রবিবার, অক্টোবর ১৮, ২০২৬
৩ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

কানাডার সেনাঘাঁটিতে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড, ব্যাপক হতাহতের আশঙ্কা

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৮ অক্টোবর, ২০২৬, ১১:৫৯ এএম

কানাডার সেনাঘাঁটিতে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড, ব্যাপক হতাহতের আশঙ্কা
ছবি : Collected

কানাডার পশ্চিমাঞ্চলীয় প্রদেশ আলবার্টার একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও ব্যস্ততম সামরিক ঘাঁটিতে এক ভয়াবহ ও বিধ্বংসী অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। শনিবার, ১৭ অক্টোবর স্থানীয় সময় বিকেলে সূত্রপাত হওয়া এই ভয়াবহ আগুনে ইতোমধ্যে বেশ কয়েকজন ব্যক্তির হতাহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।

 

কানাডার জাতীয় প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় শনিবার রাতে এক জরুরি বিবৃতির মাধ্যমে এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনার বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেছে। দেশের অন্যতম প্রধান একটি সামরিক স্থাপনায় এমন আকস্মিক অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় সমগ্র কানাডায় গভীর উদ্বেগ ও শোকের ছায়া নেমে এসেছে।

 

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো এই ঘটনাটিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে প্রচার করছে, কারণ সামরিক ঘাঁটির মতো সর্বোচ্চ সুরক্ষিত এলাকায় এমন বিপর্যয় সাধারণত বিরল। কানাডার প্রতিরক্ষামন্ত্রী ডেভিড ম্যাকগুইন্টি রাজধানী থেকে আয়োজিত এক বিশেষ ও জরুরি প্রেস ব্রিফিংয়ে দেশবাসীর উদ্দেশে এই দুর্ঘটনার প্রাথমিক বিবরণ তুলে ধরেন।

 

অত্যন্ত ভারাক্রান্ত কণ্ঠে তিনি বলেন, "আমি গভীর দুঃখ ও বেদনার সঙ্গে আপনাদের জানাচ্ছি যে, আলবার্টার সেনাঘাঁটিতে ঘটা এই অগ্নিকাণ্ডে হতাহতের ঘটনা ঘটেছে।" তবে ঠিক কী কারণে বা কোন পরিস্থিতি থেকে এই ভয়াবহ আগুনের সূত্রপাত হয়েছে এবং এখন পর্যন্ত ঠিক কতজন মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন বা কতজন গুরুতর আহত অবস্থায় চিকিৎসাধীন রয়েছেন, সে বিষয়ে তিনি তাৎক্ষণিকভাবে কোনো সুনির্দিষ্ট পরিসংখ্যান বা স্পষ্ট তথ্য প্রদান করেননি।

 

তিনি পরিস্থিতিটির ভয়াবহতা উল্লেখ করে কেবল এটুকু নিশ্চিত করেছেন যে, আগুনটি এখনো সম্পূর্ণ রূপে সক্রিয় রয়েছে এবং ঘাঁটির ভেতরের পরিস্থিতি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ও বিপজ্জনক। উদ্ধারকর্মী ও ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।

 

অন্যদিকে, কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি এই বিপর্যয়কর ঘটনা প্রসঙ্গে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি তাঁর বিবৃতিতে ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, ঘাঁটির অভ্যন্তরে একটি গুরুতর ও অস্বাভাবিক ঘটনা থেকে এই অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত হয়ে থাকতে পারে।

 

তবে প্রতিরক্ষামন্ত্রীর মতোই তিনিও ঘটনার মূল কারণ বা অগ্নিকাণ্ডের সুনির্দিষ্ট উৎস সম্পর্কে বিস্তারিত কিছু প্রকাশ করা থেকে বিরত থেকেছেন। রাষ্ট্রীয় সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে বিষয়টিকে অত্যন্ত নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে এবং প্রয়োজনীয় সকল রাষ্ট্রীয় সহায়তা দ্রুততম সময়ের মধ্যে দুর্ঘটনাস্থলে পৌঁছে দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

 

