গ্রিসের রাজধানী এথেন্সে আয়োজিত এক উচ্চপর্যায়ের সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য প্রদানকালে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এই বিস্ফোরক মন্তব্য করেন। মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে চলমান দীর্ঘমেয়াদি ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা এবং আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহের প্রধান এই সামুদ্রিক করিডোরে নিরাপত্তা সংকটের মধ্যেই মার্কিন প্রশাসনের পক্ষ থেকে এমন চাঞ্চল্যকর দাবি উত্থাপন করা হলো।
ওয়াশিংটনের শীর্ষ এই কূটনীতিকের মতে, কৌশলগতভাবে অত্যন্ত সংবেদনশীল এই অঞ্চলে তেহরানের যে একচ্ছত্র প্রভাব ও কর্তৃত্বের দাবি ছিল, তা বর্তমান বাস্তবতায় কার্যত ভেঙে পড়েছে। গ্রিস সফরকালে অনুষ্ঠিত উক্ত সংবাদ সম্মেলনে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী অভিযোগ করেন যে, কূটনৈতিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বিদ্যমান বিরোধের একটি টেকসই ও সম্মানজনক মীমাংসায় পৌঁছানো এবং যৌথ নিরাপত্তা চুক্তি স্বাক্ষরের জন্য ইরানকে বারবার সুযোগ দেওয়া হয়েছিল।
তিনি জোর দিয়ে বলেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সর্বদা একটি নিয়মতান্ত্রিক ও ভারসাম্যপূর্ণ কাঠামোর অধীনে উত্তেজনা প্রশমনের পথ উন্মুক্ত রেখেছিল। তবে ইরানের বর্তমান নেতৃত্ব সেই সকল কূটনৈতিক প্রস্তাব ও আলোচনার সদিচ্ছাকে ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করতে চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছে।
রুবিওর বক্তব্য অনুযায়ী, তেহরানের অনমনীয় নীতি এবং একতরফা সংঘাতময় দৃষ্টিভঙ্গির কারণেই সামগ্রিক পরিস্থিতি আজকের এই বিপজ্জনক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তাদের নিজস্ব কৌশলগত বিশ্বাসযোগ্যতা ও অবস্থানকেই চরমভাবে দুর্বল করে তুলেছে।
ভৌগোলিক ও অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে হরমুজ প্রণালি কেবল একটি সাধারণ সামুদ্রিক জলপথ নয়, বরং এটি সমগ্র বিশ্বের জ্বালানি অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে স্বীকৃত। ওমান উপসাগর ও পারস্য উপসাগরের সংযোগস্থলে অবস্থিত এই অত্যন্ত সরু ও সংবেদনশীল সামুদ্রিক পথ দিয়ে প্রতিদিন বিশ্বের মোট ব্যবহৃত অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এবং বিপুল পরিমাণ তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস আন্তর্জাতিক বাজারে পরিবাহিত হয়ে থাকে।
বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তা, বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং শিল্পকারখানার সার্বিক সচলতা বহুলাংশে এই জলপথের অবাধ, নিরাপদ ও নিরবচ্ছিন্ন চলাচলের ওপর নির্ভরশীল। ফলশ্রুতিতে, হরমুজ প্রণালিতে যেকোনো ধরণের সামরিক অস্থিরতা, প্রতিবন্ধকতা বা নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা মুহূর্তের মধ্যে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দামে তীব্র অস্থিরতা তৈরি করে এবং বিশ্ব অর্থনীতির সামগ্রিক চাকা স্থবির করে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এই তীক্ষ্ণ ও আক্রমণাত্মক মন্তব্য এমন এক সংকটময় মুহূর্তে প্রকাশ্যে এলো, যখন হরমুজ প্রণালির আন্তর্জাতিক জলসীমায় নিয়মিত চলাচলকারী বাণিজ্যিক জাহাজের ওপর ধারাবাহিক আক্রমণ ও হয়রানির ঘটনা অব্যাহত রয়েছে।
আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা এবং গণমাধ্যমের বিভিন্ন নির্ভরযোগ্য প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইরানের ক্ষমতাধর ইসলামি বিপ্লবী গার্ড কোর বা আইআরজিসি সাম্প্রতিক দিনগুলোতে এই প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী বিভিন্ন দেশের পণ্যবাহী নৌযান ও তেলবাহী ট্যাংকারের ওপর নজিরবিহীনভাবে নজরদারি বৃদ্ধি করেছে।
বিভিন্ন সময়ে ড্রোন হামলা, ক্ষুদ্র বোটে করে আক্রমণ, ক্ষেপণাস্ত্রের ভয় দেখানো কিংবা সরাসরি কমান্ডো অভিযানের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক জলসীমা থেকে বাণিজ্যিক জাহাজ আটক করার ঘটনা ঘটেছে। আইআরজিসির এই অব্যাহত তৎপরতা আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক আইন ও স্বাধীনভাবে নৌচলাচলের মৌলিক অধিকারের চরম লঙ্ঘন বলে আন্তর্জাতিক মহলে তীব্র নিন্দার মুখে পড়েছে।
মার্কো রুবিও তার সংবাদ সম্মেলনে বিস্তারিত ব্যাখ্যা দিয়ে বলেন যে, আন্তর্জাতিক জলপথে নিরস্ত্র বাণিজ্যিক জাহাজের ওপর এই ধরণের বেপরোয়া ও আগ্রাসী আক্রমণ মূলত কোনো শক্তিশালী সামরিক সক্ষমতার পরিচায়ক নয়, বরং এটি ইরানের কর্তৃত্ব হারানোর গভীর হতাশার বহিঃপ্রকাশ।
