আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এই যুদ্ধের কারণে খোদ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাধারণ নাগরিকদের ওপর দৃশ্যমান ও অদৃশ্য-উভয় ধরনেরই ব্যাপক এবং সুদূরপ্রসারী নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। এই সংঘাতের অন্যতম প্রধান ও উদ্বেগজনক দিক হলো, যুদ্ধের প্রকৃত ব্যয়ের একটি বিশাল অংশ সম্পূর্ণ পরোক্ষভাবে সাধারণ মার্কিন সমাজের কাঁধে চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে অস্থিতিশীলতা, আকাশচুম্বী মূল্যস্ফীতি, বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থায় মারাত্মক বিঘ্ন, সাধারণ পরিবারের ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস এবং সরকারি ব্যয়ের লাগামহীন বৃদ্ধির মাধ্যমে এই বিপুল আর্থিক বোঝা শেষ পর্যন্ত সাধারণ করদাতাদেরই বহন করতে হচ্ছে।
যুদ্ধের ময়দান থেকে হাজার হাজার মাইল দূরে থাকলেও একজন সাধারণ নাগরিক তার প্রাত্যহিক জীবনে এই যুদ্ধের উত্তাপ সরাসরি অনুভব করছেন। যুদ্ধের এই অদৃশ্য বা পরোক্ষ ব্যয়ের একটি অত্যন্ত ভয়াবহ চিত্র সম্প্রতি ব্রাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণায় উঠে এসেছে, যা বিখ্যাত মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওসের একটি বিশেষ প্রতিবেদনেও গুরুত্বের সঙ্গে উল্লেখ করা হয়েছে।
ওই পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সংঘাতের জেরে বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ায় এরই মধ্যে মার্কিন ভোক্তাদের ওপর প্রায় ১০০ বিলিয়ন ডলারের অতিরিক্ত ব্যয়ের বিশাল বোঝা চেপে বসেছে এবং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই অঙ্ক অত্যন্ত দ্রুতগতিতে বৃদ্ধি পাচ্ছে।
এর সহজ অর্থ হলো, সরাসরি কোনো সামরিক কার্যক্রমে অংশ না নিয়েও একজন সাধারণ আমেরিকান নাগরিক যখন তার ব্যক্তিগত গাড়িতে জ্বালানি ভরেন, দৈনন্দিন মুদি বাজার করেন কিংবা সাধারণ পরিবহন ব্যয় মেটান, তখনই তিনি নিজের অজান্তে এই যুদ্ধের চরম মূল্য পরিশোধ করেন।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো একটি বৃহৎ অর্থনীতিতে জ্বালানি তেলের দামের এই অস্থিতিশীলতা শুধু একটি খাতেই সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং তা পুরো অর্থনীতির প্রতিটি স্তরে এক ভয়াবহ ধারাবাহিক প্রভাব তৈরি করে।
বিশেষ করে বৈশ্বিক বাজারে ডিজেলের দাম বৃদ্ধির বিষয়টি মার্কিন অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত স্পর্শকাতর। কারণ, যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ পণ্য পরিবহনের সঙ্গে যুক্ত বিপুলসংখ্যক বিশালাকার ট্রাক, কৃষিকাজে ব্যবহৃত ভারী যন্ত্রপাতি এবং সামগ্রিক সরবরাহ ও লজিস্টিকস কার্যক্রম প্রায় পুরোটাই ডিজেলের ওপর নির্ভরশীল।
ফলে ডিজেলের দাম সামান্য বৃদ্ধি পেলেও তার প্রথম ও সরাসরি প্রভাব পড়ে পণ্য পরিবহন বা লজিস্টিকস ব্যয়ের ওপর। পরিবহন খরচ বেড়ে গেলে সেই অতিরিক্ত ব্যয় খুব স্বাভাবিকভাবেই খাদ্যপণ্য, নিত্যপ্রয়োজনীয় ভোগ্যপণ্য ও অন্যান্য সেবার চূড়ান্ত মূল্যের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়।
