মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রধান মুখপাত্র বা হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব গ্রহণের মাত্র এক সপ্তাহেরও কম সময়ের মধ্যে কেটি জাচারিয়াকে তার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পদ থেকে বরখাস্ত করা হয়েছে।
শুক্রবার ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বাধীন বর্তমান মার্কিন প্রশাসনের দুজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা সংবাদমাধ্যমকে এই অভাবনীয় এবং দ্রুতগতির রদবদলের তথ্যটি নিশ্চিত করেছেন। অত্যন্ত সংবেদনশীল এই পদে নিয়োগ পাওয়ার পর থেকে পাঁচ দিন পার হতে না হতেই তাকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়ার এই ঘটনা মার্কিন রাজনৈতিক ইতিহাসে এক নতুন নজির স্থাপন করেছে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে কেটি জাচারিয়ার এই আকস্মিক ও অপ্রত্যাশিত বিদায় এমন এক অত্যন্ত সংবেদনশীল ও কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ সময়ে সংঘটিত হলো, যখন আগামী নভেম্বরে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া মার্কিন কংগ্রেসের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মধ্যবর্তী নির্বাচনের আর মাত্র দুই সপ্তাহ সময় বাকি রয়েছে।
নির্বাচনের ঠিক আগমুহূর্তে এমন একজন শীর্ষ পর্যায়ের ও গুরুত্বপূর্ণ মুখপাত্রকে হারানো ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য একটি বড় ধরনের কৌশলগত ধাক্কা হিসেবেই বিবেচনা করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
ঠিক এই সময়ে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজের প্রশাসনের গত কয়েক বছরের যাবতীয় অর্জন, অর্থনৈতিক সফলতা এবং রাজনৈতিক বিজয়গুলোর চিত্র মার্কিন জনগণের সামনে অত্যন্ত জোরালোভাবে তুলে ধরতে মরিয়া হয়ে কাজ করে যাচ্ছেন।
একইসঙ্গে মার্কিন কংগ্রেসে রিপাবলিকান দলের সংখ্যাগরিষ্ঠতা এবং নিরঙ্কুশ নিয়ন্ত্রণ যেকোনো মূল্যে ধরে রাখার জন্য প্রশাসন সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এমন একটি সংকটময় ও যুগান্তকারী সময়ে হোয়াইট হাউসের মতো জায়গায় গণমাধ্যম সামলানোর জন্য একজন দক্ষ মুখপাত্রের শূন্যতা প্রশাসনের প্রচারণায় বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারির মতো একটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর, মর্যাদাপূর্ণ ও আন্তর্জাতিকভাবে দৃশ্যমান পদে দায়িত্ব গ্রহণের একেবারে শুরু থেকেই কেটি জাচারিয়া নানা ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত প্রতিকূলতা এবং সংবাদমাধ্যমের তীক্ষ্ণ সমালোচনার মুখে পড়েছিলেন।
বিশেষ করে তার পেশাগত অতীত এবং আইনি যোগ্যতার বিষয়টি নিয়ে গণমাধ্যম এবং রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক প্রশ্ন ও বিতর্কের উত্থাপন করা হয়। দায়িত্ব নেওয়ার পর হোয়াইট হাউসের প্রেস ব্রিফিং রুমে সাংবাদিকদের সামনে তার প্রথম দিকের কয়েকটি উপস্থিতি এবং বিভিন্ন টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে তার সামগ্রিক পারফরম্যান্স নিয়েও বিস্তর সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছিল।
হোয়াইট হাউসের অভ্যন্তরীণ কর্মকর্তারা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন যে, এই সমস্ত পুঞ্জীভূত বিতর্কের কারণেই মূলত জাচারিয়াকে এত দ্রুত সময়ের মধ্যে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়ার মতো একটি কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন।
দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই তাকে সরে যেতে বলা হয়েছে এবং তিনি বর্তমানে আনুষ্ঠানিক বিদায় নেওয়ার প্রক্রিয়ার মধ্যে রয়েছেন। কেটি জাচারিয়ার এই অত্যন্ত স্বল্পস্থায়ী মেয়াদ এবং পদত্যাগের পেছনের সবচেয়ে বড় কারণ হিসেবে তার আইনি পেশার যোগ্যতা সংক্রান্ত বিতর্ককেই মূলত দায়ী করা হচ্ছে।
হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই নিজের অতীত কর্মজীবন নিয়ে সাংবাদিকদের একের পর এক কঠিন ও অস্বস্তিকর প্রশ্নের মুখে পড়েন তিনি। জাচারিয়া এর আগে বারবার গণমাধ্যমের কাছে দাবি করেছিলেন যে, তিনি অতীতে আইন পেশায় অত্যন্ত সক্রিয়ভাবে নিয়োজিত ছিলেন এবং আইন বিষয়ে তার গভীর জ্ঞান রয়েছে।
এমনকি স্বয়ং প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও তাকে গণমাধ্যমের সামনে একজন অত্যন্ত দক্ষ ও অভিজ্ঞ আইনজীবী হিসেবেই প্রথম পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন। গত বুধবার হোয়াইট হাউসের সাংবাদিকদের কাছে পাঠানো এক আনুষ্ঠানিক ইমেইল বিবৃতিতে জাচারিয়া নিজের অবস্থান পরিষ্কার করতে গিয়ে বলেছিলেন যে, তিনি যথাযথ আইনি যোগ্যতা ও সনদ নিয়েই আন্তর্জাতিক লেনদেন বিষয়ক আইন বা ইন্টারন্যাশনাল ট্রানজ্যাকশন ল নিয়ে দীর্ঘদিন অত্যন্ত সুনামের সঙ্গে কাজ করেছেন।
তবে আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা রয়টার্সের অনুসন্ধানী সাংবাদিকরা তার এই দাবির সপক্ষে কোনো ধরনের বিশ্বাসযোগ্য সরকারি নথিপত্র বা প্রমাণ খুঁজে পেতে চরমভাবে ব্যর্থ হন। রয়টার্সের প্রকাশিত প্রতিবেদনে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে জানানো হয় যে, পেপারডিন ইউনিভার্সিটি ল স্কুল থেকে আইন বিষয়ে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করা এই নারী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কোনো অঙ্গরাজ্য কিংবা ডিস্ট্রিক্ট অব কলম্বিয়ায় একজন নিবন্ধিত আইনজীবী হিসেবে তালিকাভুক্ত ছিলেন না।
এমনকি তিনি যুক্তরাষ্ট্রের কোনো স্বীকৃত বার অ্যাসোসিয়েশনেরও সদস্য ছিলেন না বলে অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসে। বিতর্কের আগুনে ঘি ঢেলে দিয়ে গত বৃহস্পতিবার মার্কিন সংবাদমাধ্যম ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সরাসরি টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে কেটি জাচারিয়া নিজেই অত্যন্ত অকপটে স্বীকার করে নেন যে, তিনি আইন পেশায় প্রবেশের জন্য প্রয়োজনীয় এবং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বার পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে সম্পূর্ণভাবে ব্যর্থ হয়েছিলেন।
উল্লেখ্য, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রচলিত ও কঠোর আইন অনুযায়ী, আইন বিষয়ে স্নাতক বা যেকোনো ডিগ্রি অর্জনকারী কোনো ব্যক্তি কোনো অঙ্গরাজ্যের বার অ্যাসোসিয়েশনের আনুষ্ঠানিক সদস্যপদ লাভ না করা পর্যন্ত কোনোভাবেই আইন পেশায় নিয়োজিত হতে বা নিজেকে আইনজীবী হিসেবে পরিচয় দিতে পারেন না।
এই ধারাবাহিক বিতর্ক ও আইনি যোগ্যতার ঘাটতি নিয়ে শুক্রবার হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের সঙ্গে এক মতবিনিময় পর্ব চলাকালে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজেই বিষয়টি নিয়ে তার ব্যক্তিগত অবস্থান পরিষ্কার করেন।
তিনি সাংবাদিকদের সামনে খোলাখুলিভাবেই জানান যে, দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই মার্কিন গণমাধ্যমে তীব্র এবং ধারাবাহিক সমালোচনার মুখে পড়ার পর তিনি নিজেই কেটি জাচারিয়াকে তার এই চাকরির ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে চিন্তাভাবনা বা পুনর্বিবেচনা করার পরামর্শ দিয়েছিলেন।
