মঙ্গলবার, অক্টোবর ১৩, ২০২৬
২৮ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

চীন ও রাশিয়া ইরানকে সামরিক সহায়তা দিচ্ছে না বলে ট্রাম্পের দাবি

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৩ অক্টোবর, ২০২৬, ০৭:৫৯ পিএম

চীন ও রাশিয়া ইরানকে সামরিক সহায়তা দিচ্ছে না বলে ট্রাম্পের দাবি
ছবি: AA

ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার চলমান সামরিক সংঘাত এবং মধ্যপ্রাচ্যের চরম ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বক্তব্য দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি স্পষ্ট ভাষায় দাবি করেছেন যে, চীন ও রাশিয়া বর্তমান পরিস্থিতিতে ইরানকে কোনো ধরনের সামরিক বা কৌশলগত সহায়তা দিচ্ছে বলে তিনি বিশ্বাস করেন না।

 

সোমবার নিজস্ব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক বার্তায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট এই অভিমত ব্যক্ত করেন। তিনি যুক্তি উপস্থাপন করে জানান, তেহরানকে যে কোনো ধরনের সামরিক সহযোগিতা প্রদান করতে গেলে বেইজিং এবং মস্কো উভয়েরই বৈশ্বিক ক্ষেত্রে হারানোর ঝুঁকি অনেক বেশি থাকবে।

 

আন্তর্জাতিক অঙ্গনে চীন ও রাশিয়ার বিরুদ্ধে ইরানকে পরোক্ষভাবে সমর্থনের অভিযোগ ওঠার পর মার্কিন প্রেসিডেন্টের পক্ষ থেকে এই ধরনের দ্ব্যর্থহীন মন্তব্য আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক মহলে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

 

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত ওই দীর্ঘ বার্তায় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প উল্লেখ করেন, আন্তর্জাতিক পরিসরে অনেকেই দাবি করছেন যে বেইজিং ও মস্কো সামরিক দিক থেকে তেহরানের পাশে দাঁড়িয়েছে।

 

তবে এই বিষয়ে নিজের অনড় অবস্থান তুলে ধরে তিনি বলেন, যদি তর্কের খাতিরে ধরেও নেওয়া হয় যে তারা কোনো ধরনের সাহায্য করছে, তবে তা হয়তো অত্যন্ত নগণ্য বা নিম্নস্তরে হতে পারে। তবে ব্যক্তিগতভাবে তিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন যে তারা ইরানকে একেবারেই কোনো ধরনের সহায়তা করছে না।

 

মার্কিন প্রেসিডেন্ট অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সাথে সতর্ক করে বলেন, এই দুই দেশের এমন কোনো পদক্ষেপে জড়ালে অপূরণীয় ক্ষতি হতে পারে। পাশাপাশি তিনি আরও যোগ করেন যে, ওয়াশিংটনের অত্যন্ত শক্তিশালী গোয়েন্দা নজরদারির ব্যবস্থা রয়েছে এবং চীন কিংবা রাশিয়া যদি ইরানকে সহায়তা করার চেষ্টা করে, তবে ওয়াশিংটন অত্যন্ত দ্রুততম সময়ের মধ্যে তা জেনে ফেলতে সক্ষম হবে।

 

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের এই সাম্প্রতিক বক্তব্য মূলত গত জুলাই মাসে দেওয়া তার অপর একটি বিবৃতিরই প্রতিধ্বনি। সেই সময়ও ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে তিনি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে অবহিত করেছিলেন যে, গত মে মাসে চীনে অনুষ্ঠিত দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং তাকে সরাসরি আশ্বস্ত করেছিলেন।

 

চীনা প্রেসিডেন্ট তাকে স্পষ্ট প্রতিশ্রুতি দিয়ে জানিয়েছিলেন যে, কোনো অবস্থাতেই বেইজিং ইরানের কাছে কোনো ধরনের অস্ত্র বিক্রি করবে না এবং এমনকি তাদের কোনো বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমেও এই ধরনের অস্ত্র সরবরাহ করা হবে না।

 

একই ধারাবাহিকতায় রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনও তাকে ব্যক্তিগতভাবে আশ্বস্ত করেছিলেন যে মস্কো কোনো পরিস্থিতিতেই ইরানের কাছে সামরিক অস্ত্রশস্ত্র বিক্রি করবে না। সে সময় মার্কিন প্রেসিডেন্ট কড়া হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেছিলেন যে, এই দুই বিশ্বশক্তি যদি ইরানের সামরিক কর্মকাণ্ডে নিজেদের সম্পৃক্ত করার ভুল করে, তবে তার পরিণতি তাদের নিজেদের জন্যই অত্যন্ত মারাত্মক ও ক্ষতিকর হয়ে দাঁড়াবে।

