শুক্রবার, সেপ্টেম্বর ৪, ২০২৬
২০ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

যুক্তরাষ্ট্রে জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব লাভ কঠিন হচ্ছে!

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ০২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০৬:২৪ পিএম

যুক্তরাষ্ট্রে জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব লাভ কঠিন হচ্ছে!
ছবি : Collected

যুক্তরাষ্ট্রে জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব পাওয়ার দীর্ঘদিনের আইনি অধিকারকে সীমিত করার লক্ষ্যে নতুন করে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে যাচ্ছে দেশটির বর্তমান প্রশাসন। এখন থেকে যুক্তরাষ্ট্রে জন্মগ্রহণকারী সন্তানদের পাসপোর্টের আবেদন করার সময় মা-বাবাকে নিজেদের নাগরিকত্ব অথবা বর্তমান অভিবাসন অবস্থার বৈধ প্রমাণপত্র জমা দিতে হবে।

 

মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের প্রস্তাবিত এই নতুন নির্দেশনার ফলে অভিবাসীদের জন্য দেশটিতে নাগরিকত্ব অর্জনের পথ আরও কঠিন ও জটিল হয়ে উঠবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের গত ৬ আগস্ট জারি করা একটি নির্বাহী আদেশ বাস্তবায়নের প্রাথমিক রূপরেখা হিসেবেই এই যুগান্তকারী পরিবর্তনটি আনা হচ্ছে।

 

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম রয়টার্সের এক বিস্তারিত প্রতিবেদনে সম্প্রতি এই তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে। পররাষ্ট্র দপ্তরের নতুন এই প্রস্তাবনার মূল লক্ষ্য হলো ‘বার্থ ট্যুরিজম’ বা কেবল সন্তান জন্মদানের উদ্দেশ্যে যুক্তরাষ্ট্রে ভ্রমণ করে নাগরিকত্ব অর্জনের প্রবণতা পুরোপুরি বন্ধ করা।

 

একই সঙ্গে জন্মসূত্রে পাওয়া নাগরিকত্বের ক্ষেত্রে ঐতিহাসিক কিছু ব্যতিক্রম নিয়মের পরিধি বৃদ্ধি করাও এই আদেশের অন্যতম উদ্দেশ্য। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের মুখপাত্র টমি পিগট রয়টার্সকে দেওয়া এক বিশেষ বিবৃতিতে এই নীতির সপক্ষে যুক্তি তুলে ধরেন।

 

তিনি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে জানান যে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর প্রশাসনের পক্ষ থেকে এই বার্তাটি নিশ্চিত করেছেন যে, মার্কিন নাগরিকত্বের প্রকৃত অর্থ, পবিত্রতা ও মর্যাদা যেকোনো মূল্যে রক্ষা করা হবে।

 

পাসপোর্ট ইস্যু করার চূড়ান্ত প্রক্রিয়াটি এই নতুন নিয়মের আওতাভুক্ত করা হয়েছে, যাতে প্রতিটি আবেদনকারী যথাযথভাবে নাগরিকত্বের মানদণ্ড মেনে চলছেন কি না, তা অত্যন্ত নিখুঁতভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়।

 

প্রস্তাবিত নতুন বিধিনিষেধগুলো যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান পাসপোর্ট আবেদন প্রক্রিয়ায় আমূল পরিবর্তন আনবে। দেশটির প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে জন্মগ্রহণকারী কোনো নাবালক সন্তানের পাসপোর্টের আবেদন করার সময় মা-বাবাকে কেবল সেই সন্তানের সঙ্গে নিজেদের সম্পর্কের প্রমাণ এবং সরকার স্বীকৃত যেকোনো ছবিযুক্ত বৈধ পরিচয়পত্র জমা দিলেই চলত।

 

