শনিবার, সেপ্টেম্বর ১৯, ২০২৬
৪ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

হোয়াইট হাউসে সিএনএনসহ তিন সংবাদমাধ্যমের প্রবেশ নিষিদ্ধ করলেন ট্রাম্প

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০৬:৪৮ পিএম

হোয়াইট হাউসে সিএনএনসহ তিন সংবাদমাধ্যমের প্রবেশ নিষিদ্ধ করলেন ট্রাম্প
ছবি: সংগৃহীত

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক ও গণমাধ্যম অঙ্গনে এক নজিরবিহীন উত্তেজনার সৃষ্টি করে হোয়াইট হাউসে তিনটি প্রধান সংবাদমাধ্যমের কার্যক্রম পরিচালনার ওপর সরাসরি নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।

 

গত শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বর তিনি একটি আনুষ্ঠানিক নির্দেশনার মাধ্যমে আন্তর্জাতিকভাবে সুপরিচিত সংবাদমাধ্যম সিএনএন, প্রভাবশালী রাজনৈতিক সংবাদমাধ্যম পলিটিকো এবং এমএস নাও-এর হোয়াইট হাউস প্রবেশের অধিকার বাতিল করেন।

 

আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই কঠোর ও আকস্মিক পদক্ষেপের পেছনে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প মূলত সংবাদমাধ্যমগুলোর বিরুদ্ধে লাগাতার ‘ভুয়া খবর’ বা ভিত্তিহীন সংবাদ প্রচারের গুরুতর অভিযোগ এনেছেন।

 

যুক্তরাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক ইতিহাসে স্বাধীন গণমাধ্যমের ওপর শীর্ষ নির্বাহী পর্যায় থেকে এমন সরাসরি নিষেধাজ্ঞার ঘটনা অত্যন্ত বিরল, যা ইতিমধ্যেই বিশ্বজুড়ে ব্যাপক আলোচনা ও সমালোচনার জন্ম দিয়েছে।

 

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নিজের এই বিতর্কিত সিদ্ধান্তের যৌক্তিকতা তুলে ধরেন। তিনি অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় অভিযোগ করেন যে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের মতো রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ ব্যক্তিত্বকে নিয়ে সংবাদ পরিবেশনের সময় এসব নির্দিষ্ট সংবাদমাধ্যমকে কোনোভাবেই মিথ্যা ও মনগড়া তথ্য প্রকাশের অবাধ সুযোগ দেওয়া উচিত নয়।

 

পরবর্তীতে হোয়াইট হাউসের ওভাল অফিসে উপস্থিত সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ট্রাম্প বিষয়টি নিয়ে আরও বিস্তারিত কথা বলেন। তিনি পরিষ্কারভাবে জানান যে, কেবল সাম্প্রতিক কোনো একটি নির্দিষ্ট বা বিচ্ছিন্ন ঘটনার কারণে তিনি এই চরম সিদ্ধান্ত নেননি; বরং গত কয়েক বছর ধরে এই সংবাদমাধ্যমগুলো ধারাবাহিকভাবে যে ধরনের নেতিবাচক ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রতিবেদন প্রকাশ করে আসছে, তার সামগ্রিক মূল্যায়নের ভিত্তিতেই এই চূড়ান্ত পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

 

হোয়াইট হাউসকে যুক্তরাষ্ট্রের ‘জনগণের বাড়ি’ হিসেবে আখ্যায়িত করে তিনি জোর দিয়ে বলেন, এই ঐতিহাসিক স্থানে এমন অপসাংবাদিকতায় লিপ্ত সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধিদের প্রবেশের অনুমতি দেওয়ার কোনো আইনি বা নৈতিক বাধ্যবাধকতা প্রশাসনের নেই।

 

শুধু তাই নয়, ভবিষ্যতে ভুয়া খবর প্রচারকারী অন্যান্য সংবাদমাধ্যমের বিরুদ্ধেও অনুরূপ কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে তিনি প্রকাশ্য হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন। সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তু হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষস্থানীয় দুই দৈনিক সংবাদপত্র ওয়াশিংটন পোস্ট এবং নিউইয়র্ক টাইমসের নামও বিশেষভাবে উল্লেখ করেন।

 

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের এই আকস্মিক ও কঠোর পদক্ষেপ যুক্তরাষ্ট্রের আইন ও সংবিধান বিশেষজ্ঞদের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে। প্রথিতযশা আইনবিদরা সতর্ক করে জানিয়েছেন যে, প্রশাসনের এই সিদ্ধান্ত খুব শিগগিরই বড় ধরনের আইনি চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে পারে।

 

