বুধবার, সেপ্টেম্বর ৩০, ২০২৬
১৫ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

গুগলের প্রধান সুন্দর পিচাইকে ‘দানব’ আখ্যা দিলেন ট্রাম্প

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ৩০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০৭:১০ পিএম

গুগলের প্রধান সুন্দর পিচাইকে ‘দানব’ আখ্যা দিলেন ট্রাম্প
ছবি: সংগৃহীত

বর্তমান বিশ্বের প্রযুক্তিগত উৎকর্ষের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নিরাপদ বিকাশ ও ব্যবহার নিশ্চিত করতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাজধানী ওয়াশিংটন ডিসির প্রেসিডেন্ট কার্যালয় হোয়াইট হাউসে এক ঐতিহাসিক ও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে।

 

মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিশেষ আমন্ত্রণে এই শীর্ষ সম্মেলনে মিলিত হন বিশ্বখ্যাত প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তারা। এই উচ্চপর্যায়ের প্রশাসনিক বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন গুগল-এর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সুন্দর পিচাই, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম মেটা-এর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মার্ক জাকারবার্গ এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা গবেষণাধর্মী প্রতিষ্ঠান অ্যানথ্রপিক-এর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা দারিও আমোদেইসহ প্রযুক্তি খাতের অন্যান্য প্রভাবশালী শীর্ষ নেতৃত্ব।

 

এই বৈঠকের মূল আলোচ্য বিষয় ছিল অত্যাধুনিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবস্থার সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, এর ওপর রাষ্ট্রীয় ও প্রাতিষ্ঠানিক নজরদারি জোরদার করা এবং প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে একটি নতুন ও ঐকমত্যভিত্তিক স্বেচ্ছামূলক নীতিগত চুক্তি স্বাক্ষর করা, যাতে করে এই শক্তিশালী প্রযুক্তির কোনো নেতিবাচক বা ধ্বংসাত্মক প্রয়োগ মানবসভ্যতার জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়াতে না পারে।

 

বৈঠক শেষে হোয়াইট হাউসের পশ্চিমাঞ্চলীয় শাখার বাইরে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে একটি চমকপ্রদ ও কৌতুকপূর্ণ ঘটনার অবতারণা হয়। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ভারতের অন্যতম প্রভাবশালী গণমাধ্যম টাইমস অব ইন্ডিয়ার একটি বিস্তৃত সংবাদ প্রতিবেদনে এই ঘটনার চমৎকার বিবরণ অত্যন্ত নিখুঁতভাবে তুলে ধরা হয়েছে।

 

গণমাধ্যমকর্মীদের সামনে গুগলের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সুন্দর পিচাইকে আনুষ্ঠানিকভাবে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার সময় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অত্যন্ত হাস্যোজ্জ্বল ভঙ্গিতে তাকে ‘দানব’ বা ভয়ংকর ক্ষমতাবান হিসেবে অভিহিত করেন।

 

তবে এই শব্দটি কোনো নেতিবাচক বা আক্রমণাত্মক অর্থে ব্যবহৃত হয়নি, বরং বিশ্বজুড়ে প্রযুক্তি খাতে সুন্দর পিচাইয়ের অসামান্য অবদান, বিশাল কাঠামোগত প্রভাব এবং ঈর্ষণীয় সাফল্যের চূড়ান্ত প্রশংসা করতেই ট্রাম্প এই বিশেষ রূপক শব্দটি ব্যবহার করেছেন।

 

ট্রাম্প উপস্থিত সাংবাদিকদের উদ্দেশ্যে পিচাইয়ের অসীম মেধা ও প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতার ইঙ্গিত দিয়ে বলেন, ‘এই লোকটি আসলে একজন দানব, কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো এই চরম সত্যটি কেউ সেভাবে জানে না।’ ট্রাম্পের এই কৌতুকপূর্ণ মন্তব্য মুহূর্তের মধ্যেই উপস্থিত সাংবাদিক ও প্রযুক্তি নির্বাহীদের মধ্যে এক হালকা ও আনন্দঘন পরিবেশের সৃষ্টি করে।

 

শীর্ষ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে স্বাক্ষরিত নতুন এই স্বেচ্ছামূলক চুক্তির পটভূমি, বাধ্যবাধকতা ও ভবিষ্যৎ কার্যকারিতা নিয়ে গুগলের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সুন্দর পিচাই অত্যন্ত গঠনমূলক ও তথ্যবহুল বক্তব্য প্রদান করেন।