বর্তমান আবেদন ফরমে মা-বাবার নাগরিকত্বের প্রাথমিক তথ্য জানতে চাওয়া হলেও, নিজেদের অভিবাসন অবস্থার সপক্ষে কোনো আইনি কাগজপত্র বা প্রামাণ্য দলিল জমা দেওয়ার আইনি বাধ্যবাধকতা ছিল না। কিন্তু পররাষ্ট্র দপ্তরের নতুন খসড়া নির্দেশনায় এই সহজ নিয়মটিকে সম্পূর্ণভাবে বাতিল করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।

 

নতুন নির্দেশনায় ট্রাম্পের নির্বাহী আদেশের সূত্র উল্লেখ করে বলা হয়েছে, আবেদনকারী ব্যক্তি এই আদেশের শর্তাবলি পূরণ করেন কি না, তা নিশ্চিত করতে এখন থেকে মা-বাবার বিস্তারিত তথ্য এবং তাদের নাগরিকত্ব বা বৈধ অভিবাসন সংক্রান্ত প্রামাণ্য দলিল কঠোরভাবে যাচাই করা হবে।

 

এই প্রস্তাবিত আইনটি আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যকর হলে, সন্তানদের পাসপোর্টের আবেদন করার সময় সকল মা-বাবা অথবা আইনি অভিভাবককে নিজেদের নাগরিকত্বের অকাট্য প্রমাণপত্র প্রদর্শন করতে হবে।

 

এই প্রমাণপত্রের তালিকায় থাকতে পারে বৈধ মার্কিন পাসপোর্ট, জন্মসনদ অথবা অভিবাসন সংক্রান্ত নির্ভরযোগ্য কোনো নথি, যেমন- আই-৯৪ ফরম কিংবা স্থায়ীভাবে বসবাসের অনুমতিপত্র বা গ্রিন কার্ড।

 

পররাষ্ট্র দপ্তরের প্রস্তাবনায় আরও উল্লেখ করা হয়েছে যে, সরকার এই সমস্ত তথ্য অত্যন্ত সুচারুভাবে যাচাই-বাছাই করার পরেই চূড়ান্তভাবে নির্ধারণ করবে যে নতুন আদেশের অধীনে ওই শিশুটি যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্ব পাওয়ার যোগ্য কি না।

 

এই নির্দেশনার ফলে মূলত সেসব অভিভাবকের সন্তানরা নাগরিকত্বের অধিকার থেকে সরাসরি বঞ্চিত হবে, যারা বিদেশি কোনো সরকারের হয়ে যুক্তরাষ্ট্রে কাজ করেন, নাগরিকত্ব পাওয়ার উদ্দেশ্যে জালিয়াতি বা কোনো প্রকার অনৈতিক বাণিজ্যিক লেনদেনের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন, অথবা মার্কিন প্রশাসনের দৃষ্টিতে যারা শত্রুভাবাপন্ন বিদেশি নাগরিক হিসেবে চিহ্নিত।

 

এদিকে, জন্মসূত্রে পাওয়া নাগরিকত্বের অধিকারকে সীমিত করার এই সরকারি উদ্যোগের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রে তীব্র আইনি লড়াই শুরু হয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসনের একের পর এক কঠোর পদক্ষেপের মধ্যেই নতুন এই পাসপোর্ট বিধির প্রস্তাব সামনে আসায় নাগরিক অধিকার নিয়ে কাজ করা আইনজীবীরা আদালতের দ্বারস্থ হয়েছেন।

 

প্রাথমিক নির্বাহী আদেশের কারণে যেসব শিশু তাদের জন্মগত নাগরিকত্ব সুবিধা থেকে চিরতরে বঞ্চিত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়েছে, তাদের পক্ষে আইনজীবীরা একটি দলগত মামলা বা ‘ক্লাস-অ্যাকশন লসুট’ দায়ের করেছেন।

 

এই আদেশের আইনি বাস্তবায়ন যেকোনো মূল্যে ঠেকাতে তারা দুজন আলাদা ফেডারেল বিচারকের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন। এই মামলাগুলোর মধ্যে একটি বর্তমানে মার্কিন বিচারক ডেবোরা বোর্ডম্যানের আদালতে বিচারাধীন রয়েছে, যিনি পূর্ববর্তী ডেমোক্রেটিক প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের শাসনামলে নিয়োগপ্রাপ্ত হয়েছিলেন।

