয়ে বলা হয়েছে, তারা যেন অবশ্যই স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর খবরের ওপর সার্বক্ষণিক নজর রাখেন এবং যেকোনো ধরনের জরুরি পরিস্থিতি বা বিপদে নিকটস্থ মার্কিন দূতাবাস অথবা কনস্যুলেটের সঙ্গে অবিলম্বে যোগাযোগ করেন।
তেহরান এবং ওয়াশিংটনের মধ্যে এই নতুন ও ভয়াবহ যুদ্ধাবস্থার সূত্রপাত ঘটে চলতি মাসের শুরুর দিকে। কূটনৈতিক সূত্র থেকে জানা যায়, আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বহুল আলোচিত 'ইসলামাবাদ সমঝোতা চুক্তি'র শর্ত অমান্য করে গত ৫ জুলাই কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিতে সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুটি বাণিজ্যিক জাহাজ লক্ষ্য করে বিমান হামলা চালায় ইরানের প্রতিরক্ষা বাহিনী।
ইরানের সামরিক ড্রোনের মাধ্যমে চালানো এই আকস্মিক হামলার পর থেকেই দুই দেশের মধ্যে নতুন করে চরম উত্তেজনা ও যুদ্ধংদেহী মনোভাব তৈরি হয়। এই ঘটনার মাত্র দুই দিন পর, অর্থাৎ গত ৮ জুলাই তুরস্কের রাজধানী আঙ্কারায় সাংবাদিকদের সঙ্গে একটি উচ্চপর্যায়ের মতবিনিময় সভার আয়োজন করা হয়।
সেখানে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অত্যন্ত কঠোর ভাষায় ঘোষণা করেন যে, ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের চলমান যুদ্ধবিরতির মেয়াদ এবং কার্যকারিতা সম্পূর্ণভাবে শেষ হয়ে গেছে। সাংবাদিকদের সামনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট স্পষ্ট করে বলেন যে, সম্প্রতি হরমুজ প্রণালিতে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজে যে বর্বরোচিত হামলা চালানো হয়েছে, তা মূলত ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারক চুক্তির একটি সুস্পষ্ট ও চরম লঙ্ঘন।
ইরানের বর্তমান ক্ষমতাসীন সরকারের তীব্র সমালোচনা করে তিনি বলেন যে, হরমুজে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার মতো উসকানিমূলক কর্মকাণ্ডের পর দেশটির নেতৃত্বের সঙ্গে কোনো ধরনের শান্তিচুক্তি বা কূটনৈতিক আলোচনা করা এখন সম্পূর্ণ নিরর্থক এবং সময় নষ্ট করা ছাড়া আর কিছুই নয়।
মার্কিন প্রেসিডেন্টের এই অত্যন্ত কঠোর ও হুঁশিয়ারিমূলক বক্তব্যের পর দুই দেশের মধ্যকার যুদ্ধ পরিস্থিতি এক ভিন্ন মাত্রা লাভ করে। ট্রাম্পের এই আনুষ্ঠানিক ঘোষণার পর, গত ১১ জুলাই থেকে মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েনকৃত মার্কিন সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড বা 'সেন্টকম' প্রতি রাতে ইরানের বিভিন্ন সামরিক ও কৌশলগত লক্ষ্যবস্তুতে সুপরিকল্পিতভাবে ব্যাপক বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র অভিযান পরিচালনা করে আসছে।
গতকাল শুক্রবারও মার্কিন বাহিনী টানা সপ্তম রাতের মতো ইরানি ভূখণ্ডে তাদের এই বিধ্বংসী সামরিক অভিযান অব্যাহত রেখেছে। আমেরিকার এই ধারাবাহিক ও জোরালো সামরিক অভিযানের মুখে ইরানের সশস্ত্র বাহিনীও হাত গুটিয়ে বসে নেই।
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের এই তীব্র হামলার দাঁতভাঙা জবাব দিতে মধ্যপ্রাচ্যের পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের বিভিন্ন দেশে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটি ও গুরুত্বপূর্ণ সেনাস্থাপনাগুলো লক্ষ্য করে পাল্টা প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে তেহরান।
ইরানের প্রতিরক্ষা বাহিনীর অত্যন্ত দক্ষ ও অভিজাত শাখা 'ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী' বা আইআরজিসি মার্কিন অবস্থানগুলো লক্ষ্য করে একের পর এক অত্যাধুনিক ক্ষেপণাস্ত্র ও আত্মঘাতী ড্রোন নিক্ষেপ করছে। এর ফলে সমগ্র উপসাগরীয় অঞ্চল এখন এক বিশাল রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে, যা বিশ্ব শান্তির জন্য বড় ধরনের হুমকি সৃষ্টি করেছে।
গত শুক্রবার রাতে মার্কিন বাহিনীর তীব্র বিমান অভিযানের পর তাৎক্ষণিকভাবে একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল ও কড়া বার্তা প্রদান করেছেন ইরানের সর্বোচ্চ নেতার সামরিক উপদেষ্টা মেজর জেনারেল মোহসেন রেজায়ি।
তিনি মার্কিন প্রশাসনকে চূড়ান্ত হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন যে, যুক্তরাষ্ট্র যদি ইরানের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন করে এভাবে তাদের সামরিক হামলা ও আগ্রাসন অব্যাহত রাখে, তবে ইরান আর নিজেকে শুধু প্রতিরক্ষামূলক বা পাল্টা হামলার গণ্ডির মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখবে না।
তেহরান খুব শিগগিরই মার্কিন বাহিনীর বিরুদ্ধে একটি পূর্ণমাত্রার ও সর্বাত্মক যুদ্ধে অবতীর্ণ হবে। তিনি অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে আরও যোগ করেন যে, যদি এই সর্বাত্মক যুদ্ধ শুরু হয়, তবে মধ্যপ্রাচ্যের উপসাগরীয় অঞ্চলের কোনো দেশের রাজনৈতিক সীমান্তই আর সুরক্ষিত বা নিরাপদ থাকবে না।
ইরানের এই শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তার এমন হুমকি আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক মহলকে অত্যন্ত চিন্তিত করে তুলেছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, দুই পরাশক্তির এই অনড় অবস্থান ও ক্রমাগত হামলা-পাল্টা হামলা সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যকে একটি দীর্ঘস্থায়ী ও ভয়াবহ আঞ্চলিক মহাযুদ্ধের দিকে ঠেলে দিচ্ছে, যার ফলে আন্তর্জাতিক অর্থনীতি এবং তেলের বাজারেও এর একটি মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।