 

অবশ্য মৌখিক এই আশ্বাসের বিপরীতে বাস্তব ক্ষেত্রে ওয়াশিংটনের কিছু পদক্ষেপ ইতিপূর্বে ভিন্ন চিত্রও তুলে ধরেছিল। চলতি বছরের মে মাসে ট্রাম্প প্রশাসন বেশ কয়েকটি চীনা প্রতিষ্ঠানের ওপর অত্যন্ত কঠোর অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল।

 

মার্কিন প্রশাসনের অভিযোগ ছিল, ওই চীনা সংস্থাগুলো ইরানের সামরিক সরঞ্জাম সংগ্রহ প্রক্রিয়ায় গোপন নেটওয়ার্ক হিসেবে সহায়তা করেছে। শুধু তাই নয়, মার্কিন বাহিনীর অবস্থান লক্ষ্য করে তেহরান যাতে নির্ভুলভাবে মিসাইল ও ড্রোন হামলা চালাতে পারে, সেজন্য ওই প্রতিষ্ঠানগুলো ইরানকে প্রয়োজনীয় কৃত্রিম উপগ্রহ বা স্যাটেলাইটের নজরদারি চিত্র সরবরাহ করেছিল বলে ওয়াশিংটন গুরুতর অভিযোগ তোলে।

 

তবে চীন শুরু থেকেই অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে এই সমস্ত মার্কিন অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন বলে সরাসরি প্রত্যাখ্যান করে এসেছে। বেইজিংয়ের পক্ষ থেকে সুস্পষ্টভাবে জানানো হয় যে, কোনো চীনা প্রতিষ্ঠান ইরানের সামরিক বাহিনীকে সহায়তা করার সাথে জড়িত ছিল না।

 

মধ্যপ্রাচ্যে এই রক্তক্ষয়ী সামরিক সংঘাতের সূচনা ঘটেছিল চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি। ওই দিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানের ভূখণ্ড লক্ষ্য করে সরাসরি সামরিক আগ্রাসন শুরু করে। এর জবাবে ইরানও মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে তাদের শক্তিশালী মিসাইল ও ড্রোন সক্ষমতা ব্যবহার করে পাল্টা তীব্র আক্রমণ পরিচালনা করে।

 

একই সাথে বিশ্ব অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত সংবেদনশীল ও আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহের প্রধানতম সমুদ্রপথ হিসেবে পরিচিত হরমুজ প্রণালিটি ইরান কার্যকরভাবে অবরুদ্ধ করে দেয়। বিশ্বের অন্যতম প্রধান এই জ্বালানি সরবরাহ পথটি কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ার ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেল সরবরাহ নিয়ে এক গভীর সংকট তৈরি হয় এবং সামগ্রিক বৈশ্বিক অর্থনীতি মারাত্মকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে।

 

পরবর্তীতে সংঘাত বন্ধের লক্ষ্যে কাতার ও পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় শান্তি আলোচনার একটি ক্ষীণ সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল। গত জুন মাসে উভয় দেশের মধ্যস্থতায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছিল, যার লক্ষ্য ছিল সংঘাত নিরসন ও স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা।

 

তবে হরমুজ প্রণালিতে অবাধ ও নিরাপদ জাহাজ চলাচলসহ বেশ কয়েকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও মৌলিক বিষয়ে উভয় পক্ষের মধ্যে তীব্র মতানৈক্য দেখা দেওয়ার ফলে সেই শান্তি প্রক্রিয়া পুরোপুরি স্থবির হয়ে পড়ে। সমঝোতা চুক্তিটি মাঝপথে আটকে যাওয়ায় মধ্যপ্রাচ্যের সার্বিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি এখনো চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছে।

 

ঠিক এমন এক সংকটময় মুহূর্তে চীন ও রাশিয়ার ভূমিকা নিয়ে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই মন্তব্য বিশ্ব পরাশক্তিগুলোর ভবিষ্যৎ অবস্থান এবং আঞ্চলিক রাজনীতির গতিপ্রকৃতি নির্ধারণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে বলে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন।

 

- আনাদোলু এজেন্সি