শনিবার, সেপ্টেম্বর ২৬, ২০২৬
১১ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থা এফবিআইয়ের তথ্যভাণ্ডারে ভয়াবহ সাইবার হামলা

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০৮:১১ পিএম

যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থা এফবিআইয়ের তথ্যভাণ্ডারে ভয়াবহ সাইবার হামলা
ছবি : Collected

বিশ্বজুড়ে নিরাপত্তার শীর্ষ পাহারাদার হিসেবে পরিচিত যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থা বা এফবিআই এক নজিরবিহীন ও ভয়াবহ সাইবার হামলার শিকার হয়েছে। সংস্থাটির অত্যন্ত সুরক্ষিত সিস্টেমে অনুপ্রবেশ করে বিপুলসংখ্যক বর্তমান ও সাবেক কর্মীর ব্যক্তিগত এবং স্পর্শকাতর তথ্য হাতিয়ে নেওয়ার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।

 

এই অপ্রত্যাশিত নিরাপত্তা লঙ্ঘনের ঘটনায় সংস্থাটির অভ্যন্তরে চরম আতঙ্ক, ক্ষোভ ও ব্যাপক উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে যেসব গোয়েন্দা বা এজেন্ট অত্যন্ত গোপনীয়তার সঙ্গে ছদ্মবেশে কাজ করছেন, তাদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এক ভয়াবহ শঙ্কা তৈরি হয়েছে।

 

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের বিশ্লেষণে এটিকে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার ইতিহাসের অন্যতম বড় ব্যর্থতা হিসেবে দেখা হচ্ছে। চাঞ্চল্যকর এই সাইবার হামলার দায় স্বীকার করেছে ‘শাইনি হান্টার্স’ নামের একটি সাইবার অপরাধী গোষ্ঠী।

 

হ্যাকার চক্রটি দাবি করেছে যে, তারা গত সোমবার এফবিআইয়ের মূল নেটওয়ার্ক সিস্টেমে সফলভাবে অনুপ্রবেশ করে বিপুল পরিমাণ গোপনীয় তথ্য চুরি করেছে। গোষ্ঠীটি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছে, তাদের নির্দিষ্ট দাবি অবিলম্বে মেনে নেওয়া না হলে আগামী চার দিনের মধ্যে তারা চুরি করা সম্পূর্ণ ডেটাবেস ও সকল গোপনীয় নথি উন্মুক্ত করে দেবে।

 

সাধারণত এমন হামলার পর হ্যাকাররা বিশাল অঙ্কের মুক্তিপণ দাবি করে থাকে। কিন্তু শাইনি হান্টার্স কোনো আর্থিক দাবি করেনি। এর পরিবর্তে তারা দাবি জানিয়েছে, গত মে মাসে এফবিআই এই হ্যাকার গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে যে সতর্কতামূলক বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেছিল, তা যেন প্রত্যাহার করা হয়।

 

হ্যাকারদের দাবি, ওই বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে তাদের চরমভাবে ‘অপমান’ করা হয়েছে। চুরি যাওয়া এই বিশাল তথ্যভাণ্ডারে কী ধরনের তথ্য রয়েছে, তা নিয়ে ইতিমধ্যেই অনুসন্ধান শুরু হয়েছে। শাইনি হান্টার্স তাদের দাবির সত্যতা প্রমাণের জন্য চুরি করা নথির কিছু নমুনা সাংবাদিকদের কাছে পাঠিয়েছে।

 

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি এই নমুনাগুলো পর্যবেক্ষণ করে জানিয়েছে, এগুলো এফবিআইয়ের প্রকৃত তথ্য বলেই মনে হচ্ছে। নমুনায় কর্মকর্তাদের পূর্ণাঙ্গ নাম, ঠিকানা, ব্যক্তিগত ফোন নম্বর, ব্যাজ নম্বর, পদবি এবং তাদের স্বামী বা স্ত্রীর ব্যক্তিগত তথ্য স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে।

 

এছাড়া হাজার হাজার বিশেষ এজেন্টের অত্যন্ত সংবেদনশীল চিকিৎসা-সংক্রান্ত তথ্য হ্যাকারদের হাতে চলে যাওয়ার মারাত্মক দাবি করা হয়েছে। বিবিসি চুরি হওয়া ‘ফিটনেস-ফর-ওয়ার্ক’ বা কাজের যোগ্যতার চিকিৎসাজনিত পরীক্ষার কিছু নথি খতিয়ে দেখেছে।

 

এসব নথিতে কর্মকর্তাদের রক্ত ও প্রস্রাব পরীক্ষার ফলাফল, চিকিৎসকের মন্তব্য এবং শারীরিক সমস্যার পুঙ্খানুপুঙ্খ তথ্য লিপিবদ্ধ রয়েছে। এমনকি অ্যালার্জির সমস্যা, প্রস্রাবে রক্ত যাওয়া এবং উচ্চ কোলেস্টেরলের মতো ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যগত তথ্যও নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

