আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা টিআরটি ওয়ার্ল্ডের এক বিশেষ প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবাহিনীর শীর্ষ বেসামরিক কর্মকর্তা এবং সেক্রেটারি ট্রয় মেইঙ্ক গত সোমবার জনসমক্ষে এই অতি গুরুত্বপূর্ণ সামরিক তথ্যটি নিশ্চিত করেছেন।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মেরিল্যান্ড অঙ্গরাজ্যের ন্যাশনাল হারবারে আয়োজিত ‘এয়ার অ্যান্ড স্পেস ফোর্সেস অ্যাসোসিয়েশন’-এর একটি শীর্ষ সম্মেলনে বক্তব্য দেওয়ার সময় তিনি মহাকাশে যুক্তরাষ্ট্রের এই অস্ত্র মোতায়েনের বিষয়টি প্রকাশ্যে নিয়ে আসেন।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে এই ঘোষণাকে কেন্দ্র করে নতুন করে বৈশ্বিক সামরিক উত্তেজনার এবং অস্ত্র প্রতিযোগিতার শঙ্কা তৈরি হয়েছে। সম্মেলনে দেওয়া ওই বক্তব্যে শীর্ষ মার্কিন কর্মকর্তা ট্রয় মেইঙ্ক অত্যন্ত স্পষ্টভাবে জানান যে, নতুন কোনো সামরিক বা কৌশলগত হুমকি পৃথিবীর যেখানেই দেখা দিক না কেন, তা দৃঢ়ভাবে এবং তাৎক্ষণিকভাবে মোকাবিলা করার জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সব সময় পূর্ণ প্রস্তুত থাকে।
এই নিরবচ্ছিন্ন প্রস্তুতির অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবেই মার্কিন মহাকাশ বাহিনী বা ‘স্পেস ফোর্স’-এর কাছে এখন পৃথিবীর কক্ষপথে মোতায়েন করা এমন কিছু অত্যাধুনিক সমরাস্ত্র রয়েছে, যা শত্রুপক্ষের যেকোনো অতর্কিত হামলা থেকে নিজেদের যৌথ বাহিনীকে সুরক্ষিত রাখতে সম্পূর্ণভাবে সক্ষম।
সামরিক প্রতিরোধ এবং জাতীয় কৌশলগত সুরক্ষার দৃষ্টিকোণ থেকে মহাকাশে মোতায়েন করা এই অত্যাধুনিক অস্ত্র ব্যবস্থাকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে তিনি উল্লেখ করেন। যদিও পরবর্তী সময়ে উপস্থিত সাংবাদিকদের এক প্রশ্নোত্তর পর্বে নিজের এই চাঞ্চল্যকর বক্তব্য নিয়ে বিস্তারিত কোনো তথ্য বা ব্যাখ্যা দিতে তিনি স্পষ্টভাবে অস্বীকৃতি জানান।
তবে তিনি অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে উল্লেখ করেন যে, তাঁর ওই বক্তব্যের প্রতিটি শব্দ অত্যন্ত ভেবেচিন্তে এবং সুপরিকল্পিতভাবেই চয়ন করা হয়েছে। ট্রয় মেইঙ্কের এই বক্তব্যের বরাত দিয়ে আন্তর্জাতিক সামরিক সাময়িকী ‘এয়ার অ্যান্ড স্পেস ফোর্সেস ম্যাগাজিন’-এর একটি বিশদ প্রতিবেদনে এই বিষয়ে আরও কিছু চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে মেইঙ্কের উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়েছে যে, কেবল পৃথিবীর বুকেই নয়, বরং আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্রে এবং মহাকাশেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একচ্ছত্র আধিপত্য ও সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব বজায় রাখা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।
