মঙ্গলবার, সেপ্টেম্বর ২২, ২০২৬
৭ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

নিউইয়র্কে ইরানের রাষ্ট্রপতি, কেনাকাটা ও চলাফেরায় যুক্তরাষ্ট্রের নজিরবিহীন কড়া বিধিনিষেধ

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ২২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০৬:৪৩ পিএম

নিউইয়র্কে ইরানের রাষ্ট্রপতি, কেনাকাটা ও চলাফেরায় যুক্তরাষ্ট্রের নজিরবিহীন কড়া বিধিনিষেধ
ছবি : Collected

জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের বার্ষিক অধিবেশনে যোগদানের উদ্দেশ্যে একটি ক্ষুদ্র ও সুনির্দিষ্ট প্রতিনিধিদল সঙ্গে নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক শহরের মাটিতে পা রেখেছেন ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের নবনির্বাচিত রাষ্ট্রপতি মাসুদ পেজেশকিয়ান।

 

দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে চলমান চরম বৈরিতা এবং সাম্প্রতিক যুদ্ধাবস্থার মতো এক ভয়াবহ ও শ্বাসরুদ্ধকর ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যেই তাঁর এই সফর অনুষ্ঠিত হচ্ছে। আন্তর্জাতিক কূটনীতির ইতিহাসে এমন ঘটনা অত্যন্ত বিরল হলেও, এবারের অধিবেশনে ইরানের রাষ্ট্রপ্রধানের এই অংশগ্রহণ বৈশ্বিক রাজনীতিতে এক নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

 

তবে এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক সফরের সবচেয়ে আলোচিত এবং একইসঙ্গে বিস্ময়কর দিকটি হলো ইরানি প্রতিনিধিদলের ওপর মার্কিন প্রশাসনের আরোপিত নজিরবিহীন ও কঠোর সব বিধিনিষেধ।

 

যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে পা রাখার পর থেকেই ইরানের রাষ্ট্রপতি এবং তাঁর সফরসঙ্গীদের অত্যন্ত সীমিত ও নির্দিষ্ট গণ্ডির মধ্যে একপ্রকার অবরুদ্ধ অবস্থায় নিজেদের দৈনন্দিন ও কূটনৈতিক কার্যক্রম পরিচালনা করতে হচ্ছে।

 

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষস্থানীয় ও বিশ্বস্ত সংবাদমাধ্যম ওয়ালস্ট্রিট জার্নাল-এর একটি অত্যন্ত চাঞ্চল্যকর ও বিস্তারিত অনুসন্ধানী প্রতিবেদন থেকে এই কড়া বিধিনিষেধের বিষয়টি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে উন্মোচিত হয়েছে।

 

ওই প্রতিবেদনে অত্যন্ত সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, বিশ্বের অন্যান্য দেশের রাষ্ট্রপ্রধান এবং তাদের প্রতিনিধিরা নিউইয়র্কে অবস্থানকালে যেমন অবাধে পুরো শহর ঘুরে দেখার সুযোগ পান, ইরানি প্রতিনিধিদলের ক্ষেত্রে সেই সাধারণ ও প্রথাগত কূটনৈতিক সুবিধাটি সম্পূর্ণভাবে রহিত করা হয়েছে।

 

রাষ্ট্রপতি মাসুদ পেজেশকিয়ান এবং তাঁর সঙ্গীরা স্বাধীনভাবে শহরের কোথাও যাতায়াত করতে পারবেন না। এই কঠোর নির্দেশনার মাত্রা এতটাই ব্যাপক যে, তারা নিউইয়র্ক শহরের কোনো সাধারণ বিনোদনকেন্দ্র বা উদ্যানে পর্যন্ত প্রবেশের অনুমতি পাবেন না।

 

এমনকি ব্যক্তিগত বা কূটনৈতিক প্রয়োজনে পূর্বানুমতি ছাড়া সাধারণ কোনো বিপণিবিতান বা দোকানে যাওয়ার ক্ষেত্রেও তাদের ওপর কড়া আইনি নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। এর পাশাপাশি মার্কিন মাটি থেকে কোনো ধরনের বিলাসবহুল বা দামি শৌখিন পণ্য কেনাকাটা করার ওপরও সম্পূর্ণ আইনি নিষেধাজ্ঞা জারি করে রেখেছে স্বাগতিক দেশের নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্র দপ্তর।

 

কূটনৈতিক এই বিধিনিষেধের আওতা ও পরিধি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ইরানি প্রতিনিধিদলের চলাচলের পথ একেবারে সুনির্দিষ্ট এবং অত্যন্ত সীমিত করে দেওয়া হয়েছে। সংবাদমাধ্যমের নির্ভরযোগ্য তথ্য অনুযায়ী, ইরানি নেতৃত্ব কেবল তাদের নির্ধারিত আবাসিক ভবন এবং জাতিসংঘের সদরদপ্তরের মধ্যেই যাতায়াত করতে পারবেন।