ভৌগোলিক দিক থেকে এই সামরিক ঘাঁটিটি আলবার্টা প্রদেশের ওয়াইনরাইট নামক শহরে অবস্থিত। এটি আলবার্টার প্রাদেশিক রাজধানী এডমন্টন থেকে প্রায় ২১০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্ব দিকে অবস্থিত একটি কৌশলগত এলাকা।

 

ওয়াইনরাইট শহরের এই সেনাঘাঁটিটি কানাডার সামরিক বাহিনীর জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এখানে 'কানাডিয়ান ম্যানুভার ট্রেনিং সেন্টার' এবং 'থার্ড কানাডিয়ান ডিভিশন ট্রেনিং সেন্টার'-এর মতো গুরুত্বপূর্ণ সামরিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলো অবস্থিত।

 

এছাড়াও, এডমন্টনের আর্মি ফিল্ড ফোর্স ইউনিটের সদস্যদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ মাঠ হিসেবেও এই বিশাল ঘাঁটিটি ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। সারা বছর ধরেই এখানে বিভিন্ন সামরিক মহড়া এবং কৌশলগত প্রশিক্ষণ কার্যক্রম চলমান থাকে, যার কারণে এটি কানাডার অন্যতম ব্যস্ত ও প্রাণবন্ত সামরিক স্থাপনা হিসেবে পরিচিত।

 

স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সূত্র মতে, শনিবার বিকেল আনুমানিক ৪টার দিকে সেনাঘাঁটির পক্ষ থেকে জরুরি সহায়তার জন্য রয়্যাল কানাডিয়ান মাউন্টেড পুলিশের কাছে প্রথম আনুষ্ঠানিক বার্তা পাঠানো হয়।

 

খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস এবং জরুরি উদ্ধারকারী দলগুলো ঘটনাস্থলের দিকে ছুটে যায়। কিন্তু পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে স্থানীয় বৈরী আবহাওয়া।

 

ওয়াইনরাইট শহরের স্থানীয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ওই অঞ্চলে তীব্র মাত্রার বাতাস প্রবাহিত হওয়ার কারণে আগুন খুব দ্রুত ঘাঁটির এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ছে। বাতাসের গতিবেগ আগুনের লেলিহান শিখাকে আরও ভয়ংকর রূপ দিয়েছে, যা নেভাতে অগ্নিনির্বাপক কর্মীদের চরম বেগ পেতে হচ্ছে।

 

এত বড় একটি বিপর্যয় সত্ত্বেও এখন পর্যন্ত ওয়াইনরাইট শহরের সাধারণ বাসিন্দাদের এলাকা ছেড়ে অন্যত্র সরে যাওয়ার বা বাড়িঘর খালি করার জন্য প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক নির্দেশনা বা সতর্কতা জারি করা হয়নি।

 

তবে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে সাধারণ নাগরিকদের দুর্ঘটনাকবলিত সামরিক ঘাঁটির আশপাশের এলাকাগুলো সম্পূর্ণ এড়িয়ে চলার জন্য বিনীত অনুরোধ জানিয়েছে। উদ্ধারকারী যানবাহন এবং জরুরি সেবায় নিয়োজিত গাড়িগুলো যেন বাধাহীনভাবে এবং দ্রুততম সময়ের মধ্যে যাতায়াত করতে পারে, সেজন্য এলাকার সকল প্রধান সড়ক পরিষ্কার ও যানজটমুক্ত রাখার জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

 

একইসঙ্গে, অগ্নিকাণ্ডে আহতদের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার সুবিধার্থে ওয়াইনরাইট শহরের স্থানীয় স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও হাসপাতালগুলোতে সাধারণ রোগীদের খুব বেশি জরুরি প্রয়োজন না হলে ভিড় না করার জন্য প্রশাসনের তরফ থেকে বিশেষ অনুরোধ জানানো হয়েছে। সমগ্র জাতি এখন এই উদ্ধারকাজের দিকে তাকিয়ে আছে এবং নিহত ও আহতদের পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জ্ঞাপন করছে।

 

- দ্য গার্ডিয়ান, সিএনএন