অন্যদিকে, বিশ্বখ্যাত মার্কিন সংবাদমাধ্যম ‘ওয়াশিংটন পোস্ট’-কে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক যুক্তরাষ্ট্রের একজন উচ্চপদস্থ সামরিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন যে, ট্রয় মেইঙ্ক মহাকাশে মোতায়েন করা যে অত্যাধুনিক প্রযুক্তির কথা উল্লেখ করেছেন, তার মধ্যে এমন কিছু বিধ্বংসী সক্ষমতাও লুকিয়ে থাকতে পারে, যার মাধ্যমে সামরিক প্রয়োজনে শত্রুপক্ষের যেকোনো গুরুত্বপূর্ণ কৃত্রিম উপগ্রহ বা স্যাটেলাইটকে মহাকাশেই সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দেওয়া সম্ভব হবে।
আন্তর্জাতিক মহাকাশ আইনের দিকে গভীরভাবে দৃষ্টি দিলে দেখা যায় যে, মহাকাশে সাধারণ সামরিক সমরাস্ত্র মোতায়েনের ওপর আন্তর্জাতিকভাবে সরাসরি কোনো কঠোর আইনি নিষেধাজ্ঞা নেই।
তবে বিশ্বশান্তি বজায় রাখার স্বার্থে কোনো দেশই সেখানে পারমাণবিক অস্ত্র বা অন্য কোনো ভয়াবহ গণবিধ্বংসী সমরাস্ত্র মোতায়েন করতে পারবে না বলে আন্তর্জাতিক মহাকাশ চুক্তিতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে।
আধুনিক মহাকাশ প্রতিযোগিতার এবং সামরিকীকরণের এই নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়েছিল মূলত ২০১৯ সালে, যখন সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর প্রথম মেয়াদে আনুষ্ঠানিকভাবে সামরিক বাহিনীর সম্পূর্ণ নতুন শাখা হিসেবে ‘স্পেস ফোর্স’ বা মহাকাশ বাহিনী প্রতিষ্ঠা করেন।
সেই সময়ে তিনি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণভাবে এই মহাকাশকে বর্তমান বিশ্বের নবীনতম যুদ্ধক্ষেত্র হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন। এরই ধারাবাহিকতায় গত বছর ডোনাল্ড ট্রাম্প মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষার জন্য ‘গোল্ডেন ডোম’ বা সোনালি গম্বুজ নামে একটি নতুন এবং অত্যন্ত উচ্চাভিলাষী সামরিক পরিকল্পনার রূপরেখা প্রকাশ করেন।
যুক্তরাষ্ট্রের সমগ্র ভূখণ্ডকে বাইরের যেকোনো দেশের আক্রমণ থেকে নিশ্ছিদ্রভাবে সুরক্ষিত রাখার জন্য এই মেগা প্রকল্পের আওতায় বহুস্তরীয় এক দুর্ভেদ্য ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রস্তাব করা হয়েছে।
এর মধ্যে মহাকাশভিত্তিক এমন কিছু উন্নত সেন্সর এবং ইন্টারসেপ্টর ব্যবস্থাও রয়েছে, যা শত্রুর নিক্ষিপ্ত যেকোনো আন্তঃমহাদেশীয় ক্ষেপণাস্ত্রকে মহাকাশেই চিহ্নিত করে প্রতিহত করতে সক্ষম। আন্তর্জাতিক প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের এই নতুন প্রতিরক্ষা পরিকল্পনাটি মূলত ১৯৮৩ সালে স্নায়ুযুদ্ধের চরম উত্তেজনার সময় তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগ্যানের প্রস্তাবিত বিখ্যাত ‘স্ট্র্যাটেজিক ডিফেন্স ইনিশিয়েটিভ’ বা এসডিআই প্রকল্পের কথাই বিশ্ববাসীকে পুনরায় স্মরণ করিয়ে দেয়।
সেই সময়ে ওই বহুল আলোচিত সামরিক প্রকল্পটি সাধারণ মানুষের কাছে ‘স্টার ওয়ার্স’ বা তারকা যুদ্ধ নামে ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেছিল। তবে বিপুল অর্থনৈতিক ব্যয় এবং তৎকালীন প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতার কারণে রোনাল্ড রিগ্যানের সেই অতি উচ্চাভিলাষী কর্মসূচিটি পরবর্তী সময়ে অনেকটাই সীমিত করা হয় এবং শেষ পর্যন্ত তা পুরোপুরি পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়।
