আন্তর্জাতিক বার্তাসংস্থা রয়টার্সের এক বিশেষ প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে এই তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে। বিশ্বজুড়ে আন্তর্জাতিক নৌবাহিনীগুলোর দীর্ঘ সমুদ্রযাত্রার পর এ ধরনের বিশ্রাম বা 'পোর্ট কল' একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া হলেও, পাতায়ার মতো পর্যটন নগরীতে এত বিপুলসংখ্যক সেনার উপস্থিতি সবসময়ই বিশেষ মনোযোগের দাবি রাখে।
বিপুলসংখ্যক বিদেশি সেনার আকস্মিক আগমনে সম্ভাব্য অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি এড়াতে এবং জনস্বাস্থ্য নিশ্চিতে পাতায়ার স্থানীয় প্রশাসন আগে থেকেই ব্যাপক ও কঠোর সতর্কতামূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে।
এরই অংশ হিসেবে শহরটির বিভিন্ন স্থানে আকস্মিক অভিযান চালিয়ে ইতোমধ্যে অন্তত পঞ্চাশজন যৌনকর্মীকে আটক করেছে স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। প্রশাসনের এই সতর্কতামূলক পদক্ষেপের মূল কারণ হলো জননিরাপত্তা ও স্বাস্থ্যবিধি কঠোরভাবে নিশ্চিত করা।
স্থানীয় এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন যে, একসঙ্গে পাঁচ হাজার মার্কিন সেনার আগমনে পাতায়া শহরে আকস্মিকভাবে যৌনকর্মীদের চাহিদা বহুগুণ বৃদ্ধি পাওয়ার প্রবল শঙ্কা রয়েছে। এ ধরনের পরিস্থিতিতে যৌনকর্মীদের ওপর অনাকাঙ্ক্ষিত চাপ, অপব্যবহার এবং এর ফলে বিভিন্ন সংক্রামক ব্যাধি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি হয়।
পাতায়া শহরটি তার পর্যটন ও বিনোদন শিল্পের জন্য বিশ্বব্যাপী পরিচিত হলেও, প্রশাসন চাচ্ছে না এই সাময়িক সফরের কারণে শহরের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির কোনো অবনতি ঘটুক। তাই মার্কিন নৌবাহিনী এবং স্থানীয় পুলিশ প্রশাসনের মধ্যে সমন্বয়ের মাধ্যমে একটি সুশৃঙ্খল পরিবেশ বজায় রাখার চেষ্টা চলছে।
এই স্বাস্থ্যগত ঝুঁকিগুলো বিবেচনায় নিয়ে এবং মার্কিন সেনারা যেন কোনো ধরনের বেআইনি বা নিষিদ্ধ কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে না পড়েন, সেটি নিশ্চিত করতেই প্রশাসন এমন আগাম নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে।
মার্কিন রণতরী ইউএসএস আব্রাহাম লিংকনের এই দীর্ঘ সমুদ্রযাত্রার নেপথ্যে রয়েছে এক অত্যন্ত ক্লান্তিকর ও ঝুঁকিপূর্ণ সামরিক অভিযানের ইতিহাস। গত বছরের ২১ নভেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্যের সান দিয়েগো নৌঘাঁটি থেকে নিজেদের মিশন শুরু করেছিল এই রণতরীটি।
প্রাথমিকভাবে এটিকে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ ইন্দো-প্যাসিফিক বা ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে মোতায়েন করা হয়েছিল। তবে বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা বৃদ্ধি পেলে এবং ইরান যুদ্ধের ঠিক এক মাস আগে, গত জানুয়ারি মাসে রণতরীটিকে জরুরি ভিত্তিতে মধ্যপ্রাচ্যে স্থানান্তর করা হয়।