 

এর বাইরে এক পা ফেলারও কোনো আইনি অধিকার তাদের দেওয়া হয়নি। জানা গেছে, নিউইয়র্কের জন এফ কেনেডি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণের পর তাদের সরাসরি ম্যানহাটন এলাকায় অবস্থিত মিলেনিয়াম হিল্টন নামের নির্দিষ্ট আবাসে নিয়ে যাওয়া হয়।

 

২০১৩ সাল থেকে জাতিসংঘের বিভিন্ন অধিবেশনে যোগ দিতে আসা ইরানি শীর্ষ কূটনীতিক ও রাষ্ট্রপ্রধানরা ঐতিহ্যগতভাবে এই নির্দিষ্ট ভবনটিতেই অবস্থান করে আসছেন। এবারও এর কোনো ব্যতিক্রম হয়নি। তবে এবারের পরিস্থিতি অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেশি শ্বাসরুদ্ধকর।

 

মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের অত্যন্ত কড়া নির্দেশনার কারণে ইরানি প্রতিনিধিদলকে কেবল বিমানবন্দর থেকে মিলেনিয়াম হিল্টনে এবং সেখান থেকে সরাসরি জাতিসংঘের সদরদপ্তরে যাতায়াতের সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। এর বাইরে যেকোনো ধরনের অননুমোদিত যাতায়াতকে মার্কিন নিরাপত্তা নীতির সরাসরি লঙ্ঘন হিসেবে বিবেচনা করা হবে।

 

মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের এই চরম বৈরী ও কঠোর আচরণের একটি ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট রয়েছে। সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সাল থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ইরানি প্রতিনিধিদের মার্কিন ভূখণ্ডে প্রবেশের ক্ষেত্রে এমন অবমাননাকর ও কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করে রেখেছে।

 

দুই দেশের মধ্যকার পারমাণবিক চুক্তি নিয়ে টানাপোড়েন, মধ্যপ্রাচ্যে আধিপত্য বিস্তারের দীর্ঘস্থায়ী লড়াই এবং সর্বশেষ যুদ্ধাবস্থার কারণে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার কূটনৈতিক সম্পর্ক একেবারে তলানিতে এসে ঠেকেছে।

 

তারই ধারাবাহিকতায় এবং নিরাপত্তা ঝুঁকির অজুহাতে যুক্তরাষ্ট্র সরকার ইরানি কূটনীতিকদের চলাচলের ওপর এই একপেশে ও কঠোর নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা বহাল রেখেছে। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের মতে, একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের নির্বাচিত রাষ্ট্রপ্রধানের ওপর এমন প্রকাশ্য বিধিনিষেধ আরোপ করাটা মূলত এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক চাপ প্রয়োগের কৌশল, যা আন্তর্জাতিক কূটনীতির প্রথাগত শিষ্টাচারের সঙ্গে বিন্দুমাত্র সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

 

এত সব চরম প্রতিকূলতা, নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা বেষ্টনী এবং অপমানজনক বিধিনিষেধের মধ্যেও রাষ্ট্রপতি মাসুদ পেজেশকিয়ান তাঁর পূর্বনির্ধারিত কূটনৈতিক কর্মসূচিগুলো অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে এগিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা করেছেন।

 

ওয়ালস্ট্রিট জার্নাল তাদের প্রতিবেদনে আরও নিশ্চিত করেছে যে, আগামীকাল বুধবার জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের মূল অধিবেশনে বিশ্বনেতাদের সামনে দাঁড়িয়ে ইরানের রাষ্ট্রপতি তাঁর আনুষ্ঠানিক ও বহুল প্রতীক্ষিত ভাষণ প্রদান করবেন।

 

ধারণা করা হচ্ছে, এই ঐতিহাসিক ভাষণে তিনি মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান অস্থিতিশীল পরিস্থিতি, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একপাক্ষিক অবরোধ এবং ফিলিস্তিন সংকটসহ নানা আন্তর্জাতিক ইস্যুতে তেহরানের সুস্পষ্ট ও অনড় অবস্থান বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরবেন।

 

কেবল আনুষ্ঠানিক ভাষণেই তাঁর এই সফর সীমাবদ্ধ থাকছে না; বরং অত্যন্ত সীমিত পরিসরের মধ্যেও তিনি বেশ কিছু তাৎপর্যপূর্ণ দ্বিপাক্ষিক ও বহুপাক্ষিক বৈঠকে অংশ নেবেন। নির্ধারিত সূচি অনুযায়ী, তিনি যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপের বিভিন্ন মানবাধিকার ও আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক সংস্থার শীর্ষ প্রতিনিধিদের সঙ্গে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ রুদ্ধদ্বার বৈঠক করবেন বলে আশা করা হচ্ছে।

