মধ্যপ্রাচ্যে চলমান রক্তক্ষয়ী সংঘাত, গাজায় মানবিক বিপর্যয় এবং আন্তর্জাতিক মহলের অব্যাহত তীব্র সমালোচনার আবহে ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রীর এই সফরটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
সার্বিক পরিস্থিতি, নিরাপত্তা ঝুঁকি এবং ব্যাপক বিক্ষোভের আশঙ্কায় নেতানিয়াহুর যুক্তরাষ্ট্র সফরটি আগের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে সংক্ষিপ্ত করার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে ইসরাইলি প্রশাসন।
একই সঙ্গে, নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং সম্ভাব্য অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি এড়াতে নিউইয়র্কের মাটি স্পর্শ করার আগেই তার ভ্রমণ পরিকল্পনায় আনা হয়েছে ব্যাপক রদবদল, যা আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রীর এই সংক্ষিপ্ত এবং চরম সতর্কতামূলক সফরের সবচেয়ে আলোচিত দিকটি হচ্ছে তার সরকারি উড়োজাহাজের অবতরণস্থলের আকস্মিক পরিবর্তন। পূর্বনির্ধারিত পরিকল্পনা অনুযায়ী তার বহনকারী বিশেষ সরকারি বিমান ‘উইং অব জিওন’-এর নিউইয়র্কের জন এফ কেনেডি (জেএফকে) আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করার কথা ছিল।
কিন্তু সর্বশেষ কূটনৈতিক ও নিরাপত্তাজনিত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, বিমানটি জেএফকে বিমানবন্দরে অবতরণ করবে না বলে জানানো হয়েছে। নিউইয়র্কের মতো একটি ব্যস্ত এবং রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল শহরে ইসরাইলি সরকারপ্রধানের বিমান অবতরণ করা নিয়ে ব্যাপক নিরাপত্তা ঝুঁকি রয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
জন এফ কেনেডি বিমানবন্দরের পরিবর্তে বিকল্প হিসেবে এখন নেতানিয়াহুর বিমানটি পার্শ্ববর্তী অঙ্গরাজ্য নিউ জার্সির একটি সুরক্ষিত সামরিক ঘাঁটিতে অথবা নেওয়ার্ক লিবার্টি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
একটি দেশের সরকারপ্রধানের জন্য সাধারণ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের বদলে সামরিক ঘাঁটি ব্যবহারের এই বিবেচনা থেকেই স্পষ্ট হয় যে, তার এই সফরটি কতটা ঝুঁকিপূর্ণ এবং স্পর্শকাতর। এই আকস্মিক স্থান পরিবর্তনের নেপথ্যে সবচেয়ে বড় কারণ হিসেবে নিউইয়র্কের প্রভাবশালী রাজনীতিক জোহরান মামদানির সম্ভাব্য পদক্ষেপ ও কঠোর হুঁশিয়ারিকে দায়ী করা হচ্ছে।
ফিলিস্তিনপন্থী অবস্থান এবং মানবাধিকার ইস্যুতে সোচ্চার জোহরান মামদানি এর আগে প্রকাশ্যে ইসরাইলি নীতির তীব্র সমালোচনা করেছেন। ইসরাইলি কর্তৃপক্ষের মধ্যে গভীর উদ্বেগ রয়েছে যে, যুক্তরাষ্ট্রের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয়ের সামান্যতম জটিলতা দেখা দিলে অথবা নেতানিয়াহুর বিমানটি নিউইয়র্কের সীমানায় অবস্থান করলে মামদানি তার রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রভাব খাটিয়ে সেটিকে দ্রুত উড্ডয়নের নির্দেশ দিতে পারেন।
এমন কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি তৈরি হলে তা ইসরাইলের জন্য চরম অবমাননাকর হবে। মূলত এই রাজনৈতিক চাপ এবং সম্ভাব্য প্রশাসনিক জটিলতা এড়াতেই জেএফকে বিমানবন্দরকে এড়িয়ে চলার এই কৌশলগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি) কর্তৃক ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে জারি করা সম্ভাব্য গ্রেপ্তারি পরোয়ানার বিষয়টি এই সফরকে আরও বেশি উত্তেজনাপূর্ণ ও জটিল করে তুলেছে। নিউইয়র্কের রাজনীতিক জোহরান মামদানি সম্প্রতি এই গ্রেপ্তারি পরোয়ানা প্রসঙ্গে অত্যন্ত জোরালো বক্তব্য রেখেছেন।
তিনি নেতানিয়াহুকে আন্তর্জাতিক আইনের আওতায় আনার পক্ষে নিজের দৃঢ় অবস্থান ব্যক্ত করেছেন। তবে মামদানি নিজেই আইনগত বাস্তবতার কথা স্বীকার করে স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে, নিউইয়র্ক শহরের নিজস্ব কর্তৃপক্ষের পক্ষে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের ওই পরোয়ানা কার্যকর করার কোনো আইনি ক্ষমতা বা এখতিয়ার নেই।
এই ধরনের আন্তর্জাতিক পরোয়ানা কার্যকর করার জন্য সম্পূর্ণভাবে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল সরকার বা কেন্দ্রীয় প্রশাসনের সরাসরি ভূমিকা ও অনুমোদন প্রয়োজন। তা সত্ত্বেও, স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের এই ধরনের প্রকাশ্য বৈরিতা নেতানিয়াহুর সফরের জন্য একটি বড় মনস্তাত্ত্বিক ও নিরাপত্তাজনিত বাধা তৈরি করেছে।