ফলশ্রুতিতে, একজন কৃষককে ফসল ফলাতে ও কাটতে যেমন বাড়তি অর্থ গুনতে হয়, তেমনি ট্রাকচালককে পণ্য পরিবহনে এবং খুচরা বিক্রেতাকে পাইকারি বাজার থেকে পণ্য কিনতেও আগের চেয়ে অনেক বেশি খরচ করতে হয়।
এভাবেই মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধক্ষেত্র থেকে বহু দূরে অবস্থান করেও যুক্তরাষ্ট্রে একটি ভয়াবহ মূল্যবৃদ্ধির চক্র তৈরি হয়, যার চূড়ান্ত ও নিষ্ঠুর প্রভাব গিয়ে পড়ে সাধারণ মার্কিন পরিবারের দৈনন্দিন বাজারের ঝুড়িতে।
ফলে ব্রাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের উল্লেখিত ১০০ বিলিয়ন ডলারের হিসাবটি মূলত জ্বালানি বাজারের দৃশ্যমান ব্যয়ের একটি ক্ষুদ্র অংশ মাত্র; মূল্যস্ফীতি ও মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ার মতো দ্বিতীয় পর্যায়ের প্রভাবগুলো আরও অনেক বেশি ধ্বংসাত্মক।
অর্থনৈতিক এই পরোক্ষ প্রভাবের পাশাপাশি মার্কিন সামরিক বাহিনীর প্রত্যক্ষ ব্যয়ও কোনো অংশে কম নয়। ইরানের মতো একটি শক্তিশালী রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ব্যাপক সামরিক অভিযান পরিচালনার অর্থ হলো-বিপুলসংখ্যক প্রতিরোধী ও আক্রমণাত্মক ক্ষেপণাস্ত্র, নির্ভুল নিশানাভেদী স্মার্ট বোমা, বিপুল পরিমাণ উড়োজাহাজের জ্বালানি, যন্ত্রাংশ ও অন্যান্য লজিস্টিক সহায়তা নিরবচ্ছিন্নভাবে ব্যবহার করা।
যুদ্ধক্ষেত্রে কোনো মার্কিন যুদ্ধবিমান বা প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ধ্বংস না হলেও, প্রতিদিনের অভিযানে যে বিপুল পরিমাণ মূল্যবান গোলাবারুদ ব্যবহৃত হয়, তা পুনরায় উৎপাদন করে সামরিক মজুত বা ভাণ্ডার পুনর্গঠন করতে পেন্টাগনকে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার ব্যয় করতে হবে।
এর পাশাপাশি, শত্রুর হামলায় সামরিক ঘাঁটি, যোগাযোগকেন্দ্র বা অন্যান্য সরঞ্জাম ক্ষতিগ্রস্ত হলে সেগুলো মেরামত বা প্রতিস্থাপন করার জন্যও প্রতিরক্ষা বাজেট থেকে বিপুল অঙ্কের অর্থ বরাদ্দ করতে হয়। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাজেট যতই বিশাল হোক না কেন, তা মোটেও সীমাহীন নয়।
ইরান যুদ্ধের পেছনে এই অতিরিক্ত অর্থ ব্যয়ের সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়বে মার্কিন নৌবাহিনীর আধুনিকায়ন, নতুন সামরিক প্রযুক্তির গবেষণা এবং বিশ্বের অন্যান্য প্রান্তের সম্ভাব্য হুমকি মোকাবিলার প্রস্তুতির ওপর। অর্থনীতি ও সামরিক বিজ্ঞানের ভাষায় যাকে 'সুযোগ ব্যয়' বলা হয়, যুদ্ধের প্রকৃত ব্যয় নির্ধারণের ক্ষেত্রে সেটি বিবেচনায় নেওয়া অত্যন্ত জরুরি।
সামরিক ও অর্থনৈতিক হিসাবের বাইরেও এই যুদ্ধের এমন কিছু সুদূরপ্রসারী ব্যয় রয়েছে, যা আনুষ্ঠানিক নথিপত্রে সরাসরি প্রতিফলিত হয় না। জ্বালানি ও খাদ্যের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম বৃদ্ধি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মানকে সরাসরি নিচে নামিয়ে দেয়, যা খুব দ্রুত একটি দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে প্রধান ইস্যু হয়ে দাঁড়ায়।
যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, জ্বালানি তেলের দাম এমন একটি স্পর্শকাতর বিষয়, যা সাধারণ ভোটাররা প্রতিদিন প্রত্যক্ষ করেন। যুদ্ধ যত বেশি দীর্ঘায়িত হবে, মার্কিন সরকারের ঘোষিত ভূরাজনৈতিক লক্ষ্য এবং সাধারণ মানুষকে বহন করতে হওয়া দৈনন্দিন অর্থনৈতিক কষ্টের মধ্যকার ব্যবধান তত বেশি বাড়তে থাকবে, যা শেষ পর্যন্ত ক্ষমতাসীন প্রশাসনের জন্য মারাত্মক রাজনৈতিক বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।
অন্যদিকে, মধ্যপ্রাচ্যের এই ব্যাপক যুদ্ধের কারণে বহুজাতিক কোম্পানিগুলো বাণিজ্যিক জাহাজের বিমা ব্যয় বাড়াতে বাধ্য হয়, নিরাপদ বাণিজ্যিক রুট খুঁজতে গিয়ে পরিবহন খরচ বাড়ে এবং বিনিয়োগকারীরা নতুন বিনিয়োগের ক্ষেত্রে চরম সতর্ক অবস্থান নেন।
এর ফলে মার্কিন অর্থনীতিতে এক ধরনের গভীর আস্থার সংকট তৈরি হয়, যা আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো মন্দা না ডাকলেও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতিকে মারাত্মকভাবে শ্লথ করে দেয়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও উদ্বেগজনক বিষয়টি হলো, কোনো রাজনৈতিক সমঝোতা বা যুদ্ধবিরতি চুক্তি স্বাক্ষরিত হলেই যে এই যুদ্ধের অর্থনৈতিক রক্তক্ষরণ হঠাৎ করে বন্ধ হয়ে যাবে, বিষয়টি মোটেও তেমন নয়।
যুদ্ধপরবর্তী সময়ে ক্ষতিগ্রস্ত সামরিক ও বেসামরিক অবকাঠামো পুনর্নির্মাণ, ব্যবহৃত বা ধ্বংস হওয়া যুদ্ধবিমান ও গোলাবারুদ প্রতিস্থাপন, শূন্য হয়ে যাওয়া অস্ত্রের মজুত পুনরায় পরিপূর্ণ করা এবং মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন ঘাঁটিতে মোতায়েন রাখা হাজার হাজার সেনার দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় মেটাতে যুক্তরাষ্ট্রের আরও কয়েক বছর সময় লেগে যেতে পারে।
একইভাবে, আন্তর্জাতিক জ্বালানি খাতের উৎপাদন সক্ষমতা পুনর্গঠন করে বাজারকে আগের মতো স্থিতিশীল ও স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনতেও দীর্ঘ সময়ের প্রয়োজন হবে। ফলে এই যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রের কাঁধে এমন একটি দীর্ঘমেয়াদি ও বিপুল আর্থিক বোঝা চাপিয়ে দেবে, যার দায়ভার কেবল বর্তমান নয়, বরং আগামী প্রজন্মের মার্কিন নাগরিকদেরও বহন করতে হবে।
সামগ্রিকভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের ব্যয়কে সরাসরি সামরিক ব্যয়, জ্বালানি ও মূল্যস্ফীতিজনিত অর্থনৈতিক ব্যয় এবং সম্পদ ক্ষয়জনিত কৌশলগত ব্যয়-এই তিনটি স্তরে ভাগ করা যায়।
ওয়াশিংটনের বিশাল আর্থিক সক্ষমতা হয়তো প্রাথমিকভাবে এই ব্যয় বহনের জন্য যথেষ্ট, কিন্তু মূল প্রশ্ন হলো, যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে এর বিপুল বোঝা কি শেষ পর্যন্ত মার্কিন পরিবার ও সাধারণ অর্থনীতির মেরুদণ্ড ভেঙে দেবে না?
তাই সংঘাত যত দীর্ঘ হবে, সামরিক সাফল্যের পাশাপাশি এই অমোঘ প্রশ্নটিই সবচেয়ে বড় হয়ে দেখা দেবে যে-এই যুদ্ধ থেকে অর্জিত ভূরাজনৈতিক অর্জন কি সাধারণ মার্কিন জনগণের দেওয়া অর্থনৈতিক, সামাজিক ও কৌশলগত চরম মূল্যের তুলনায় আদৌ যথেষ্ট?