মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষস্থানীয় প্রভাবশালী জাতীয় দৈনিক ওয়াশিংটন পোস্টের এক বিশেষ অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে এমন তথ্য উঠে এসেছে। সংবাদমাধ্যমটির বিশদ পর্যালোচনায় বলা হয়েছে, পশ্চিম এশিয়ায় তেহরানের মিত্রদের ধারাবাহিক সামরিক অগ্রগতি ও দৃঢ় অবস্থানের ফলে ওই অঞ্চলে ওয়াশিংটনের কৌশলগত অবস্থান দিন দিন আরও বেশি ভঙ্গুর ও অনিশ্চিত হয়ে পড়ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে মার্কিন প্রশাসনের জন্য এক বিপজ্জনক চোরাবালিতে রূপ নিয়েছে।
আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থাগুলোর বরাতে প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, দীর্ঘমেয়াদী এই অচলাবস্থার কারণে ওয়াশিংটন এখন কার্যত দিকভ্রান্ত। সংঘাত শুরুর প্রাক্কালে তেহরানকে দ্রুত কোণঠাসা করার যে পরিকল্পনা ট্রাম্প প্রশাসন গ্রহণ করেছিল, তা মূলত বিপরীত ফল বয়ে এনেছে।
বিশেষ করে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাণিজ্যের জন্য সবচেয়ে সংবেদনশীল ও অপরিহার্য দুটি প্রধান সামুদ্রিক পথ-হরমুজ প্রণালী এবং লোহিত সাগরের বাব এল-মান্দেব প্রণালী—কার্যত ইরানের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে।
বিশ্বের মোট জ্বালানি সরবরাহের একটি বিশাল অংশ পরিবাহিত হওয়া এই দুটি প্রধান নৌরুটে পণ্যবাহী জাহাজের স্বাভাবিক চলাচলের নিরাপত্তা এখন মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে। পরিস্থিতি আরও সংকটজনক হয়ে উঠেছে যখন হরমুজ প্রণালীকে এড়িয়ে তেল পরিবহনের বিকল্প পথ হিসেবে ব্যবহৃত সৌদি আরবের পূর্ব-পশ্চিম প্রধান পাইপলাইনটিও ধারাবাহিক হামলার ঝুঁকিতে পরিণত হয়েছে।
কৌশলগত এই গুরুত্বপূর্ণ পাইপলাইনটি লক্ষ্যবস্তু হওয়ায় বিকল্প উপায়ে নিরাপদ জ্বালানি পরিবহনের সুযোগও চরমভাবে সংকুচিত হয়ে পড়েছে। সামুদ্রিক ও স্থলপথের এই বহুমুখী অস্থিরতার তাৎক্ষণিক ও মারাত্মক প্রভাব পড়েছে আন্তর্জাতিক অপরিশোধিত তেলের বাজারে।
বাজারে তীব্র সরবরাহ ঘাটতি ও চরম অনিশ্চয়তার কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম প্রতি ব্যারেল প্রায় সত্তর মার্কিন ডলার থেকে নাটকীয়ভাবে বেড়ে একশত পাঁচ ডলারে দাঁড়িয়েছে। বৈশ্বিক এই মূল্যবৃদ্ধির প্রত্যক্ষ ও নেতিবাচক ধাক্কা আঘাত হেনেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতেও।
দেশটির ভেতরে পেট্রোলের সাধারণ খুচরা বিক্রয়মূল্য প্রতি গ্যালন প্রায় তিন ডলার থেকে বৃদ্ধি পেয়ে বর্তমানে চার ডলার ত্রিশ সেন্টে গিয়ে ঠেকেছে। এর ফলে বিশ্বজুড়ে নতুন করে মুদ্রাস্ফীতির আশঙ্কা তীব্র আকার ধারণ করেছে এবং সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রার ব্যয় আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে গিয়ে সার্বিক বৈশ্বিক অর্থনীতি এক নজিরবিহীন চাপের মুখে নিমজ্জিত হয়েছে।
ওয়াশিংটন পোস্টের প্রতিবেদনে ওয়াশিংটনের নিজস্ব সামরিক কৌশলের অভ্যন্তরীণ সীমাবদ্ধতাগুলোও বস্তুনিষ্ঠভাবে তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, দীর্ঘমেয়াদী এই লড়াইয়ের ফলে মার্কিন সামরিক বাহিনীর অত্যাধুনিক সমরাস্ত্রের মজুত আশঙ্কাজনক হারে ফুরিয়ে আসছে।
একই সঙ্গে পশ্চিম এশিয়ায় ছড়িয়ে থাকা মার্কিন সেনাঘাঁটিগুলোর ওপর যে কোনো সময় পাল্টা প্রাণঘাতী হামলার ঝুঁকি বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। এই বহুমুখী সামরিক ঝুঁকি এবং অভ্যন্তরীণ গোলাবারুদের সীমাবদ্ধতার কথা বিবেচনা করে ট্রাম্প প্রশাসন এখন সরাসরি সামরিক সংঘাতের কৌশল থেকে ধীরে ধীরে সরে আসতে বাধ্য হচ্ছে।
এর পরিবর্তে তারা আবারও কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা ও নানামুখী আর্থিক চাপ প্রয়োগের পুরোনো কৌশলের দিকে ঝুঁকছে। তবে অভিজ্ঞ আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, সামরিক ময়দানে কোনো সুস্পষ্ট সুবিধা আদায় করতে না পেরে কেবল অর্থনৈতিক অবরোধ জোরদার করে তেহরানকে নতজানু করার এই পুনরাবৃত্ত কৌশল ফলপ্রসূ হওয়ার সম্ভাবনা অত্যন্ত ক্ষীণ।
এত সব বহুমাত্রিক চাপ, সামরিক হুমকি এবং অর্থনৈতিক বিধিনিষেধের মুখেও ইরান তার ঘোষিত মৌলিক নীতি ও অবস্থানে সম্পূর্ণ অবিচল রয়েছে। ওয়াশিংটন পোস্টের বিশ্লেষণে বিশেষভাবে মন্তব্য করা হয়েছে যে, আঞ্চলিক বিভিন্ন ক্ষেত্রে ইরানের মিত্রদের ধারাবাহিক সাফল্য এবং সামরিক প্রতিরোধের সক্ষমতা মূলত আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তেহরানের রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা ও অবস্থানকে আরও সংহত করেছে।
মাঠপর্যায়ের এই বাস্তব অগ্রগতি ওয়াশিংটনের সঙ্গে সম্ভাব্য যেকোনো ভবিষ্যৎ কূটনৈতিক দর-কষাকষির টেবিলে ইরানকে অনেক বেশি সুবিধাজনক ও শক্তিশালী অবস্থানে পৌঁছে দিয়েছে।
একতরফা সামরিক শক্তি প্রদর্শনের মাধ্যমে সংকট নিরসন করতে গিয়ে মার্কিন প্রশাসন আজ যে কূটনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক সংকটে নিপতিত হয়েছে, তা কেবল দেশটির আন্তর্জাতিক নেতৃত্বকেই প্রশ্নবিদ্ধ করছে না, বরং সমগ্র বিশ্বের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাকেও এক গভীর অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।