নিরাপত্তা শঙ্কা এবং বিক্ষোভের আশঙ্কায় নেতানিয়াহুর সম্পূর্ণ সফরসূচি ব্যাপকভাবে কাটছাঁট করা হয়েছে। সংশোধিত ও সংক্ষিপ্ত সময়সূচি অনুযায়ী, ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রীর বহনকারী বিমানটি বৃহস্পতিবার সকালে যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে পৌঁছানোর কথা রয়েছে।
এরপর সেদিনই স্থানীয় সময় দুপুর ২টায় নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের মূল অধিবেশনে বিশ্বনেতাদের উদ্দেশে তার অত্যন্ত প্রতীক্ষিত ভাষণ দেওয়ার কথা রয়েছে। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলোর তথ্য অনুযায়ী, ভাষণ প্রদানের পর নেতানিয়াহু যুক্তরাষ্ট্রে আর কোনো অতিরিক্ত সময় ব্যয় করবেন না।
জাতিসংঘের আনুষ্ঠানিকতা শেষ হওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তিনি পুনরায় তার বিশেষ বিমানে চড়ে ইসরাইলের উদ্দেশে ফিরতি যাত্রা শুরু করবেন। অর্থাৎ, নিরাপত্তাজনিত সতর্কতার অংশ হিসেবে তিনি নিউইয়র্ক শহরে কোনো রাত কাটাবেন না, যা রাষ্ট্রনেতাদের সাধারণ সফরসূচির তুলনায় অনেকটাই ব্যতিক্রমী।
এর আগে, নেতানিয়াহুর এই সফরের অংশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস অঙ্গরাজ্যে যাওয়ার একটি বিশেষ পরিকল্পনা ছিল। সেখানে গিয়ে বিশ্বখ্যাত মার্কিন প্রযুক্তি উদ্যোক্তা ও বিলিয়নিয়ার ইলন মাস্কের সঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে মিলিত হওয়ার কথা ছিল তার।
কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই পূর্বনির্ধারিত কর্মসূচিও সম্পূর্ণ বাতিল করা হয়েছে। কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানিয়েছে, নেতানিয়াহুর বিমানে জ্বালানি নেওয়ার জন্য টেক্সাসে অবতরণ করার কথা থাকলেও, যুক্তরাষ্ট্রের কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে শেষ মুহূর্তে প্রয়োজনীয় লজিস্টিক সহায়তা ও সমন্বয় নিশ্চিত না করার কারণেই সম্ভবত বৈঠকটি বাতিল করতে বাধ্য হয়েছে ইসরাইলি প্রতিনিধিদল।
এছাড়া দেশজুড়ে ফিলিস্তিনপন্থী বিক্ষোভকারীদের সম্ভাব্য ঘেরাও কর্মসূচিও এই সিদ্ধান্ত নিতে ভূমিকা রেখেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এদিকে, জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে নেতানিয়াহুর নির্ধারিত ভাষণ ঘিরেও নিউইয়র্কে নেওয়া হচ্ছে নজিরবিহীন ও কঠোর নিরাপত্তা প্রস্তুতি।
জাতিসংঘের সদর দপ্তর এবং এর আশেপাশের এলাকাগুলোকে নিরাপত্তার চাদরে ঢেকে ফেলা হয়েছে। নেতানিয়াহু তার এই গুরুত্বপূর্ণ ভাষণে মূলত মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক সংকট, ইরানের তরফ থেকে আসা ক্রমবর্ধমান পারমাণবিক ও সামরিক হুমকি এবং ইসরাইলের নিজস্ব জাতীয় নিরাপত্তা পরিস্থিতির ওপর সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব আরোপ করবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
একই সঙ্গে, আন্তর্জাতিক মঞ্চে নিজের দেশের অবস্থানকে সুদৃঢ় করতে এবং জোহরান মামদানির মতো সমালোচকদের বক্তব্যের কড়া জবাব দেওয়ারও একটি প্রচ্ছন্ন ইঙ্গিত তিনি আগেই দিয়ে রেখেছেন। নেতানিয়াহু স্পষ্টভাবেই বলেছেন যে, তিনি জাতিসংঘে দাঁড়িয়ে বুক ফুলিয়ে ইসরাইল রাষ্ট্র এবং দেশ রক্ষায় নিয়োজিত সেনাদের বীরত্বপূর্ণ অবস্থান বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরবেন।
তবে জাতিসংঘের অধিবেশনকক্ষের ভেতরের পরিস্থিতিও ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রীর জন্য খুব একটা স্বস্তিদায়ক হবে না বলে মনে করা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক মহলে ইসরাইলের বর্তমান ভাবমূর্তি এবং গাজা উপত্যকায় চলমান সামরিক অভিযানের কারণে অনেক দেশই ইসরাইলের প্রতি ক্ষুব্ধ।
এই প্রেক্ষাপটে, নেতানিয়াহু যখন বক্তব্য দেওয়ার জন্য মঞ্চে উঠবেন, তখন অধিবেশনকক্ষে তীব্র প্রতিবাদ, বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিদের সম্মিলিত বাধা সৃষ্টি, স্লোগান দেওয়া বা প্রতিবাদস্বরূপ একযোগে কক্ষ থেকে ওয়াকআউট করে বেরিয়ে যাওয়ার মতো চরম বিব্রতকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে।
ইসরাইলি প্রতিনিধিদল এই ধরনের যেকোনো বিরূপ পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার জন্য আগে থেকেই ব্যাপক মানসিক ও কূটনৈতিক প্রস্তুতি গ্রহণ করছে। সব মিলিয়ে, বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর এবারের সংক্ষিপ্ত নিউইয়র্ক সফরটি কেবল ইসরাইলের জন্যই নয়, বরং গোটা বিশ্বের কূটনৈতিক ইতিহাসের জন্যই একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল, নজিরবিহীন এবং চরম উত্তেজনাকর অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হতে যাচ্ছে।