আধুনিক সমরাস্ত্রে সজ্জিত এই রণতরীর উপস্থিতিতে এর সেনারা ইরান যুদ্ধে প্রত্যক্ষ ও সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। এই যুদ্ধকালীন দীর্ঘ ও নিরবচ্ছিন্ন মিশনে রণতরীটি কেবল অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য গুয়াম ও ওমান উপকূলে যাত্রাবিরতি করেছিল। সব মিলিয়ে ২০০ দিনেরও বেশি সময় ধরে রণতরীটি গভীর সমুদ্রে সামরিক অভিযানে যুক্ত ছিল।
টানা দুই শতাধিক দিন সমুদ্রে এবং চরম যুদ্ধাবস্থার মধ্যে কাটানোর ফলে রণতরীতে অবস্থানরত মার্কিন সেনাদের মধ্যে মারাত্মক মাত্রায় শারীরিক অবসাদ ও মানসিক স্বাস্থ্যগত সংকট দেখা দেয়। সামরিক বাহিনীর সদস্যদের মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়টি নিয়ে সম্প্রতি বিশ্বজুড়েই প্রবল উদ্বেগ বাড়ছে।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের তথ্যমতে, দীর্ঘকালীন এই বিচ্ছিন্নতা ও যুদ্ধকালীন চাপের কারণে ক্রুদের মধ্যে চরম হতাশা তৈরি হয় এবং বেশ কয়েকজন নৌসেনা আত্মহত্যার মতো মর্মান্তিক পথ বেছে নেওয়ার চেষ্টাও করেন।
পরিস্থিতি আরও শোচনীয় আকার ধারণ করে যখন গত সপ্তাহে মানসিক চাপে পর্যুদস্ত এক মার্কিন সেনা সরাসরি চলন্ত রণতরী থেকে সমুদ্রে লাফিয়ে পড়েন। এই অনাকাঙ্ক্ষিত ও দুঃখজনক ঘটনার পর মার্কিন নৌবাহিনী অনেকটা বাধ্য হয়েই রণতরীটিকে দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে।
সান দিয়েগোতে নিজেদের মূল ঘাঁটিতে ফিরে যাওয়ার আগে শারীরিক ও মানসিক পুনরুদ্ধারের অংশ হিসেবেই ক্রুদের বিশ্রামের জন্য থাইল্যান্ডের পাতায়াতে এই বিশেষ যাত্রাবিরতির ব্যবস্থা করা হয়েছে।
নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলার বিষয়টি স্থানীয় প্রশাসনের জন্য কিছুটা চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ালেও, পাতায়ার স্থানীয় ব্যবসায়ীদের জন্য এই মার্কিন সেনাদলের আগমন একটি বড় ধরনের অর্থনৈতিক সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছে।
থাইল্যান্ডের অর্থনীতিতে যখন বৈশ্বিক অস্থিরতার প্রভাব পড়ছে, তখন এ ধরনের আকস্মিক সমাগম স্থানীয় ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীদের জন্য আশীর্বাদস্বরূপ। একসঙ্গে পাঁচ হাজার বিদেশি সেনার পদচারণায় শহরটির পর্যটন ও ব্যবসা-বাণিজ্যে সাময়িক হলেও বড় ধরনের ইতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।
পাতায়া শহরের মেয়র পোরামাস নাগামপিচেস এই বিষয়ে গভীর আশাবাদ ব্যক্ত করে জানিয়েছেন যে, রণতরীর প্রত্যেক সেনাসদস্য গড়ে এক হাজার থেকে তিন হাজার থাই বাথ পর্যন্ত স্থানীয় বাজারে ব্যয় করবেন বলে তারা ধারণা করছেন।
এর ফলে খুব অল্প সময়ের জন্য হলেও পাতায়ার স্থানীয় রেস্তোরাঁ, বিপণিবিতান ও পর্যটনসংশ্লিষ্ট ব্যবসা-বাণিজ্যে বিপুল পরিমাণ আর্থিক লেনদেন সংঘটিত হবে, যা স্থানীয় অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।