 

এর পাশাপাশি, অধিবেশনে আগত বিশ্বের অন্যান্য পরাশক্তি ও মিত্র দেশগুলোর সরকার ও রাষ্ট্রপ্রধানদের সঙ্গেও তাঁর দ্বিপাক্ষিক আলোচনার কথা রয়েছে, যা মধ্যপ্রাচ্যের আগামী দিনের রাজনীতির গতিপ্রকৃতি নির্ধারণে বিশাল ভূমিকা পালন করতে পারে।

 

যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরানের মধ্যে বর্তমানে যে চরম বৈরী সম্পর্ক এবং এক প্রকার অঘোষিত বা প্রত্যক্ষ যুদ্ধাবস্থা বিরাজ করছে, তার প্রেক্ষাপটে ইরানি প্রতিনিধিদলের এই নিউইয়র্ক সফরকে আন্তর্জাতিক কূটনীতির ইতিহাসে একটি নজিরবিহীন ও বিস্ময়কর ঘটনা হিসেবেই অভিহিত করছেন বিশ্লেষকরা।

 

সাধারণত যখন দুটি দেশের মধ্যে সরাসরি কোনো যুদ্ধ বা চরম মাত্রার সশস্ত্র সংঘাত চলমান থাকে, তখন এক দেশের শীর্ষ নেতাদের অন্য দেশের মাটিতে সফরের কোনো নজির ইতিহাসে খুব একটা দেখা যায় না। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ বা স্নায়ুযুদ্ধের চরম উত্তেজনার দিনগুলোতেও শত্রুভাবাপন্ন দেশগুলোর নেতাদের সরাসরি মার্কিন ভূখণ্ডে এভাবে সফরের সুযোগ দেওয়া হয়নি।

 

তবে এক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের হাত-পা আইনি বাধ্যবাধকতার জালে বাঁধা রয়েছে। কারণ, জাতিসংঘ কোনো নির্দিষ্ট দেশের নিজস্ব প্রতিষ্ঠান নয়; এটি একটি স্বাধীন ও সর্বজনীন আন্তর্জাতিক সংস্থা।

 

১৯৪৭ সালে স্বাক্ষরিত সদরদপ্তর চুক্তি এবং জাতিসংঘের নিজস্ব আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী, স্বাগতিক দেশ হিসেবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের যেকোনো স্বীকৃত সদস্য দেশের বৈধ প্রতিনিধিদের জাতিসংঘের অধিবেশনে যোগ দেওয়ার অবাধ সুযোগ দিতে আইনত বাধ্য।

 

পারস্পরিক দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক যতই তিক্ত বা বৈরী হোক না কেন, জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে যোগদানের ক্ষেত্রে কোনো দেশের প্রতিনিধিকে প্রবেশানুমতি প্রদানে বা প্রবেশে বাধা দেওয়ার কোনো আইনি অধিকার স্বাগতিক দেশের নেই।

 

মূলত আন্তর্জাতিক এই আইনের প্রতি বাধ্যবাধকতার কারণেই চরম অনিচ্ছা ও বিরক্তি থাকা সত্ত্বেও মার্কিন প্রশাসন ইরানের রাষ্ট্রপতিকে নিউইয়র্কে প্রবেশের অনুমতি দিতে বাধ্য হয়েছে। তবে প্রবেশের অনুমতি দিলেও, স্বাগতিক দেশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র তাদের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার দোহাই দিয়ে চলাচলের ওপর যে নজিরবিহীন বিধিনিষেধ আরোপ করেছে, তা তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যকার বিরাজমান গভীর অবিশ্বাসেরই নগ্ন বহিঃপ্রকাশ।

 

একদিকে বৈশ্বিক কূটনীতির বাধ্যবাধকতা, অন্যদিকে দুই দেশের মধ্যকার চরম শত্রুতা-এই দুইয়ের এক অদ্ভুত ও জটিল সমীকরণের মধ্য দিয়ে নিউইয়র্কে অবস্থান করছেন ইরানের রাষ্ট্রপতি মাসুদ পেজেশকিয়ান।

 

তাঁর এই অবরুদ্ধ কিন্তু অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ সফর শেষ পর্যন্ত বিশ্ব রাজনীতিতে ঠিক কী ধরনের প্রভাব ফেলে এবং ইরান তার কূটনৈতিক লক্ষ্য অর্জনে কতটা সফল হয়, এখন সমগ্র বিশ্বের নজর সেদিকেই নিবদ্ধ রয়েছে।

 

- ওয়ালস্ট্রিট জার্নাল