 

নজিরবিহীন এই ঘটনার পর এফবিআইয়ের ভেতরে রীতিমতো ভীতিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। এফবিআইয়ের এক সাবেক সাইবার তদন্তকারী বিবিসি নিউজকে জানিয়েছেন, বর্তমান কর্মকর্তাদের অভ্যন্তরীণ গ্রুপ চ্যাটে এই হ্যাকিং নিয়ে তীব্র উদ্বেগ প্রকাশ করা হচ্ছে।

 

তাদের সবচেয়ে বড় আশঙ্কা হলো, এই ব্যক্তিগত তথ্যগুলো অনলাইনে ছড়িয়ে পড়লে বিভিন্ন অপরাধী চক্র ও শত্রুভাবাপন্ন রাষ্ট্রের হ্যাকাররা এসব ব্যবহার করে এজেন্টদের সরাসরি লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করতে পারে।

 

চুরি হওয়া তথ্য ব্যবহার করে অত্যন্ত বিশ্বাসযোগ্য ফিশিং বার্তা তৈরি করা, ডিজিটাল প্রতারণা কিংবা এজেন্টদের কাছে সরাসরি ব্ল্যাকমেইলের প্রবল আশঙ্কা করছেন গোয়েন্দা কর্মকর্তারা। বিশেষ করে যেসব এজেন্ট অতীতে দুর্ধর্ষ সাইবার অপরাধীদের বিরুদ্ধে তদন্ত করেছেন, তাদের বিরুদ্ধে এখন সরাসরি প্রতিশোধমূলক হয়রানি বা হামলার মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

 

শুধু ডিজিটাল হয়রানিই নয়, শারীরিক নিরাপত্তার বিষয়টিও এখন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। ওই সাবেক কর্মকর্তা আরও উল্লেখ করেছেন, বর্তমান কর্মীদের অভ্যন্তরীণ আলোচনায় ‘ভায়োলেন্স-অ্যাস-এ-সার্ভিস’ বা ভাড়ায় পরিচালিত শারীরিক হামলার আশঙ্কা প্রবলভাবে উঠে এসেছে।

 

অনলাইনে সক্রিয় তরুণ অপরাধী চক্রগুলো চুরি হওয়া তথ্য ব্যবহার করে কোনো নির্দিষ্ট এজেন্টকে সরাসরি হয়রানি করতে পারে, এমনকি তাদের পরিবারের সদস্যদেরও টার্গেট করতে পারে। এ ধরনের অপরাধী গোষ্ঠীর সঙ্গে অতীতে ‘সোয়াটিং’ সহ বিভিন্ন ভয়াবহ সহিংস ঘটনার সরাসরি যোগসূত্র রয়েছে।

 

সোয়াটিং হলো এমন এক ধরনের মারাত্মক ডিজিটাল হয়রানি, যেখানে হ্যাকাররা পুলিশের জরুরি সেবায় ভুয়া তথ্য প্রদান করে কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তির বাড়িতে সশস্ত্র বিশেষ বাহিনীকে অভিযানে পাঠায়। এর ফলে যেকোনো সময় ভয়াবহ প্রাণহানির মতো ঘটনাও ঘটে যেতে পারে।

 

এই সাইবার হামলার সুদূরপ্রসারী প্রভাব কেবল ব্যক্তিগত পর্যায়েই সীমাবদ্ধ নেই, বরং এটি যুক্তরাষ্ট্রের সামগ্রিক জাতীয় নিরাপত্তার ওপরও বিশাল প্রশ্নবোধক চিহ্ন এঁকে দিয়েছে। এফবিআইয়ের সাইবার বিভাগের সাবেক উপপরিচালক সিনথিয়া কাইজার এই বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা দিয়েছেন।

 

তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, হ্যাকারদের হাতে থাকা স্পর্শকাতর তথ্যের কিছু অংশ ইতিমধ্যেই ইন্টারনেটের বিভিন্ন অনলাইন সাইবার গ্রুপে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করেছে। ফলে পুরো ডেটাবেস প্রকাশের আগেই হয়তো ক্ষয়ক্ষতি শুরু হয়ে গেছে।

 

তার মতে, এ ধরনের গোপনীয় তথ্য একবার ডার্ক ওয়েবে ছড়িয়ে পড়লে তা বছরের পর বছর ধরে সেখানে ঘুরতে থাকে। ফলে তথ্যের অপব্যবহারের ঝুঁকি দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। সবচেয়ে ভয়ংকর দিকটি হলো, বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থাগুলো এসব তথ্য ব্যবহার করে এফবিআই কর্মকর্তাদের নিয়োগ দেওয়া বা তাদের প্রভাবিত করার অপচেষ্টা চালাতে পারে, যা জাতীয় নিরাপত্তার জন্য এক চরম বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।

 