সেই পুরনো কর্মসূচির অধীনে প্রস্তাবিত মহাকাশভিত্তিক সমরাস্ত্রগুলোও আর কখনোই পৃথিবীর কক্ষপথে মোতায়েন করা সম্ভব হয়নি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশভিত্তিক এসব অত্যাধুনিক সমরাস্ত্র মোতায়েন ও পরিকল্পনার তীব্র ও নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে তাদের অন্যতম প্রধান ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী রাশিয়া।
গত মার্চ মাসে রাশিয়ার বর্ষীয়ান পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভ সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের প্রস্তাবিত ‘গোল্ডেন ডোম’ পরিকল্পনার অত্যন্ত কঠোর ভাষায় নিন্দা জ্ঞাপন করেন। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের এই একক পদক্ষেপকে আন্তর্জাতিক মহাকাশের নির্লজ্জ সামরিকীকরণ হিসেবে আখ্যায়িত করেন।
সের্গেই লাভরভ বিশ্ববাসীকে হুঁশিয়ারি দিয়ে আরও বলেন যে, এই ধরনের কৌশলগত সমরাস্ত্র মোতায়েনের মার্কিন পরিকল্পনা বিশ্বব্যাপী কৌশলগত স্থিতিশীলতা এবং বৈশ্বিক শান্তির জন্য এক গভীর ও গুরুতর হুমকি স্বরূপ।
তবে মহাকাশ দখলের এবং সেখানে পেশিশক্তি প্রদর্শনের এই নতুন প্রতিযোগিতায় বিশ্বের পরাশক্তিগুলোর কেউই অবশ্য বসে নেই। আন্তর্জাতিক পরিসংখ্যান ও সামরিক তথ্য বলছে, ২০০০-এর দশকের শুরু থেকেই যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ভারত এবং রাশিয়া-এই চারটি প্রধান বৈশ্বিক পরাশক্তি সফলভাবে স্যাটেলাইট-বিধ্বংসী বা অ্যান্টি-স্যাটেলাইট সমরাস্ত্রের বাস্তব পরীক্ষা চালিয়েছে।
এর মধ্যে সাম্প্রতিক উদাহরণ হিসেবে ২০২১ সালের নভেম্বরে রুশ সামরিক বাহিনী তাদের সোভিয়েত আমলের একটি পুরোনো ও অব্যবহৃত গোয়েন্দা স্যাটেলাইটকে নিজস্ব ভূমি থেকে উৎক্ষেপিত ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে সফলভাবে ধ্বংস করে।
মহাকাশে চালানো সেই ধ্বংসযজ্ঞের পর ওই সময় রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে জানিয়েছিল যে, আন্তর্জাতিক মহাকাশ আইনের প্রতিটি ধারা কঠোরভাবে মেনেই অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে এই অভিযানটি পরিচালনা করা হয়েছে।
একইসঙ্গে তারা জোরালো দাবি করেছিল যে, তাদের এই স্যাটেলাইট ধ্বংসের মহড়া নির্দিষ্ট কোনো শত্রু দেশের বিরুদ্ধে কখনোই পরিচালিত হয়নি, বরং এটি কেবলই নিজেদের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা যাচাইয়ের একটি অংশ ছিল।
তবে আন্তর্জাতিক ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, মহাকাশে পরাশক্তিগুলোর এই ধারাবাহিক সমরাস্ত্র মোতায়েন ও ধ্বংসাত্মক মহড়া আগামী দিনে বিশ্বে এক নতুন ও ভয়াবহ স্নায়ুযুদ্ধেরই সুস্পষ্ট ইঙ্গিত দিচ্ছে।