 

সম্প্রতি মেরিল্যান্ডের গ্রিনবেল্টে অনুষ্ঠিত এই মামলার এক গুরুত্বপূর্ণ শুনানিতে বিচারক বোর্ডম্যান ট্রাম্প প্রশাসনের এই আদেশকে একটি নজিরবিহীন সিদ্ধান্ত হিসেবে উল্লেখ করে গভীর অসন্তোষ প্রকাশ করেন।

 

নাগরিকত্বের মতো একটি মৌলিক অধিকার হরণের এই প্রচেষ্টাকে স্থগিত করা যায় কি না, তা আইনিভাবে বিবেচনা করার জন্য তিনি বাদীপক্ষকে তাদের মূল মামলায় প্রয়োজনীয় সংশোধনী আনার বিশেষ অনুমতিও প্রদান করেছেন।

 

তবে এর বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগের আইনজীবীরা আদালতে যুক্তি উপস্থাপন করে বলেছেন যে, ট্রাম্পের নির্বাহী আদেশটি মাঠপর্যায়ে ঠিক কীভাবে বাস্তবায়িত হবে, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলো এখন পর্যন্ত কোনো চূড়ান্ত বা আনুষ্ঠানিক নীতি প্রকাশ করেনি।

 

সুতরাং, এই প্রাথমিক পর্যায়ে আদালতের পক্ষ থেকে কোনো বিচারিক স্থগিতাদেশ দেওয়া সম্পূর্ণ অনুচিত হবে এবং এই মামলাটি অত্যন্ত তড়িঘড়ি করে দায়ের করা হয়েছে বলে তারা দাবি করেন।

 

যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণে বর্তমান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেওয়া ব্যাপক ও কঠোর পদক্ষেপগুলোর মধ্যে অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকারের বিষয় হলো জন্মসূত্রে পাওয়া এই নাগরিকত্ব সুবিধা সীমিত করা।

 

যদিও তাঁর প্রশাসনের এর আগের অনুরূপ একটি প্রচেষ্টাকে যুক্তরাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আদালত সুপ্রিম কোর্ট অসাংবিধানিক বলে বাতিল করে দিয়েছিলেন। ট্রাম্পের সেই প্রাথমিক নির্বাহী আদেশে বলা হয়েছিল, কেবল সেই সব শিশু জন্মসূত্রে স্বয়ংক্রিয়ভাবে মার্কিন নাগরিকত্ব লাভের যোগ্য হবে, যাদের মা-বাবার অন্তত একজন আগে থেকেই বৈধ মার্কিন নাগরিক অথবা গ্রিন কার্ডধারী হিসেবে দেশটিতে স্থায়ীভাবে বসবাসের আইনি অনুমতিপ্রাপ্ত।

 

কিন্তু সুপ্রিম কোর্টের বিচার বেঞ্চ ৬-৩ ভোটের এক ঐতিহাসিক রায়ে ট্রাম্পের সেই আদেশটিকে সম্পূর্ণ বেআইনি বলে ঘোষণা করেন। সুপ্রিম কোর্টের বিচারকদের একটি বড় অংশ তাদের রায়ে সুস্পষ্টভাবে মত দিয়েছিলেন যে, ট্রাম্প প্রশাসনের এই সিদ্ধান্তটি যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের ১৪তম সংশোধনীর নাগরিকত্ব বিষয়ক অনুচ্ছেদের সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক ও পরিপন্থী। তা সত্ত্বেও বর্তমান প্রশাসন নতুন নিয়মের মোড়কে পাসপোর্ট প্রক্রিয়াকে জটিল করে তাদের অভিবাসন নিয়ন্ত্রণের রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়নে অনড় অবস্থানে রয়েছে।

 

- রয়টার্স