প্রতিনিধি পরিষদে এ নিয়ে তৃতীয়বারের মতো ইরান যুদ্ধ বন্ধের পক্ষে আইনপ্রণেতারা তাঁদের সুস্পষ্ট রায় দিলেন। এই পদক্ষেপে বিরোধী ডেমোক্র্যাট দলের সব সদস্যের পাশাপাশি ক্ষমতাসীন দল রিপাবলিকান পার্টির সাতজন আইনপ্রণেতাও যুদ্ধবিরতির পক্ষে ভোট দিয়েছেন।
তাঁদের মধ্যে তিনজন রিপাবলিকান সদস্য প্রথমবারের মতো নিজ দলের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের গৃহীত সামরিক নীতির বিরুদ্ধে গিয়ে এমন যুদ্ধবিরোধী পদক্ষেপে নিজেদের প্রত্যক্ষ সম্মতি প্রকাশ করলেন।
অনুমোদিত এই নতুন প্রস্তাবের মূল লক্ষ্য হলো সংবিধান অনুযায়ী কংগ্রেসের পূর্বানুমোদন ছাড়া একক সিদ্ধান্তে মধ্যপ্রাচ্যে প্রেসিডেন্টের সামরিক অভিযান পরিচালনা করার ক্ষমতা সীমিত করা।
রিপাবলিকান দলের মধ্য থেকেই যুদ্ধ বন্ধের পক্ষে সোচ্চার ভূমিকা পালনকারী আইওয়া অঙ্গরাজ্যের কংগ্রেসম্যান জ্যাক নান ভোটাভুটির পর স্পষ্ট ভাষায় বলেন, সংকট নিয়ে আনুষ্ঠানিক আলোচনার অবকাশ এখন আর নেই।
তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, বহির্বিশ্বে যেকোনো দীর্ঘমেয়াদি সামরিক অভিযান চালিয়ে যেতে হলে অবশ্যই আইনসভার অনুমোদন প্রয়োজন। অতীতে যুক্তরাষ্ট্রের জড়িয়ে পড়া বিভিন্ন রক্তক্ষয়ী সংঘাতের প্রতি ইঙ্গিত করে তিনি জানান, তিনি আরেকটি অনির্দিষ্টকালের ব্যয়বহুল ও প্রাণঘাতী যুদ্ধকে কখনোই সমর্থন করতে পারেন না।
তবে আইনসভায় এই প্রস্তাব পাস হলেও তা বাস্তবে কার্যকর হওয়া নিয়ে চরম অনিশ্চয়তা রয়েছে। এর আগেও একই ধরনের দুটি প্রস্তাব নিম্নকক্ষে অনুমোদন পেলেও প্রক্রিয়াগত জটিলতার কারণে সেগুলো কখনোই প্রেসিডেন্টের স্বাক্ষর বা অনুমোদনের টেবিলে পৌঁছায়নি।
বিশ্লেষকদের মতে, আইনপ্রণেতারা এই বিলটি আইন হিসেবে কার্যকর করার উদ্দেশ্যে প্রেসিডেন্টের দপ্তরে পাঠালেও প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সেখানে তাঁর সাংবিধানিক ভেটো ক্ষমতা প্রয়োগ করে তা তাৎক্ষণিকভাবে নাকচ করে দেবেন বলেই ব্যাপকভাবে ধারণা করা হচ্ছে।
এদিকে কংগ্রেসের এই সিদ্ধান্তের কড়া সমালোচনা করেছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের কট্টর সমর্থক ও পররাষ্ট্রবিষয়ক কমিটির চেয়ারম্যান, ফ্লোরিডার রিপাবলিকান কংগ্রেসম্যান ব্রায়ান মাস্ট। ডেমোক্র্যাটদের অবস্থানের তীব্র বিরোধিতা করে তিনি প্রশ্ন তোলেন যে, ইরানকে যদি এখনো মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তার জন্য বড় ধরনের হুমকি হিসেবে বিবেচনা করা হয়, তবে ডেমোক্র্যাটরা মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধক্ষেত্র থেকে ঠিক কোন ধরনের সামরিক সরঞ্জাম ও সম্পদ সরিয়ে নিতে চান।
নিজের বক্তব্য জোরালো করে তিনি দাবি করেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প মূলত কখনোই চিরস্থায়ী যুদ্ধের পক্ষে নন, বরং তিনি তেহরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের কয়েক দশকের পুরোনো বৈরিতার চিরতরে অবসান ঘটিয়ে একটি ইতিবাচক সমাধান নিশ্চিত করার লক্ষ্যে বাস্তবমুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করছেন।
আসন্ন মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে আইনসভার বর্তমান অধিবেশনে এটিই হয়তো সামরিক ক্ষমতা সংক্রান্ত শেষ ভোট হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বর্তমানে মধ্যবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে আর পঞ্চাশ দিনেরও কম সময় বাকি থাকায় কংগ্রেসের সদস্যরা চলতি সপ্তাহের শেষেই রাজধানী ওয়াশিংটন ছেড়ে নিজ নিজ নির্বাচনি এলাকায় ফিরে গিয়ে প্রচারে সক্রিয় হবেন।