ডোনাল্ড ট্রাম্প তার কথোপকথনের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন যে, তিনি জাচারিয়াকে স্পষ্টভাবেই জানিয়েছিলেন, প্রতিটি মানুষই নিজের কর্মজীবনে সুখী হতে চায়, কিন্তু এই ধরনের প্রবল চাপযুক্ত, সংবেদনশীল ও সমালোচনামুখর দায়িত্ব পালন করে জাচারিয়া আদৌ সুখী হতে পারবেন কি না, সে বিষয়ে তার যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে।
প্রেসিডেন্ট আরও যোগ করেন যে, তিনি যদি জাচারিয়ার জায়গায় থাকতেন, তবে নিশ্চিতভাবেই তিনি বিষয়টি নিয়ে গভীরভাবে পুনর্বিবেচনা করতেন। সাম্প্রতিক বরখাস্ত করার বিষয়ে মন্তব্যের অনুরোধ জানিয়ে সংবাদমাধ্যমের পক্ষ থেকে পাঠানো ইমেইলের কোনো তাৎক্ষণিক জবাব জাচারিয়া কিংবা হোয়াইট হাউসের পক্ষ থেকে প্রদান করা হয়নি।
অথচ এর আগে শুক্রবার সকালেও হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের জাচারিয়া জানিয়েছিলেন যে, তিনি সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন। হোয়াইট হাউসে কেটি জাচারিয়ার প্রবেশের ইতিহাসটি ছিল অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত এবং ঘটনাবহুল।
গত ১২ অক্টোবর সোমবার তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারির গুরুদায়িত্ব কাঁধে তুলে নেন এবং ঠিক তার পরের দিন, অর্থাৎ মঙ্গলবার প্রথমবারের মতো হোয়াইট হাউসের প্রেস ব্রিফিং রুমে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে সংবাদ সম্মেলন করেন।
তিনি সাংবাদিকদের জানিয়েছিলেন যে, গত ৭ অক্টোবর তিনি এই মর্যাদাপূর্ণ পদে নিয়োগের জন্য একটি ফোনকল পেয়েছিলেন এবং এক সপ্তাহ আগে দায়িত্ব পালন করা সাবেক প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিটের স্থলাভিষিক্ত হওয়ার জন্য তাকে হোয়াইট হাউসের পক্ষ থেকে সরাসরি প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল।
হোয়াইট হাউসের অভ্যন্তরীণ সূত্রগুলোর মতে, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার প্রশাসনের বিভিন্ন অর্জন নিয়ে সংবাদমাধ্যমের বর্তমান প্রচারণায় একেবারেই সন্তুষ্ট ছিলেন না। তিনি এমন একজন নতুন, উদ্যমী এবং তুখোড় মুখপাত্র খুঁজছিলেন যিনি গণমাধ্যমের সামনে প্রশাসনের সাফল্যের কথাগুলো আরও জোরালো এবং আক্রমণাত্মকভাবে তুলে ধরতে পারবেন।
সেই ভাবনা থেকেই মূলত জাচারিয়াকে তড়িঘড়ি করে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। তবে এই তড়িঘড়ি নিয়োগ যে শেষ পর্যন্ত একটি ভুল সিদ্ধান্ত ছিল, তা মাত্র পাঁচ দিনের মাথাতেই প্রমাণিত হয়েছে। শুক্রবার ফক্স নিউজের সঙ্গে অপর এক টেলিফোন সাক্ষাৎকারে ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন যে, আপাতত নতুন কোনো প্রেস সেক্রেটারি নিয়োগের ক্ষেত্রে তার কোনো ধরনের তাড়া নেই।
কেটি জাচারিয়ার এই অভাবনীয় দ্রুতগতির বিদায়ের অর্থ হলো, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে সম্ভবত তিনিই সবচেয়ে কম সময়ের জন্য হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারির দায়িত্ব পালন করার একটি নতুন এবং অনাকাঙ্ক্ষিত রেকর্ড স্থাপন করলেন।
এর আগে ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদের সময় অ্যান্থনি স্কারামুচি মাত্র দশ দিনের জন্য হোয়াইট হাউসের যোগাযোগ পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করে সবচেয়ে কম সময় শীর্ষ পদে টিকে থাকার রেকর্ডটি গড়েছিলেন।
গত বুধবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে পোস্ট করা এক বার্তায় কেটি জাচারিয়ার এই আকস্মিক চাকরিচ্যুতির দিকে ইঙ্গিত করে অ্যান্থনি স্কারামুচি লিখেছেন যে, রেকর্ড তো সব সময় ভাঙার জন্যই তৈরি হয়, তবে অন্যের এমন কষ্টে বা দুর্ভাগ্যজনক পরিস্থিতিতে তিনি ব্যক্তিগতভাবে কোনো আনন্দ পান না। এই দ্রুতগতির পালাবদলের মধ্য দিয়ে হোয়াইট হাউসের গণমাধ্যম শাখার চ্যালেঞ্জিং দিকটি আবারো স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।