শনিবার, সেপ্টেম্বর ১৯, ২০২৬
৪ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

অভিবাসীদের তৃতীয় দেশে পাঠাতে ট্রাম্প প্রশাসনের বিতর্কিত নীতি আটকে দিলেন আদালত

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০৩:১৮ পিএম

অভিবাসীদের তৃতীয় দেশে পাঠাতে ট্রাম্প প্রশাসনের বিতর্কিত নীতি আটকে দিলেন আদালত
ছবি : Collected

যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন নীতিতে একটি বড় ধরনের আইনি ধাক্কা খেয়েছে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বাধীন প্রশাসন। নিজ দেশের পরিবর্তে তৃতীয় কোনো দেশে অভিবাসীদের দ্রুতগতিতে ফেরত পাঠানোর যে বিতর্কিত নীতি ট্রাম্প প্রশাসন গ্রহণ করেছিল, যুক্তরাষ্ট্রের একটি ফেডারেল আপিল আদালত তা সাময়িকভাবে আটকে দিয়েছেন।

 

এই নীতিটি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলো গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছিল। তবে আইনি প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের আইনজীবী দল এই রায়ের বিরুদ্ধে দেশটির সুপ্রিম কোর্টে আপিল করার সুযোগ পাবেন বলে আইন বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।

 

কাতারভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার এক বিস্তারিত প্রতিবেদনে শুক্রবার এই গুরুত্বপূর্ণ আইনি পদক্ষেপের বিষয়টি বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরা হয়েছে। আল জাজিরার ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্রের বোস্টনে অবস্থিত প্রথম সার্কিট কোর্ট অব আপিলের তিনজন বিচারকের সমন্বয়ে গঠিত একটি বেঞ্চ চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে নিম্ন আদালতের দেওয়া একটি রায়কেই বহাল রেখেছেন।

 

ওই রায়ে মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বা ডিপার্টমেন্ট অব হোমল্যান্ড সিকিউরিটির প্রণয়ন করা তৃতীয় দেশে অভিবাসী ফেরত পাঠানোর নীতিটিকে সম্পূর্ণ বেআইনি এবং মানবাধিকারের পরিপন্থী হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছিল।

 

তৃতীয় কোনো দেশে জোরপূর্বক ফেরত পাঠানোর আগে সংশ্লিষ্ট অভিবাসীদের ন্যূনতম কী ধরনের আইনি সুরক্ষা পাওয়ার অধিকার রয়েছে এবং সেই আইনি অধিকারগুলো কীভাবে বাস্তবায়িত হবে, তা নিয়ে বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থার দায়ের করা একটি যৌথ মামলার চূড়ান্ত ফলাফলের পরিপ্রেক্ষিতে এই ঐতিহাসিক রায়টি এসেছে।

 

বিশেষ করে এই মামলাটিতে এমন সব অভিবাসীর মর্মান্তিক পরিস্থিতির বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত ছিল, যাদের সঙ্গে তাদের পাঠানো তৃতীয় দেশগুলোর দূরতম কোনো সম্পর্ক বা ঐতিহাসিক যোগসূত্র নেই। তিনজন বিচারকের এই বেঞ্চের পক্ষে বিস্তারিত রায়টি লিখেছেন স্বনামধন্য ইউএস সার্কিট জজ শেথ আফ্রেম।

 

তিনি তাঁর রায়ে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন যে, কোনো অভিবাসীকে জোরপূর্বক তৃতীয় কোনো দেশে পাঠানোর আগে সেই দেশে তার ব্যক্তিগত নিরাপত্তা এবং জীবনঝুঁকি নিয়ে আইনি উদ্বেগ জানানোর একটি ‘অর্থবহ’ ও নিরপেক্ষ সুযোগ তাকে অবশ্যই দিতে হবে। এটি মানুষের অন্যতম মৌলিক মানবাধিকার।

 