 

তিনি গণমাধ্যমকর্মীদের উদ্দেশ্যে বিস্তারিত ব্যাখ্যা করেন যে, আগামী দিনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তির উন্নয়নের ক্ষেত্রে প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো তাদের ব্যবসার অন্যান্য অত্যন্ত সংবেদনশীল ও গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রগুলোতে যেসব প্রতিষ্ঠিত ও সর্বজনস্বীকৃত প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসন পদ্ধতি ব্যবহার করে থাকে, ঠিক একইভাবে এই নতুন প্রযুক্তির ক্ষেত্রেও সেই একই ধরনের কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা প্রয়োগ করা হবে।

 

সাংবাদিকদের তিনি আরও পরিষ্কার করে বলেন, ‘আমরা আমাদের প্রযুক্তি বিকাশের ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট কিছু পরীক্ষিত প্রক্রিয়া এবং কঠোর নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা গ্রহণ করতে যাচ্ছি। উদাহরণস্বরূপ, একটি বৃহৎ কোম্পানির আর্থিক ব্যবস্থাপনায় যেমন চুলচেরা আর্থিক নিয়ন্ত্রণ ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা হয়, আমরা ঠিক সেই একই রকম পরিচিত ও সময়ের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ সর্বোত্তম পদ্ধতিগুলো ভবিষ্যৎ অতি-বুদ্ধিমত্তার উন্নয়নের ক্ষেত্রেও নির্দ্বিধায় প্রয়োগ করছি।’

 

বৈঠকে উপস্থিত মেটা-এর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মার্ক জাকারবার্গ এই চুক্তির প্রায়োগিক দিক ও সার্বিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে বিশদ আলোচনা করেন। তিনি জানান যে, এই নতুন চুক্তিতে প্রতিটি কোম্পানির ভেতরে অত্যন্ত শক্তিশালী ও স্বয়ংক্রিয় অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।

 

পাশাপাশি, অত্যাধুনিক এই প্রযুক্তিতে যদি কোনো ধরনের অপ্রত্যাশিত সমস্যা বা নিরাপত্তাজনিত ত্রুটি দেখা দেয়, তবে তা যেন মুহূর্তের মধ্যে স্বয়ংক্রিয়ভাবে শনাক্ত করা যায়, সে বিষয়েও বেশ কিছু কঠোর নীতি ও অপরিবর্তনীয় অঙ্গীকার এই চুক্তিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

 

জাকারবার্গ অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে নিশ্চিত করেন যে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবস্থার ওপর এখন থেকে আর কোনো একক বা শিথিল নজরদারি থাকবে না, বরং তা একাধিক স্তরে বা বহুস্তরীয় কাঠামোর মাধ্যমে সার্বক্ষণিক কঠোর নজরদারির আওতায় থাকবে।

 

এই বহুস্তরীয় কাঠামোর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত থাকবে প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব বিশেষজ্ঞদের দ্বারা পরিচালিত অভ্যন্তরীণ ঝুঁকি পর্যালোচনা, সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ বাইরের বিশেষজ্ঞ প্রতিষ্ঠান দিয়ে নিয়মিত নিরীক্ষা কার্যক্রম এবং কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদের মাধ্যমে স্বাধীন ও বস্তুনিষ্ঠ পর্যালোচনা।

 

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার এই বিশাল সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে এবং বৈশ্বিক প্রযুক্তি প্রতিযোগিতায় যুক্তরাষ্ট্রের একচ্ছত্র আধিপত্য বজায় রাখতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গত কয়েক মাস ধরে দেশজুড়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা অবকাঠামো সম্প্রসারণের পক্ষে অত্যন্ত জোরালো অবস্থান নিয়ে আসছেন।

 

তার এই সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার অংশ হিসেবে বর্তমানে সমগ্র যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে বিশাল আকারের তথ্যভাণ্ডার কেন্দ্র নির্মাণের কাজ অত্যন্ত দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার জটিল গাণিতিক সমস্যা সমাধান এবং বিপুল তথ্য বিশ্লেষণের জন্য অপরিমেয় শক্তির প্রয়োজন হয়, যা কেবল এই ধরনের অত্যাধুনিক তথ্যভাণ্ডার কেন্দ্রের মাধ্যমেই পূরণ করা সম্ভব।