আর এমন বাস্তবতায় দেশব্যাপী সাধারণ ভোটারদের কাছে চলমান এই মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ অন্যতম শীর্ষ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ইস্যু হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। বিশেষ করে গত ২৮শে ফেব্রুয়ারি তেহরানের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক সামরিক অভিযান শুরুর পর দীর্ঘ সাত মাস ধরে চলা এই পাল্টাপাল্টি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যে মারাত্মক অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করেছে।
চলমান এই দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের ফলে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতেও এক ভয়াবহ নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। কংগ্রেসের নির্দলীয় গবেষণা সংস্থা ‘কংগ্রেশনাল বাজেট অফিস’ বা সিবিও-এর একটি সাম্প্রতিক বিশ্লেষণী প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, সামরিক এই সংঘাত মার্কিন বাজারে পণ্যমূল্য ও সার্বিক মূল্যস্ফীতির ওপর নতুন করে তীব্র চাপ সৃষ্টি করছে।
পাশাপাশি আধুনিক অস্ত্র ও গোলাবারুদের জাতীয় মজুতেও বড় ধরনের টান পড়েছে। সরকারি হিসাব মতে, বিগত ছয় মাসে এই যুদ্ধ পরিচালনার জন্য রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে প্রায় ৩৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার খরচ হয়ে গেছে। সামরিক সংঘাত যদি এভাবেই অব্যাহত থাকে, তবে প্রতিরক্ষা খাতে প্রতি মাসে অতিরিক্ত আরও প্রায় তিন বিলিয়ন ডলারের মতো বিপুল অর্থ ব্যয় হতে পারে।
সংস্থাটি আরও সতর্ক করে জানিয়েছে, যুদ্ধের এই অব্যাহত ব্যয়ভারের প্রভাবে আগামী ২০২৭ সালের প্রথম তিন মাসেই সামগ্রিক মূল্যস্ফীতি অন্তত শূন্য দশমিক পাঁচ শতাংশীয় পয়েন্ট পর্যন্ত বেড়ে যাওয়ার প্রবল ঝুঁকি রয়েছে।
এর আগে চলতি বছরের জুন ও জুলাই মাসেও প্রতিনিধি পরিষদ একই ধরনের যুদ্ধক্ষমতা সীমিতকরণ প্রস্তাব অনুমোদন করেছিল। এমনকি উচ্চকক্ষ সিনেটেও একবার ইরান যুদ্ধ বন্ধের প্রস্তাবটি প্রাথমিক সমর্থন পেয়েছিল, তবে পরদিন স্বয়ং প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের তীব্র অসন্তোষ ও রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়ার মুখে রিপাবলিকান সিনেটররা নিজেদের অবস্থান পরিবর্তন করে পিছু হটেন।
যুক্তরাষ্ট্রের মূল সংবিধান অনুযায়ী বহির্বিশ্বে কোনো আনুষ্ঠানিক যুদ্ধ ঘোষণার একক ক্ষমতা কেবল জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নিয়ে গঠিত কংগ্রেসের হাতে ন্যস্ত। যদিও সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক হিসেবে প্রেসিডেন্টের জরুরি প্রয়োজনে তাৎক্ষণিক সামরিক পদক্ষেপ গ্রহণের এখতিয়ার রয়েছে, তথাপি সত্তরের দশকে ভিয়েতনাম যুদ্ধের তিক্ত অভিজ্ঞতার পটভূমিতে প্রণীত ঐতিহাসিক ‘যুদ্ধক্ষমতা আইন’-এর আওতায় প্রেসিডেন্টের এই সামরিক ক্ষমতার ওপর সুস্পষ্ট সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছে।
সেই আইন অনুযায়ী, সাধারণত সামরিক অভিযান শুরুর ৬০ দিনের মধ্যে আনুষ্ঠানিকভাবে কংগ্রেসের অনুমোদন নিতে হয়, অন্যথায় দীর্ঘমেয়াদি সংঘাত অব্যাহত রাখার কোনো সাংবিধানিক সুযোগ থাকে না।