আতঙ্কের পাশাপাশি এফবিআইয়ের ভেতরে এখন চরম ক্ষোভ বিরাজ করছে। প্রযুক্তিগত দিক থেকে ঘটনাটি সংস্থাটির জন্য এক নজিরবিহীন বিব্রতকর অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে। কারণ, হামলাকারী গোষ্ঠী শাইনি হান্টার্সকে সাইবার দুনিয়ায় সাধারণত অত্যন্ত উচ্চপর্যায়ের বা অত্যাধুনিক হ্যাকিং গোষ্ঠী হিসেবে বিবেচনা করা হয় না।

 

একজন সাবেক ক্ষুব্ধ সাইবার এজেন্ট তীব্র সমালোচনা করে বলেছেন, এফবিআইয়ের নিজস্ব নেটওয়ার্কে সম্পূর্ণ অগোছালো ও অবহেলাজনিত নিরাপত্তা ব্যর্থতার কারণেই এই চক্রটি এত বিশাল পরিমাণ তথ্য চুরির সুযোগ পেয়েছে।

 

আরেকজন সাবেক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা আক্ষেপ করে বলেন, বিশ্বের অন্যতম সম্পদশালী ও প্রতাপশালী একটি আইন প্রয়োগকারী সংস্থার নিজস্ব সিস্টেমে এমন ভয়াবহ দুর্বলতা থাকতে পারে-এটি শুধু বিস্ময়করই নয়, চরমভাবে উদ্বেগজনক।

 

দীর্ঘ গুঞ্জনের পর এফবিআই গত বুধবার আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করেছে যে তাদের মূল সিস্টেমে নিরাপত্তা লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটেছে। সংস্থাটি জানিয়েছে, কীভাবে এই ঘটনা ঘটেছে তা খুঁজে বের করতে তারা অত্যন্ত আগ্রাসীভাবে তদন্ত পরিচালনা করছে।

 

তবে সংবাদমাধ্যম বিবিসি এই ঘটনার বিস্তারিত কারিগরি দিক নিয়ে যেসব প্রশ্ন এফবিআইয়ের কাছে পাঠিয়েছিল, সংস্থাটি সেগুলোর সরাসরি জবাব দেওয়া থেকে বিরত থেকেছে। এদিকে, হ্যাকারদের হুমকি অনুযায়ী সকল তথ্য প্রকাশ করে দেওয়া হলে পরিস্থিতি কীভাবে সামাল দেওয়া হবে, তা নিয়ে কর্মকর্তাদের মধ্যেও বিভ্রান্তি রয়েছে।

 

প্রাতিষ্ঠানিক নির্দেশনায় কর্মীদের ব্যক্তিগত তথ্য বিভিন্ন ডেটা-ব্রোকার ওয়েবসাইট থেকে মুছে ফেলতে ‘ডিলিটমি’ নামের একটি সেবার ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু একজন সাবেক সাইবার তদন্তকারী এই পদক্ষেপকে উপহাস করে বলেছেন, এত বড় মাপের ঝুঁকির তুলনায় এ ধরনের সাধারণ পদক্ষেপ একেবারেই অপ্রতুল।

 

শাইনি হান্টার্সের অতীত রেকর্ড ঘাঁটলে দেখা যায়, এরা সাইবার জগতে নতুন নয়। অতীতে তারা রকস্টার গেমস এবং শিক্ষাবিষয়ক প্ল্যাটফর্ম ক্যানভাসসহ একাধিক বৃহৎ প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজিমূলক সাইবার হামলার সঙ্গে যুক্ত ছিল।

 

গোষ্ঠীটির সদস্যরা নিয়মিত মেসেজিং অ্যাপ টেলিগ্রামে সাংবাদিকদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করে নিজেদের সাইবার হামলার সাফল্য নিয়ে গর্ব করে থাকে। এক সাবেক এফবিআই কর্মকর্তা আক্ষেপ করে বলেন, সংস্থাটি আজ কিশোর বয়সী সাইবার অপরাধীদের মোকাবিলায় কী করবে, তা নিয়েই সংকটে পড়েছে।

 

তবে সাবেক এফবিআই কর্মকর্তা মাইকেল ম্যাকফারসন বিশ্বাস করেন, সংস্থাটি ঘটনাটিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে। তার মতে, এফবিআই খুব শিগগিরই তাদের বিস্তৃত অংশীদার নেটওয়ার্ক ও বিপুল সম্পদ কাজে লাগিয়ে এই নজিরবিহীন হামলার জন্য দায়ীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা করবে।

 

সাইবার বিশেষজ্ঞ সিনথিয়া কাইজারও সতর্ক করে বলেছেন, হ্যাকাররা অত্যন্ত বেপরোয়া আচরণ করেছে এবং এর পরিণতি হিসেবে তাদের বিরুদ্ধে এফবিআই খুব দ্রুত সময়ের মধ্যে এক ব্যাপক অভিযান চালাতে পারে।

 

- বিবিসি