এই স্পর্শকাতর আইনি বিষয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের পক্ষ থেকে আইনের যে তুলনামূলক সংকীর্ণ এবং একতরফা ব্যাখ্যা আদালতে উপস্থাপন করা হয়েছিল, আদালত তা সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাখ্যান করেছেন। তবে কেবল আইনি ও প্রক্রিয়াগত কারণে আদালত আগের রায়ের একটি নির্দিষ্ট অংশ বাতিল করে দিয়েছেন।

 

বাতিল হওয়া ওই অংশে বলা হয়েছিল যে, কোনো অভিবাসীকে তার নিজ দেশ ছাড়া অন্য কোথাও পাঠানোর ক্ষেত্রে প্রথমেই তার সঙ্গে সম্পর্ক রয়েছে এমন কোনো দেশে পাঠানোর চেষ্টা করতে হবে এবং সেটি ব্যর্থ হওয়ার পরই কেবল তৃতীয় কোনো দেশে পাঠানোর বিষয়টি বিবেচনা করা যাবে।

 

এই রায়ের পর মামলার বাদীপক্ষের অন্যতম প্রধান আইনজীবী এবং অভিবাসী বিষয়ক আইনি সহায়তা সংস্থা ‘ন্যাশনাল ইমিগ্রেশন লিটিগেশন অ্যালায়েন্স’-এর জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা ট্রিনা রিয়েলমুটো তাঁর তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় গভীর সন্তোষ প্রকাশ করেছেন।

 

তিনি বলেন, আদালতের এই যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত অন্তত এই বিষয়টি নিশ্চিত করেছে যে, কোনো অভিবাসীকে জোর করে এমন কোনো দেশের উদ্দেশ্যে বিমানে তুলে পাঠিয়ে দেওয়া যাবে না, যে দেশটি তার বহিষ্কার প্রক্রিয়ার কোনো অংশের সাথেই যুক্ত ছিল না।

 

আদালতের এই রায়ের ফলে কোনোভাবেই আইনি প্রক্রিয়া এবং সম্ভাব্য নির্যাতন থেকে সুরক্ষার বিধান এড়িয়ে যাওয়ার কোনো আইনি সুযোগ সরকারের হাতে থাকল না। অন্যদিকে, মার্কিন ডিপার্টমেন্ট অব হোমল্যান্ড সিকিউরিটি তাৎক্ষণিকভাবে আদালতের এই রায়ের বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।

 

তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও আইনি বিশেষজ্ঞরা প্রবলভাবে ধারণা করছেন যে, ট্রাম্প প্রশাসন এই রায়ের বিরুদ্ধে খুব শিগগিরই দেশের সর্বোচ্চ আদালত তথা সুপ্রিম কোর্টে আপিল দায়ের করবে।

 

উল্লেখ্য, ট্রাম্প প্রশাসনের বর্তমান মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের অন্তত ২৯টি তৃতীয় দেশের সঙ্গে এমন ধরনের বিতর্কিত দ্বিপাক্ষিক চুক্তি স্বাক্ষর করেছে, যার আওতায় এখন পর্যন্ত পঁচিশ হাজারের বেশি অভিবাসীকে নিজ দেশের বাইরে তৃতীয় কোনো দেশে পাঠানোর আইনি সুযোগ তৈরি হয়েছে।

 

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন রিফিউজিস ইন্টারন্যাশনাল এবং হিউম্যান রাইটস ফার্স্ট কর্তৃক যৌথভাবে পরিচালিত ‘থার্ড কান্ট্রি ডিপোর্টেশন ওয়াচ’ নামের একটি বিশেষ ট্র্যাকারের মাধ্যমে এই উদ্বেগজনক তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে।

 

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এসব ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি ব্যবহার করা হয়েছে প্রতিবেশী রাষ্ট্র মেক্সিকোকে। জানা যায়, ২০২৫ সালের মার্চ মাসে এই বিতর্কিত নীতিটি আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রহণ করেছিল ট্রাম্প প্রশাসন।