 

তবে বিশাল কাঠামোর প্রযুক্তিগত এই অবকাঠামোর দ্রুত সম্প্রসারণ নিয়ে মার্কিন রাজনৈতিক অঙ্গনে এবং সাধারণ নাগরিকদের মধ্যে তীব্র মিশ্র প্রতিক্রিয়া ও বিতর্ক লক্ষ্য করা গেছে। বিপুল পরিমাণ বিদ্যুতের ব্যবহার এবং এর ফলে সৃষ্ট নেতিবাচক পরিবেশগত প্রভাবের কথা বিবেচনা করে ট্রাম্পের এই উদ্যোগটি তার নিজ দলের সমর্থক এবং বিরোধী রাজনৈতিক শিবির-উভয় পক্ষ থেকেই কড়া সমালোচনার সম্মুখীন হয়েছে।

 

অবকাঠামোগত এই সমালোচনার জবাব দিতে গিয়ে হোয়াইট হাউসের বাইরে সমবেত সাংবাদিকদের সামনে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তথ্যভাণ্ডার কেন্দ্রগুলোর অর্থনৈতিক ও কাঠামোগত ইতিবাচক দিকগুলো অত্যন্ত সাবলীল ও জোরালোভাবে তুলে ধরেন।

 

তিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন যে, এই বিশাল তথ্যভাণ্ডার কেন্দ্রগুলো কেবল প্রযুক্তির উৎকর্ষই সাধন করবে না, বরং এগুলো স্থানীয় সম্প্রদায়ের জন্য বিপুল কর্মসংস্থান, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি এবং উন্নত অবকাঠামোগত সুবিধা তৈরি করার ক্ষেত্রে বৈপ্লবিক ভূমিকা পালন করবে।

 

আবাসন খাতে নিজের দীর্ঘ ও সফল ক্যারিয়ারের অমূল্য অভিজ্ঞতার কথা স্মরণ করে ট্রাম্প অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলেন, ‘আরেকটা কথা আপনাদের অত্যন্ত পরিষ্কার করে বলি, আবাসন খাত সম্পর্কে আমার চেয়ে ভালো ধারণা খুব কম মানুষেরই আছে।

 

আপনারা যদি ওই নবনির্মিত ভবনগুলোর দিকে তাকান, তবে দেখতে পাবেন সেগুলোর কিছু অংশ একেবারেই অসাধারণ ও দৃষ্টিনন্দন। এগুলো কেবল আকারে বড়, কাঠামোগত দিক দিয়ে শক্তিশালী ও ক্ষমতাবান ভবনই নয়, বরং এগুলো স্থাপত্যশৈলীর দিক থেকেও অত্যন্ত সুন্দর।

 

এগুলো যখন কোনো একটি নির্দিষ্ট এলাকায় নির্মিত হয়, তখন তা ওই এলাকার সার্বিক উন্নয়নে অনেক কিছু যোগ করে।’ হোয়াইট হাউসে অনুষ্ঠিত এই উচ্চপর্যায়ের প্রশাসনিক বৈঠক এবং প্রযুক্তি বিশ্বের শীর্ষ নির্বাহীদের সম্মিলিত এই উদ্যোগ সুস্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অভাবনীয় শক্তিকে মানুষের কল্যাণে ব্যবহার করার জন্য রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারক এবং প্রযুক্তি নির্মাতারা এখন একযোগে কাজ করতে সম্পূর্ণভাবে বদ্ধপরিকর।

 

স্বেচ্ছামূলক এই নীতিগত চুক্তিটি আগামী দিনে বৈশ্বিক প্রযুক্তি শিল্পের জন্য একটি আদর্শ মানদণ্ড হিসেবে কাজ করবে বলে আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি বিশ্লেষকরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন। একদিকে যেমন অতি-বুদ্ধিমত্তার অভাবনীয় বিকাশের পথে নতুন নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হচ্ছে, অন্যদিকে এর নেতিবাচক প্রভাব ও সম্ভাব্য মারাত্মক ঝুঁকিগুলো কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে মানবজাতির জন্য একটি সম্পূর্ণ নিরাপদ, স্বচ্ছ ও সুরক্ষিত প্রযুক্তিগত ভবিষ্যৎ নির্মাণের মজবুত ভিত রচিত হচ্ছে।

 

- টাইমস অব ইন্ডিয়ার