তাদের মতে, কোনো সংবাদমাধ্যমকে তার সম্পাদিত সংবাদের বিষয়বস্তু বা দৃষ্টিভঙ্গির কারণে সরকারি ভবন থেকে এভাবে নিষিদ্ধ করার উদ্যোগ যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের ঐতিহাসিক প্রথম সংশোধনীর সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক। এই সংশোধনীটি মূলত রাষ্ট্রের প্রতিটি নাগরিকের নিরঙ্কুশ বাকস্বাধীনতা ও সংবাদমাধ্যমের অবাধ স্বাধীনতা নিশ্চিত করে থাকে।

 

এ প্রসঙ্গে কলাম্বিয়া ইউনিভার্সিটির স্বনামধন্য নাইট ফার্স্ট অ্যামেন্ডমেন্ট ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক জামেল জেফার একটি আনুষ্ঠানিক বিবৃতি প্রদান করেছেন। বিবৃতিতে তিনি ট্রাম্পের এই নিষেধাজ্ঞাকে সম্পূর্ণ ‘অসাংবিধানিক’ বলে আখ্যায়িত করেন।

 

জেফার বিস্তারিত ব্যাখ্যা করে বলেন, সংবিধানের প্রথম সংশোধনীর আওতায় হোয়াইট হাউসের প্রেস পুল বা সংবাদ সম্মেলন কক্ষটি একটি উন্মুক্ত ‘পাবলিক ফোরাম’ হিসেবে আইনি স্বীকৃতিপ্রাপ্ত।

 

ফলে, কোনো সাংবাদিক বা সংবাদমাধ্যমের রাজনৈতিক বা আদর্শিক দৃষ্টিভঙ্গির কারণে তাকে ওই ফোরাম থেকে সম্পূর্ণভাবে বাদ দেওয়ার কোনো আইনি এখতিয়ার স্বয়ং প্রেসিডেন্টের হাতেও নেই।

 

তবে হোয়াইট হাউসের পক্ষ থেকে এই নিষেধাজ্ঞা জারির আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসার পরও শুক্রবার বিকেলে এক অভূতপূর্ব দৃশ্য চোখে পড়ে। নির্দেশনার তোয়াক্কা না করে ওই তিন সংবাদমাধ্যমের নির্ধারিত প্রতিনিধিদের হোয়াইট হাউসের ভেতরে তাদের প্রাত্যহিক পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে দেখা গেছে, যা প্রশাসন ও গণমাধ্যমের মধ্যকার এই দ্বন্দ্বকে আরও দৃশ্যমান করে তুলেছে।

 

নিষেধাজ্ঞার কড়া প্রতিক্রিয়া জানিয়ে সিএনএন তাদের আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে বলেছে যে, তারা যেকোনো পরিস্থিতিতে হোয়াইট হাউস থেকে সংবাদ সংগ্রহকারী তাদের নির্ভীক সাংবাদিকদের পাশে দৃঢ়ভাবে অবস্থান করছে।

 

প্রভাবশালী এই সংবাদমাধ্যমটি স্মরণ করিয়ে দেয় যে, যুক্তরাষ্ট্রের পবিত্র সংবিধান অনুযায়ী সরকারের কোনো ধরনের বাধা বা অন্যায় হস্তক্ষেপ ছাড়াই স্বাধীনভাবে সংবাদ সংগ্রহের জন্মগত অধিকার তাদের রয়েছে। ট্রাম্পের এই নিষেধাজ্ঞা যদি জোরপূর্বক কার্যকর করা হয়, তবে তা গণমাধ্যমের এই মৌলিক ও সাংবিধানিক অধিকারের ওপর একটি বেআইনি ও নগ্ন আঘাত হিসেবেই গণ্য হবে।

 

অন্যদিকে, আরেক সংবাদমাধ্যম পলিটিকো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বার্তায় জানিয়েছে যে, তারা কখনোই বস্তুনিষ্ঠ ও সত্যনিষ্ঠ সাংবাদিকতার পথ থেকে সরে আসবে না এবং সংবিধানের প্রথম সংশোধনীর আওতাধীন নিজেদের অধিকার রক্ষায় শেষ পর্যন্ত আইনি লড়াই চালিয়ে যাবে।

 

যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান প্রশাসন থেকে শুরু করে ভবিষ্যৎ যেকোনো প্রশাসনের বিষয়ে তারা সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ ও বস্তুনিষ্ঠভাবে সংবাদ প্রকাশ করে যাওয়ার দৃঢ় অঙ্গীকারও পুনর্ব্যক্ত করেছে। তবে হোয়াইট হাউস থেকে নিষিদ্ধ ঘোষিত তৃতীয় সংবাদমাধ্যম এমএস নাও-এর পক্ষ থেকে এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত তাৎক্ষণিকভাবে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া বা মন্তব্য পাওয়া যায়নি। গোটা বিশ্বের দৃষ্টি এখন এই নজিরবিহীন আইনি ও রাজনৈতিক সংকট কীভাবে মীমাংসিত হয়, সেদিকে নিবদ্ধ রয়েছে।

 

- রয়টার্স