 

এই নীতিটির আওতায়, তৃতীয় দেশে পাঠানোর পর সেখানে ওই অভিবাসীর নির্যাতনের শিকার হওয়ার কোনো ঝুঁকি নেই বলে যদি সংশ্লিষ্ট দেশের কাছ থেকে নিছক ‘কূটনৈতিক নিশ্চয়তা’ পাওয়া যায়, তবে খুব কম সময়ের নোটিশেই ওই অভিবাসীদের সেখানে পাঠিয়ে দেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছিল।

 

অভিবাসীদের নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের এই বিতর্কিত কর্মসূচিটি ইতোমধ্যেই দুই দফা আইনি লড়াইয়ের মাধ্যমে সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত গড়িয়েছে। এর আগে, ২০২৫ সালে মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট এক আদেশে আটজন অভিবাসীকে আফ্রিকার দেশ দক্ষিণ সুদানে পাঠানোর পথ পরিষ্কার করে দিয়েছিল।

 

আশ্চর্যজনক বিষয় হলো, ওই আটজন অভিবাসীর মধ্যে কিউবা, মিয়ানমার ও ভিয়েতনামের নাগরিকও ছিলেন, যাদের সাথে দক্ষিণ সুদানের কোনো সম্পর্কই ছিল না। অথচ খোদ মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর সাধারণ নাগরিকদের দক্ষিণ সুদানে ভ্রমণ না করার পরামর্শ দিয়ে থাকে, কারণ দেশটিতে অপরাধ, অপহরণ ও সশস্ত্র সংঘাতের চরম ঝুঁকি সবসময় বিদ্যমান।

 

সেই সময়ে ডিপার্টমেন্ট অব হোমল্যান্ড সিকিউরিটি ওই বহিষ্কারের ঘটনাটিকে তাদের আইনি ‘বিজয়’ হিসেবে উল্লেখ করলেও, দেশ-বিদেশের মানবাধিকার সংগঠনগুলো তীব্র অভিযোগ করে বলেছিল যে, এর মাধ্যমে অভিবাসীদের ন্যূনতম মৌলিক আইনি সুরক্ষাকে চরমভাবে উপেক্ষা ও লঙ্ঘন করা হয়েছে।

 

এদিকে, কেবল এই একটি নীতিই নয়, বরং চলতি মাসে ট্রাম্প প্রশাসনের গৃহীত অভিবাসন নীতিতে একের পর এক বড় ধরনের আইনি বাধা এসে উপস্থিত হয়েছে। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের এক ফেডারেল বিচারক বিদেশি শিক্ষার্থী ও সাংবাদিকদের ভিসার ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট সময়সীমা আরোপের সরকারি পরিকল্পনাটি আটকে দিয়েছেন।

 

এ ক্ষেত্রে আদালতে সরকারের পক্ষ থেকে যে যুক্তি দেওয়া হয়েছিল, বিচারক তাকে ‘অত্যন্ত দুর্বল’ ও ভিত্তিহীন বলে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন। এছাড়াও যুক্তরাষ্ট্রের বাইশটি অঙ্গরাজ্য এবং ওয়াশিংটন ডিসির সমন্বয়ে গঠিত একটি জোট ট্রাম্প প্রশাসনের আরও একটি নীতির বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছে।

 

ওই নীতিটির আওতায়, আইনসম্মতভাবে সরকারি সুবিধা গ্রহণ করা অভিবাসীদের গ্রিন কার্ড বা স্থায়ী বসবাসের অনুমতি দেওয়ার ক্ষেত্রে সরকারি কর্মকর্তারা ইচ্ছাকৃতভাবে বাধা প্রদান করতে পারতেন। সব মিলিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের কঠোর অভিবাসন নীতিগুলো বর্তমানে দেশটির বিচার বিভাগের প্রবল চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।

 

- আল জাজিরা