এই প্রশ্নটিকে সম্পূর্ণ অযৌক্তিক ও ‘নির্বোধের মতো প্রশ্ন’ হিসেবে আখ্যায়িত করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেন, ইরানের সামরিক সক্ষমতা ইতোমধ্যে সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করা হয়েছে, তাই সেখানে নতুন করে চরম ধ্বংসাত্মক কোনো অস্ত্র ব্যবহারের কোনো যৌক্তিকতা বা প্রয়োজনীয়তা অবশিষ্ট নেই।
মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম মিডল ইস্ট আই-এর একটি সাম্প্রতিক প্রতিবেদন থেকে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য জানা গেছে। সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকের ওই স্পর্শকাতর প্রশ্নের জবাবে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প অত্যন্ত বিরক্তি প্রকাশ করে বলেন যে, তিনি সাধারণত এই ধরনের ভিত্তিহীন প্রশ্নের উত্তর দেওয়াই এড়িয়ে চলেন, তবে পরিস্থিতি পরিষ্কার করার স্বার্থেই তিনি এর উত্তর দিচ্ছেন।
তিনি স্পষ্টভাবে জানান যে, হ্যাঁ, তিনি ইরানের ওপর পারমাণবিক হামলার কোনো চিন্তাভাবনা আর করছেন না। মার্কিন প্রেসিডেন্ট দৃঢ়তার সঙ্গে বলেন, "এখন পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের কোনো প্রয়োজনই নেই। সত্যিকার অর্থে এটি একটি চরম নির্বোধের মতো প্রশ্ন। ইরান সামরিকভাবে সম্পূর্ণ পরাজিত হয়েছে।
আমি তাদের যুদ্ধে হারিয়েছি, এখন তাদের ওপর কেন আমার পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার করা উচিত? কী অদ্ভুত এবং বোকা প্রশ্ন এটি!" ট্রাম্পের এই মন্তব্য থেকে স্পষ্ট বোঝা যায় যে তিনি প্রচলিত সামরিক বিজয়েই সন্তুষ্ট এবং অকারণে পারমাণবিক উত্তেজনা বাড়াতে আগ্রহী নন।
তবে আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, সাংবাদিকের এই প্রশ্নটি একেবারে ভিত্তিহীন বা আকস্মিক ছিল না। কারণ, এর আগে বিভিন্ন সময়ে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজেই একাধিকবার ইরানের বিরুদ্ধে প্রয়োজনে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের মতো চরম পদক্ষেপ নেওয়ার প্রচ্ছন্ন হুমকি দিয়েছিলেন।
তার সেই পূর্ববর্তী বক্তব্যগুলোর কারণেই আন্তর্জাতিক অঙ্গন ও গণমাধ্যমকর্মীদের মধ্যে এই বিষয়ে এক ধরনের গভীর ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছিল। ওই নারী সাংবাদিক মূলত জনমনে থাকা সেই বিভ্রান্তি পরিষ্কার করার জন্যই প্রশ্নটি উত্থাপন করেছিলেন।
যদিও বর্তমান পরিস্থিতিতে মার্কিন প্রশাসন তাদের আগের কঠোর অবস্থান থেকে সরে এসে প্রচলিত যুদ্ধজয়ের ওপরই বেশি জোর দিচ্ছে বলে প্রতীয়মান হচ্ছে। এই রাজনৈতিক বাকবিতণ্ডা ও উত্তেজনার পেছনে রয়েছে দীর্ঘ ও রক্তক্ষয়ী এক সংঘাতের সাম্প্রতিক ইতিহাস।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র এবং তাদের মিত্র রাষ্ট্র ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানের ওপর এক বৃহত্তর সামরিক অভিযান শুরু করে। এই নজিরবিহীন অভিযানের ফলে মধ্যপ্রাচ্যে এক ভয়াবহ যুদ্ধের সূচনা হয়, যা টানা ৪০ দিন ধরে অব্যাহত থাকে।
এই দীর্ঘ ও ধ্বংসাত্মক যুদ্ধে উভয় পক্ষেরই ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হলেও, মার্কিন ও ইসরায়েলি বাহিনীর অত্যাধুনিক সমরাস্ত্র এবং নিরবচ্ছিন্ন বিমান হামলার মুখে ইরানের সামরিক ও কৌশলগত অবকাঠামো ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের দাবি অনুযায়ী, এই ৪০ দিনের যুদ্ধের মাধ্যমেই মূলত ইরানের সামরিক মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়া হয়েছে, যা তাদের আক্রমণ করার সক্ষমতাকে পঙ্গু করে দিয়েছে। টানা ৪০ দিনের এই ভয়াবহ যুদ্ধের পর আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ব্যাপক চাপ ও মধ্যস্থতায় এবং মানবিক পরিস্থিতি বিবেচনায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি ৬০ দিনব্যাপী সাময়িক যুদ্ধবিরতি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।
এই চুক্তির ফলে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধবিধ্বস্ত অঞ্চলগুলোতে কিছুটা স্বস্তি ফিরে এসেছিল এবং কূটনৈতিক সমাধানের একটি ক্ষীণ আশা তৈরি হয়েছিল। সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে বিশ্বনেতারা আশা করেছিলেন যে এই সময়ের মধ্যে একটি স্থায়ী শান্তিচুক্তি সম্ভব হবে। তবে অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয় হলো, সেই ৬০ দিনের যুদ্ধবিরতির মেয়াদ ইতোমধ্যে শেষ হয়ে গেছে।
চুক্তি নবায়ন বা স্থায়ী শান্তির কোনো কার্যকর উদ্যোগ না থাকায় ওই অঞ্চলে আবারও যুদ্ধের কালো মেঘ ঘনীভূত হচ্ছে। যুদ্ধবিরতির মেয়াদ শেষ হওয়ার পর দুই দেশের মধ্যে আনুষ্ঠানিক ও সর্বাত্মক যুদ্ধের তীব্রতা সামগ্রিকভাবে কিছুটা কমে গেলেও, সীমান্ত এবং কৌশলগত অবস্থানগুলোতে উত্তেজনা এখনো প্রবলভাবে বিরাজমান।
এর সুস্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায় গত রোববার ঘটে যাওয়া এক নতুন সংঘাতের মাধ্যমে। ওই দিন দুই পক্ষের মধ্যে আবারও সীমিত পরিসরে হামলা ও পাল্টা হামলার ঘটনা ঘটেছে, যা প্রমাণ করে যে সংঘাতের মূল কারণগুলো এখনো পুরোপুরি অমীমাংসিত রয়ে গেছে।
আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা আশঙ্কা করছেন, দ্রুততম সময়ের মধ্যে স্থায়ী কোনো কূটনৈতিক সমাধান নিশ্চিত করা না গেলে মধ্যপ্রাচ্যের এই ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা যেকোনো সময় আবারও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে।