যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতার ২৫০তম বার্ষিকী উদযাপনের এক ঐতিহাসিক মুহূর্তে বুধবার মার্কিন সরকারি টাকশাল বা ইউএস মিন্ট আনুষ্ঠানিকভাবে ট্রাম্পের অবয়ব সংবলিত এই বিশেষ এক ডলারের মুদ্রাটি উন্মোচন করে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো এই ঘটনাকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে প্রচার করছে।
নতুন উন্মোচিত এই মুদ্রার নকশাটি বেশ নজরকাড়া ও তাৎপর্যপূর্ণ। মুদ্রার সামনের অংশে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সুস্পষ্ট প্রতিকৃতি খোদাই করা রয়েছে। এর পাশাপাশি মার্কিন ঐতিহ্যের প্রতীক হিসেবে ইংরেজি হরফে ‘লিবার্টি’ এবং ‘ইন গড উই ট্রাস্ট’ শব্দগুচ্ছ অত্যন্ত নিপুণভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।
মার্কিন টাকশাল কর্তৃপক্ষ এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে স্পষ্ট করে জানিয়েছে যে, এই মুদ্রা দৈনন্দিন সাধারণ কেনাকাটা বা ব্যাপক বাণিজ্যিক বিনিময়ের উদ্দেশ্যে বাজারে ছাড়ার জন্য তৈরি করা হয়নি। এটি মূলত স্মারক হিসেবে সংরক্ষণ করার জন্যই প্রকাশ করা হয়েছে।
তবে কোনো ক্রেতা যদি সাধারণ কেনাকাটায় এই মুদ্রাটি ব্যবহার করতে চান, তবে তা আইনগতভাবে সম্পূর্ণ বৈধ অর্থ হিসেবেই সর্বত্র গণ্য ও গৃহীত হবে। যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল আইনের একটি দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য হলো, পদে থাকা কোনো জীবিত ব্যক্তির ছবি দেশের সরকারি মুদ্রায় প্রকাশ করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
এই নিয়মটি যুগ যুগ ধরে কঠোরভাবে অনুসরণ করা হয়ে আসছে। তবে এবার দেশটির ২৫০তম স্বাধীনতা বার্ষিকী উদযাপনের উদ্দেশ্যে প্রণীত আইনের বিশেষ নকশা সংক্রান্ত একটি ধারার সুযোগ ব্যবহার করে সেই প্রচলিত আইনি নিষেধাজ্ঞাকে সুকৌশলে অতিক্রম করা হয়েছে।
মার্কিন প্রশাসনের পক্ষ থেকে এই মুদ্রার ক্ষেত্রে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে পাস হওয়া ‘সার্কুলেটিং কালেক্টেবল কয়েন রিডিজাইন অ্যাক্ট ২০২০’-এর একটি সুস্পষ্ট আইনি ব্যাখ্যাও জনসমক্ষে তুলে ধরা হয়েছে।
এই আইনের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, মুদ্রার পেছনের পিঠে কোনো জীবিত ব্যক্তির ছবি ব্যবহার করা আইনত নিষিদ্ধ হলেও সামনের পিঠের ক্ষেত্রে এমন কোনো সুস্পষ্ট বিধিনিষেধ বা বাধা নেই। আর ঠিক এই আইনি ফাঁকফোকর কাজে লাগিয়েই ট্রাম্পের প্রতিকৃতিটি এক ডলারের এই নতুন মুদ্রার সামনের পিঠেই স্থাপন করা হয়েছে।
এই স্মারক মুদ্রাটি প্রকাশের পরপরই সংগ্রাহকদের মধ্যে অভূতপূর্ব সাড়া জাগিয়েছে। ইউএস মিন্টের নির্ধারিত মূল্য অনুযায়ী, সংগ্রাহকদের জন্য তৈরি পঁচিশটি মুদ্রার একটি রোলের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ৬১ মার্কিন ডলার। অন্যদিকে, একশটি মুদ্রার একটি ব্যাগের দাম রাখা হয়েছে ১৫৪ দশমিক ৫০ ডলার।