তিনি উল্লেখ করেন, হরমুজ প্রণালিতে যৌথ আন্তর্জাতিক নজরদারি, মার্কিন নৌবাহিনীর সতর্ক উপস্থিতি এবং আঞ্চলিক অংশীদারদের সমন্বিত নিরাপত্তা কাঠামোর কারণে ইরান আর আগের মতো নিজের ইচ্ছেমতো পুরো প্রণালিকে এককভাবে নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা রাখে না।
ওয়াশিংটন ও তার মিত্ররা এই আন্তর্জাতিক নৌপথের নিরাপত্তা সুসংহত করতে নিজেদের উপস্থিতি আগের চেয়ে বহুগুণ বৃদ্ধি করেছে। এর ফলে আন্তর্জাতিক মহলে তেহরানের একচ্ছত্র প্রভাব বিস্তার করার প্রচেষ্টা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে এবং তারা নিজেদের নিয়ন্ত্রণ অক্ষুণ্ণ রাখতে এক অসম ও বিচ্ছিন্ন লড়াইয়ে অবতীর্ণ হতে বাধ্য হচ্ছে।
হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে সৃষ্টি হওয়া এই সামরিক ও ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তা বিশ্ববাণিজ্যে এক দীর্ঘস্থায়ী এবং বহুমুখী নেতিবাচক প্রভাবের জন্ম দিচ্ছে। সামুদ্রিক চলাচলের এই সংবেদনশীল রুটে নিরাপত্তার ঝুঁকি আকাশচুম্বী হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজ ও কনটেইনারগুলোর ওপর যুদ্ধঝুঁকি বাবদ বিমা প্রিমিয়াম অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে।
এর প্রত্যক্ষ পরিণতি হিসেবে সামগ্রিক পরিবহন ব্যয় বহুগুণ বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা বিশ্বজুড়ে খাদ্যদ্রব্য, শিল্পপণ্য ও কাঁচামালের আমদানি খরচ বাড়িয়ে দিচ্ছে এবং সাধারণ ভোক্তাদের ওপর অতিরিক্ত মূল্যস্ফীতির চাপ সৃষ্টি করছে।
বড় বড় আন্তর্জাতিক শিপিং কোম্পানিগুলো এখন হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে আফ্রিকার উত্তমাশা অন্তরীপ দিয়ে দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়ার কথা গুরুত্বের সাথে ভাবছে। এর ফলে বিশ্ব সরবরাহ চেইনে ব্যাপক বিলম্ব ও অপচয় সৃষ্টি হচ্ছে, যা বিশ্বের ভঙ্গুর অর্থনীতিকে আরও গভীর সংকটের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যকার এই ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা কেবল একটি সংকীর্ণ জলপথের নিয়ন্ত্রণসংক্রান্ত দ্বন্দ্বের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, বরং এটি মধ্যপ্রাচ্যের সার্বিক ক্ষমতার ভারসাম্য পুনর্বিন্যাসের একটি দীর্ঘমেয়াদি ভূরাজনৈতিক লড়াইয়ের অংশ।
একদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার মিত্রদের সুরক্ষা এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির স্থায়িত্ব রক্ষার অজুহাতে উপসাগরীয় এলাকায় নিজেদের সামরিক আধিপত্য টিকিয়ে রাখতে চাইছে, অন্যদিকে ইরান এটিকে তাদের সীমানার নিকটে বিদেশি শক্তির অনাকাঙ্ক্ষিত অনুপ্রবেশ এবং জাতীয় সার্বভৌমত্বের জন্য প্রত্যক্ষ হুমকি হিসেবে বিবেচনা করছে।
ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে ইরানের নিয়ন্ত্রণ হারানোর যে দাবি করা হয়েছে, তা তেহরানের ওপর সামরিক ও মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টি করার একটি সুপরিকল্পিত কূটনৈতিক চাল হতে পারে। তবে এই ধরণের দাবির বিপরীতে ইরান যদি আরও আক্রমণাত্মক কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করে, তবে তা পুরো মধ্যপ্রাচ্যকে এক সর্বাত্মক ও বিধ্বংসী আঞ্চলিক সংঘাতের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যেতে পারে।
বর্তমান বৈশ্বিক বাস্তবতায় যখন পারস্পরিক সংঘাতের পরিধি ক্রমশ বিস্তৃত হচ্ছে, তখন হরমুজ প্রণালির মতো একটি সংবেদনশীল অঞ্চলে উত্তেজনা বৃদ্ধি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জন্য এক চরম আশঙ্কার বার্তা বহন করে।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সাম্প্রতিক বক্তব্য এটি স্পষ্ট করে দেয় যে, আন্তর্জাতিক এই মহাসড়কের ওপর কোনো নির্দিষ্ট আঞ্চলিক শক্তির একাধিপত্য বা আধিপত্যবাদী আচরণ মেনে নিতে পশ্চিমারা প্রস্তুত নয়। তবে কেবল কঠোর সামরিক অবস্থান কিংবা বাগাড়ম্বরপূর্ণ বিবৃতি দিয়ে এই সংবেদনশীল সমুদ্রপথের দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়।
আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, একটি টেকসই সমাধানে পৌঁছানোর জন্য উভয় পক্ষকেই সংযম প্রদর্শন করতে হবে, আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক আইনের প্রতি শ্রদ্ধা দেখাতে হবে এবং পুনরায় কার্যকর কূটনৈতিক আলোচনার টেবিলে ফিরে আসতে হবে। হরমুজ প্রণালির ভবিষ্যৎ স্থিতিশীলতা কেবল মধ্যপ্রাচ্যের শান্তির ওপরই নির্ভর করছে না, বরং সমগ্র বিশ্বের অর্থনৈতিক নিরাপত্তার সাথেও এটি ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে রয়েছে।