বিক্রির জন্য উন্মুক্ত করার মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ইউএস মিন্টের অফিশিয়াল ওয়েবসাইটে মুদ্রাগুলোর সম্পূর্ণ স্টক শেষ হয়ে যায়। শুধু অনলাইনে নয়, ওয়াশিংটন ডিসিতে অবস্থিত ইউএস মিন্টের নিজস্ব বিক্রয়কেন্দ্রের স্বয়ংক্রিয় ভেন্ডিং মেশিনগুলোতেও সাধারণ ক্রেতা ও মুদ্রা সংগ্রাহকদের উপচে পড়া ভিড় আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর ক্যামেরায় ধরা পড়েছে।
ইউএস মিন্ট তাদের এক বিবৃতিতে এই মুদ্রার ঐতিহাসিক গুরুত্ব তুলে ধরে বলেছে, জাতীয় পর্যায়ের এই ঐতিহাসিক মাইলফলক উদযাপনের সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যেই স্মারক মুদ্রাটি অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে তৈরি করা হয়েছে।
বিরল ও দৃষ্টিনন্দন নকশায় তৈরি এই মুদ্রাটি খুব দ্রুতই আধুনিক মুদ্রা সংগ্রাহকদের পছন্দের তালিকার একেবারে শীর্ষে নিজেদের জায়গা করে নেবে বলে কর্তৃপক্ষ দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে। মুদ্রাটি বাহ্যিকভাবে অত্যন্ত আকর্ষণীয় সোনালী রঙের হলেও এর ভেতরে কোনো খাঁটি সোনার অস্তিত্ব নেই।
টাকশালের দেওয়া সুনির্দিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, এই মুদ্রাটির ধাতুগত মিশ্রণে রয়েছে ৮৮ দশমিক ৫ শতাংশ তামা। আর বাকি অংশটুকু দস্তা, ম্যাঙ্গানিজ ও নিকেলের একটি সুনির্দিষ্ট মিশ্রণের মাধ্যমে তৈরি করা হয়েছে, যা মুদ্রাকে দীর্ঘস্থায়ীত্ব ও উজ্জ্বলতা প্রদান করবে।
এই মুদ্রার পাশাপাশি মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয় আরও কিছু যুগান্তকারী পদক্ষেপ নেওয়ার পরিকল্পনা করছে। গত মে মাসে যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট গণমাধ্যমকে জানিয়েছিলেন যে, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রতিকৃতি সংবলিত একটি ২৫০ ডলারের নতুন ব্যাংক নোট প্রকাশের একটি বড় পরিকল্পনা অর্থ মন্ত্রণালয়ের বিবেচনাধীন রয়েছে।
সে সময় স্কট বেসেন্ট ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে কোনো জীবিত প্রেসিডেন্টের ছবি মুদ্রায় স্থান পাওয়ার ঘটনা এটিই প্রথম নয়। এর আগে ১৯২৬ সালে আমেরিকার স্বাধীনতা লাভের ১৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষ্যে প্রকাশিত আধা-ডলারের একটি স্মারক মুদ্রায় তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ক্যালভিন কুলিজের ছবি একইভাবে ব্যবহার করা হয়েছিল।
এর আগে গত মার্চ মাসে মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয় এক ঘোষণায় জানিয়েছিল যে, যুক্তরাষ্ট্রের সাধারণ কাগজের নোটে খুব শিগগিরই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের নিজস্ব স্বাক্ষর যুক্ত করা হবে। দায়িত্বপ্রাপ্ত কোনো বর্তমান প্রেসিডেন্টের ক্ষেত্রে মার্কিন মুদ্রায় সরাসরি স্বাক্ষর স্থান পাওয়ার ঘটনাও দেশটির দীর্ঘ ইতিহাসে এই প্রথমবার ঘটতে যাচ্ছে।
আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা বিবিসি ও এপি-র প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই ধরনের ধারাবাহিক পদক্ষেপগুলো প্রমাণ করে যে মার্কিন প্রশাসন তাদের রাষ্ট্রীয় প্রতীক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে বর্তমান নেতৃত্বের দৃশ্যমান উপস্থিতি আরও সুসংহত করতে চাইছে।